গরুর ব্যবসায়ীদের আর্তনাদ

ড. মো. আনোয়ার হোসেন

প্রকাশ : ০১ জুন ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

পবিত্র ঈদুল আজহার আনন্দ যখন দেশজুড়ে সবার ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়েছিল, তখন এক বুক দীর্ঘশ্বাস আর শূন্যতা নিয়ে পশুর হাটে দাঁড়িয়ে ছিলেন একদল ভাগ্যাহত মানুষ। তারা আমাদের পশুর ব্যবসায়ী, যাদের অক্লান্ত পরিশ্রমে আমাদের উৎসবের আঙিনা মুখরিত হয়। অথচ ২০২৬ সালের এই ঈদ মৌসুমে তাদের চোখের জল আর হাটের ধূলিকণা একাকার হয়ে গেছে। এক বুক আশা নিয়ে হাটে আসা এই মানুষদের স্বপ্নগুলো কীভাবে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল, সেই করুণ আখ্যান লুকিয়ে আছে এই হাটের প্রতিটি কোণে।

প্রতি বছরের মতো এবারও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পরম যত্নে লালন-পালন করা গবাদিপশু নিয়ে ব্যবসায়ীরা ছুটে এসেছিলেন শহরের বড় বড় পশুর হাটগুলোতে। চারদিকে সারি সারি সাজানো সুস্থ-সবল পশু, রঙিন দড়ি আর ঘুঙুরের আওয়াজে হাটগুলো জমজমাট হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু হাটের এই বাহ্যিক প্রস্তুতির পেছনে ব্যবসায়ীদের মনে ছিল এক অজানা আশঙ্কা আর বুকভরা প্রত্যাশার দোলাচল। দুর্ভাগ্যবশত, এবারের হাটের চেনা কোলাহল উৎসবের আমেজ নয়, বরং এক নীরব কান্নার পটভূমি তৈরি করেছে। পশুর হাটে পা রাখতেই ব্যবসায়ীদের প্রথম যে নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছে, তা হলো স্মরণকালের সবচেয়ে বড় ক্রেতা সংকট। উৎসবের দিন ঘনিয়ে এলেও হাটের অলিতে-গলিতে ক্রেতাদের আনাগোনা ছিল একেবারেই নগণ্য। যারাও বা আসছেন, তারা শুধু দূর থেকে দাম দেখছেন আর চলে যাচ্ছেন, পশু কেনার আগ্রহ দেখাচ্ছেন না কেউ। ফলে এক অদ্ভুত শূন্যতা গ্রাস করেছে পুরো হাটকে, যেখানে বিক্রেতারা অধীর আগ্রহে শুধু পথের পানে চেয়ে আছেন।

এই তীব্র ক্রেতা সংকটের প্রভাব পড়েছে পশুর দামের ওপর, যা মুহূর্তের মধ্যে ধসে পড়েছে পশু ব্যবসায়ী ও পালনকারীদের স্বপ্ন। যে পশুটিকে মাসের পর মাস বিপুল খরচে লালন-পালন করে একটি নির্দিষ্ট দামের আশা করা হয়েছিল, বাজারে তার অর্ধেক দামও মিলছে না। পশুর এই নজিরবিহীন দাম পতন ব্যবসায়ীদের মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছে। প্রতিটি পশুর দিকে তাকিয়ে মালিকরা হিসাব মেলাতে পারছেন না, কীভাবে তাদের এই বিপুল লোকসান কাটিয়ে উঠবেন। পশু বাজারে আনার প্রাথমিক ধাপেই ব্যবসায়ীদের পকেট শূন্য হতে শুরু করেছিল অতিরিক্ত পরিবহন খরচের কারণে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং দূর-দূরান্ত থেকে পশু আনার জন্য ট্রাকের উচ্চ ভাড়া গুনতে গিয়ে মূলধনের একটি বড় অংশ পথেই শেষ হয়ে গেছে। হাটে পৌঁছানোর আগেই যাতায়াত বাবদ যে বিশাল অঙ্কের টাকা খরচ হয়ে গেছে, তা পশুর মূল দামের সঙ্গে যোগ করতে গিয়ে ব্যবসায়ীরা চরম বিপাকে পড়েছেন।

এরই মধ্যে প্রকৃতির নিষ্ঠুর আচরণ ব্যবসায়ীদের জীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তুলেছে তীব্র গরমের মাধ্যমে। গ্রীষ্মের এই প্রচণ্ড দাবদাহে হাটের খোলা আকাশের নিচে মানুষ ও পশু উভয়েই হাপিয়ে উঠেছে। তীব্র গরমে অনেক পশু অসুস্থ হয়ে পড়েছে, কোনো কোনোটি হিট স্ট্রোক করে মারাও গেছে। এই অসহ্য উত্তাপের মাঝে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে ব্যবসায়ীরা শারীরিক ও মানসিকভাবে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছেন।

প্রকৃতির খামখেয়ালিপনা এখানেই শেষ হয়নি, একদিকে যেমন ছিল অনাবৃষ্টির দাপট, অন্যদিকে হঠাৎ শুরু হওয়া অতি বৃষ্টিপাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। অনাবৃষ্টির কারণে ধুলোবালিতে একাকার হওয়া হাট যখন হঠাৎ অতি বৃষ্টিতে প্লাবিত হলো, তখন পুরো এলাকা এক বিশাল কাদার গাদায় পরিণত হলো। এই চরম বৈরী আবহাওয়ায় পশুর যত্ন নেওয়া যেমন অসম্ভব হয়ে পড়েছে, তেমনি ক্রেতারাও হাটে আসার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন।

এই বহুমুখী সংকটের চূড়ান্ত পরিণতি দাঁড়িয়েছে ব্যবসায়ীদের বিপুল পরিমাণ মূলধন ক্ষতিতে। বছরের পর বছর ধরে জমানো পুঁজি, এমনকি ঘরের শেষ সম্বলটুকু বিক্রি করে যারা এই ব্যবসায় নামিয়েছিলেন, তাদের সবকিছু আজ তলিয়ে যাচ্ছে। পশুর ন্যায্য মূল্য না পেয়ে আসল টাকাই ঘরে তোলা যেখানে অসম্ভব, সেখানে লাভের মুখ দেখা তো দূর আকাশকুসুম কল্পনা মাত্র। এই আর্থিক ক্ষতি অনেক পরিবারকে রাতারাতি নিঃস্ব করে দিয়েছে।

মূলধন হারানোর এই ক্ষত আরও গভীর হয়েছে অধিকাংশ ব্যবসায়ীর ব্যাংক বা এনজিও থেকে নেওয়া চড়া সুদের ঋণের কারণে। ঋণের কিস্তি পরিশোধের তাগাদা আর মহাজনদের কড়া কথার চিন্তা তাদের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। উৎসবের দিন যেখানে সবার ঘরে আনন্দের জোয়ার থাকার কথা, সেখানে এই ঋণগ্রস্ততা ব্যবসায়ীদের জীবনকে এক জীবন্ত নরকে পরিণত করেছে। পাওনাদারদের ভয়ে অনেকেই এখন বাড়ি ফিরতেও ভয় পাচ্ছেন।

পশু পালনের পেছনের গল্পটি আরও বেদনাদায়ক, কারণ গত কয়েক মাস ধরে গো-খাদ্য সংকট ও এর অধিক মূল্য ব্যবসায়ীদের চরম ভোগান্তিতে রেখেছে। খৈল, ভুষি ও খড়ের দাম সাধারণের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ায় পশুকে বাঁচিয়ে রাখাই ছিল এক যুদ্ধ। হাটে আনার আগ পর্যন্ত যে বিপুল পরিমাণ টাকা শুধু খাদ্যের পেছনে খরচ হয়েছে, বাজারের বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই বিনিয়োগের এক আনাও ফেরত পাওয়ার কোনো উপায় নেই।

আর্থিক এই অনটনের মাঝেই পশুর হাটে ওঁৎপেতে থাকা কিছু অপরাধী চক্র ব্যবসায়ীদের সর্বনাশ ডেকে এনেছে জাল নোটের মাধ্যমে। সরল-সোজা গ্রামীণ ব্যবসায়ীরা অনেক সময় শহরের চতুর প্রতারকদের চিনতে পারেন না। পশু বিক্রি করে মাথার ঘাম পায়ে ফেলা কষ্টের টাকা যখন পকেটে ভরেন, পরে দেখা যায় তার সিংহভাগই জাল নোট। এই জালিয়াতি এক নিমিষেই একজন বিক্রেতার পুরো বছরের স্বপ্ন ধূলিসাৎ করে দেয়।

প্রতারণার এখানেই শেষ নয়, হাটে সক্রিয় রয়েছে বিষাক্ত চেতনানাশক ব্যবহারকারী অজ্ঞান পার্টি। একটু অসতর্কতার সুযোগ নিয়ে এই চক্রটি ব্যবসায়ীদের চেতনানাশক খাইয়ে বা স্প্রে করে তাদের সঙ্গে থাকা সমস্ত টাকা-পয়সা লুটে নিচ্ছে। অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে পড়ে অনেক ব্যবসায়ীকে হাসপাতালের বিছানায় ছটফট করতে দেখা গেছে, যাদের উপার্জিত অর্থ তো গেছেই, সঙ্গে জীবনও সংকটাপন্ন হয়েছে। একই সাথে পুরো হাট এলাকাজুড়ে বিরাজ করছে এক তীব্র ছিনতাই আতঙ্ক। গভীর রাতে বা ভোরের আলো ফোটার আগে, যখন হাটের নিরাপত্তা কিছুটা শিথিল থাকে, তখন অস্ত্রধারী ছিনতাইকারীরা ব্যবসায়ীদের ঘিরে ধরে সবকিছু কেড়ে নেয়। পকেটে সামান্য কিছু টাকা থাকলেই তা হারানোর ভয়ে ব্যবসায়ীরা এক মুহূর্তের জন্যও চোখ বন্ধ করতে পারছেন না, এক চরম নিরাপত্তাহীনতা তাদের গ্রাস করেছে।

ব্যবসায়ীদের এই অসহায়ত্বকে পুঁজি করে হাটের ইজারাদাররা আদায় করছেন অতিরিক্ত হাসিল। সরকারি নিয়মনীতিকে তোয়াক্কা না করে প্রতিটি পশু বিক্রির বিপরীতে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ের কাছ থেকেই জোরপূর্বক বেশি হাসিল রাখা হচ্ছে। এই অতিরিক্ত হাসিল আদায়ের অত্যাচার পশুর হাটগুলোকে এক প্রকার জিম্মিখানায় পরিণত করেছে, যেখানে প্রতিবাদ করারও কেউ নেই।

হাটের শেষ দিনে এসে সবচেয়ে বড় আঘাতটি আসে, যখন দেখা যায় বিপুল পরিমাণ পশু অবিক্রিত রয়ে গেছে। উৎসবের একদম শেষ মুহূর্তে এসেও যখন পশুর গলার দড়ি ছাড়ানো যায় না, তখন বিক্রেতার বুক ফেটে কান্না আসে। এই অবিক্রিত পশু নিয়ে এখন তারা কী করবেন, কোথায় রাখবেন, আর কীভাবে এদের খাওয়াবেন- সেই চিন্তায় তারা দিশাহারা হয়ে পড়েছেন।

হাটের সমাপ্তিতে অবিক্রিত পশু কিংবা খালি হাতে বাড়ি ফেরার জন্য আবার শুরু হয় তীব্র ট্রাক সংকট। ঈদের ঠিক আগের মুহূর্তে কোনো ট্রাক চালকই সহজে দূরের জেলায় যেতে রাজি হয় না, আর রাজি হলেও আকাশচুম্বী ভাড়া দাবি করে। ফলে হাটের ময়দানে পশুকে সাথে নিয়ে কিংবা শূন্য পকেটে বাড়ি ফেরার আকুতিতে ট্রাকের খোঁজে হন্যে হয়ে ঘুরতে হচ্ছে এই নিঃস্ব মানুষদের। পথে পথে রয়েছে আরও এক নির্মম চাঁদাবাজির ফাঁদ, যা অতিরিক্ত টোল নামে পরিচিত। মহাসড়কের বিভিন্ন মোড়ে এবং ব্রিজের মুখে নিয়মের বাইরে গিয়ে বিভিন্ন পশুর গাড়ি আটকে অতিরিক্ত টাকা আদায় করা হচ্ছে। এই জোরপূর্বক টোল আদায় ব্যবসায়ীদের অবশিষ্ট সম্বলটুকুও কেড়ে নিচ্ছে, যা তাদের দুঃখকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

পরিশেষে বলতে চাই, ২০২৬ সালের ঈদের দিনে যখন সবাই নতুন আনন্দে মেতে উঠেছে, তখন এই পশুর ব্যবসায়ীরা অশ্রু সজল করে এক সম্পূর্ণ অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে আছেন। ঋণের বোঝা, শূন্য পকেট আর অবিক্রিত পশুর দায় নিয়ে কীভাবে তারা আগামী দিনগুলোতে সংসার চালাবেন, তা কেউ জানে না। এই মানবিক বিপর্যয় শুধু কিছু মানুষের আর্থিক ক্ষতি নয়, বরং আমাদের সমাজ ব্যবস্থার এক বড় ক্ষতকে উন্মোচিত করে, যা দূর করতে দ্রুত সরকারি ও সামাজিক উদ্যোগ প্রয়োজন।

লেখক : প্রাবন্ধিক, কথা সাহিত্যিক ও প্রেসিডেন্ট, আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী সংগঠন ফ্রিডম

ইন্টারন্যাশনাল এন্টি অ্যালকোহল