প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০১ জুন, ২০২৬
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে চামড়াশিল্প এক সম্ভাবনার নাম। প্রচুর কাঁচামাল, সাশ্রয়ী শ্রম এবং বিশ্ববাজারে বিপুল চাহিদার কারণে এই শিল্পের প্রবৃদ্ধি ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অপার সুযোগ রয়েছে। কাঁচা চামড়া থেকে ধাপে ধাপে ওয়েট ব্লু, ক্রাস্ট লেদার এবং ফিনিশড লেদার তৈরি করে জুতা, স্যান্ডেল, বেল্টসহ বিভিন্ন পণ্য উৎপাদন করা হয়। আর বাংলাদেশে চামড়ার গুণগত মান ভালো হওয়ায় বিশ্ববাজারে চামড়াশিল্প দিয়ে জায়গা করে নেওয়ার ব্যাপক সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
বাংলাদেশে চামড়ার বড় জোগান আসে কোরবানির ঈদে। প্রতিবছর কোরবানির ঈদে সারা দেশে প্রায় ১ কোটি পশুর চামড়া সংগ্রহ করা হয়। পোশাকশিল্পের মতো চামড়া শিল্প এত প্রসারতা লাভ না করলেও চামড়া শিল্প থেকে অর্জিত আয়ের প্রায় পুরোটাই জাতীয় অর্থনীতিতে মূল্য সংযোজন করে যা পোশাকশিল্পে দেখা যায় না। এর প্রধান কারণ চামড়া প্রক্রিয়াজকরণ থেকে চূড়ান্ত পণ্যে রূপান্তর পর্যন্ত ক্যাপিটাল মেশিনারিজ আর কিছু কেমিক্যাল আমদানি করা ছাড়া প্রায় সব স্তরে দেশীয় ম্যাকানিজম ব্যবহৃত হয়। বাংলাদেশ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি করে ১.১৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করে। জাতীয় অর্থনীতিতে চামড়া খাতের অবদান ০.৬০ শতাংশ। চামড়া খাত প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ১০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করে। অন্যদিকে চামড়ার পণ্য পরিবন্ধ এর কারণে বিশ্বজুড়ে ‘লেদার গুডস’ বা চামড়াজাত পণ্যের চাহিদা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। সাভারের চামড়া শিল্পনগরীর (CETP) পরিবেশগত মানোন্নয়ন করা গেলে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা আরও বৃদ্ধি পাবে। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, যদি চামড়া শিল্পে সঠিক ব্যবস্থাপনা করা হয় তবে এ খাতে প্রতিবছর ১৫-২০ বিলিয়ন ডলার আয় করা সম্ভব।
বিপুল সম্ভাবনা থাকার পরও দেশীয় চামড়াশিল্পের বিকাশ না হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো দেশের চামড়াশিল্পের কমপ্লায়েন্স (দূষণমুক্ত ও উন্নত কর্মপরিবেশ) অর্জন করতে না পারা। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প কর্পোরেশনের (বিসিক) এক গবেষণা অনুসারে, এ জন্য যেসব কারণ দায়ী, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, সাভারের চামড়াশিল্প নগরীতে কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগারের (সিইটিপি) সক্ষমতার অভাব, কমপ্লায়েন্স সম্পর্কে ট্যানারিমালিকদের যথাযথ ধারণা না থাকা, কঠিন বর্জ্যরে অব্যবস্থাপনা ও ট্যানারির অভ্যন্তরীণ পরিবেশের মান উন্নত না হওয়া। এসব কারণে চামড়াশিল্পের মানসনদ প্রদানকারী আন্তর্জাতিক সংস্থা লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ (এলডব্লিউজি) থেকে স্বীকৃতি পাচ্ছে না সাভারে অবস্থিত ট্যানারিগুলো। ফলে দেশে প্রক্রিয়াজাত চামড়া ইউরোপের বদলে চীনের বাজারে কম দামে রপ্তানি করতে হচ্ছে।
দেশের চামড়াশিল্প কমপ্লায়েন্সের ক্ষেত্রে এত পিছিয়ে আছে যে বাংলাদেশে এলডব্লিউজি সনদপ্রাপ্ত ট্যানারির সংখ্যা মাত্র ৬; অথচ এ সংখ্যা ভারতে ১৩৯, চীনে ১০৩, ইতালিতে ৬৮, ব্রাজিলে ৬০, তাইওয়ানে ২৪। এলডব্লিউজি সনদ না থাকার কারণে চামড়ার বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে আছে। দেশীয় কাঁচা চামড়ার পর্যাপ্ত জোগান থাকা সত্ত্বেও রপ্তানিমুখী চামড়াজাত পণ্য উৎপাদনকারী শিল্পকারখানাগুলোকে বছরে প্রায় এক হাজার কোটি টাকার এলডব্লিউজি সনদপ্রাপ্ত ফিনিশড চামড়া আমদানি করতে হয়, যা কারখানাগুলোর প্রতিযোগিতার সক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে।
ট্যানারিমালিকদের আরও যেসব সমস্যা এলডব্লিউজি সনদ অর্জনে বাধা, তার মধ্যে রয়েছে কাঁচা চামড়ার উৎস ও প্রক্রিয়াজাতকৃত চামড়ার গন্তব্য শনাক্তকরণের ব্যবস্থা (ট্রেসিবিলিটি) না থাকা, তরল বর্জ্যরে সঙ্গে ক্ষুদ্রাকৃতির কঠিন বর্জ্য একই পাইপলাইনে অপসারণ, ট্যানারির ডিজাইন ক্যাপাসিটির অতিরিক্ত চামড়া প্রক্রিয়াকরণ, ট্যানারিগুলোর ন্যূনতম প্রিট্রিটমেন্টের ব্যবস্থা না থাকা, রাসায়নিক দ্রব্য যথাযথভাবে সংরক্ষণ না করা, ক্রোমযুক্ত বর্জ্য আলাদা না করা, আধুনিক পদ্ধতিতে চামড়া প্রক্রিয়াকরণের ধারণা না থাকা, শ্রমিকদের জন্য সুষ্ঠু কর্মপরিবেশের অভাব ইত্যাদি।
ট্যানারি কারখানাগুলো পিছিয়ে যাওয়ার আরেকটা কারণ মূলধনের সংকট ও শ্রমিক অসন্তোষ। দেশে মোট চামড়ার প্রায় ৪০-৫০ শতাংশ চামড়া আসে ঈদুল আজহায়, ট্যানারি মালিকরা পর্যাপ্ত অর্থের অভাবে চামড়া সংগ্রহ করতে পারে না। এবারও পানির দামে বিক্রি হয়েছে পশুর চামড়া আবার পর্যাপ্ত অর্থ না পেয়ে অনেকে চামড়া মাটিতে পুতে পেলেন। শুধু চামড়া ক্রয়ে সংকট নয়, ট্যানারিগুলোতে শ্রমিকদের দেওয়া হয় না পর্যাপ্ত মজুরি এবং কাজ করার মতো উপযুক্ত পরিবেশ। দূষিত পরিবেশে কাজ করে চর্মরোগ, শ্বাসকষ্টসহ অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত হয় শ্রমিকরা। ট্যানারিগুলোতে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয় না বলে এবং চামড়া বর্জ্য থেকে আশেপাশের পরিবেশ দূষিত হয়। এর সঙ্গে রাষ্ট্রীয় সঠিক পরিকল্পনা প্রণয়ন আর তা বাস্তবায়নের অভাব তো আছেই।
তাছাড়া প্রতিবছর কোরবানির সময় অদক্ষতা আর সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে বিপুল সংখ্যক চামড়া নষ্ট হয় যার জন্য জনসচেতনতার অভাবকেও দায়ী করা যায়। চামড়ার মতো সম্ভাবনাময় এই শিল্প ধরে রাখতে সঠিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। সরকার চলতি বছর জুলাইয়ের মধ্যে চামড়াশিল্পকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় আনার চেষ্টা করছে তা রাস্তবায়ন করতে হবে।
ট্যানারিগুলোতে বিশ্বমানের পরিবেশ নিশ্চিত করে চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণের সেইদিকে নজর দিতে হবে।
শ্রমিকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে তোলা এবং ট্যানারিগিলোতে উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার করা, শ্রমিকদের উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করা। যেহেতু কোরবানিতে দেশের বেশিরভাগ চামড়ার জোগান দেয়, তাই এই সময়ে যেন চামড়া নষ্ট না হয়- সেই দিকে নজরদারি বাড়ানো।
চামড়াশিল্পের প্রসারতায় যেন আশপাশের পরিবেশ নষ্ট না হয়- সেটার দিকে খেয়াল রাখা। সর্বোপরি, চামড়ার মতো সম্ভাবনায় খাতকে এগিয়ে নিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
নুসরাত সুলতানা
শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়