তরুণ সমাজ ও ভবিষ্যতের বাংলাদেশ

বাপ্পাদিত্য চৌধুরী প্রবাল

প্রকাশ : ০১ জুন ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

‘এসেছে নতুন শিশু; তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান’­- তারুণ্যের কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য তার ‘ছাড়পত্র’ কবিতার এই পঙ্কিÍর মাধ্যমে আমাদের এক গভীর ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, যা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। বাংলাদেশ একটি তরুণপ্রধান দেশ। কেননা এর জনসংখ্যার একটি বড় অংশই তরুণ, যাদের হাত ধরেই নির্ধারিত হবে আগামী দিনের বাংলাদেশ কেমন হবে- তা উন্নত, সমৃদ্ধ ও মানবিক হবে, নাকি পিছিয়ে পড়া ও সংকটগ্রস্ত হবে। তাই তরুণ সমাজকে শুধু ভবিষ্যতের নাগরিক হিসেবে নয়, বরং বর্তমানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনশীল শক্তি হিসেবে দেখা উচিত। আজকের বিশ্ব দ্রুত পরিবর্তনশীল। প্রযুক্তি, অর্থনীতি, শিক্ষা ও যোগাযোগ্ল- সব ক্ষেত্রেই ঘটছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে তরুণদের শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ওপর নির্ভর করলে চলবে না; প্রয়োজন বাস্তব দক্ষতা, সৃজনশীল চিন্তাশক্তি, সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ- নৈতিক মূল্যবোধ। কারণ একটি জাতি তখনই টেকসই উন্নয়ন অর্জন করতে পারে, যখন তার মানবসম্পদ দক্ষতার পাশাপাশি দায়িত্বশীলও হয়। বাংলাদেশের তরুণ সমাজ আজ যেমন অসীম সম্ভাবনার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে, অন্যদিকে তেমনি নানা চ্যালেঞ্জেরও সম্মুখীন। তথ্যপ্রযুক্তি, ফ্রিল্যান্সিং, উদ্যোক্তা, স্টার্টআপ সংস্কৃতি এবং বৈশ্বিক কর্মবাজারে অংশগ্রহণের মাধ্যমে একদল তরুণ এগিয়ে যাচ্ছে। তারা ডিজিটাল অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে একই সময়ে আরেকটি অংশ বেকারত্ব, হতাশা, সুযোগের অভাব এবং দিকনির্দেশনার সংকটে ভুগছে। এই বৈপরীত্যই আজকের তরুণ সমাজের বাস্তব চিত্র। শিক্ষাব্যবস্থার ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রেই শিক্ষা ব্যবস্থা এখনও পরীক্ষাকেন্দ্রিক ও মুখস্থনির্ভর। ফলে শিক্ষার্থীরা ভালো ফলাফল অর্জন করলেও বাস্তব জীবনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পিছিয়ে পড়ছে। আধুনিক বিশ্বের চাহিদা অনুযায়ী শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও দক্ষতাভিত্তিক, প্রযুক্তিনির্ভর এবং উদ্ভাবনীমুখী করা প্রয়োজন। কারণ ভবিষ্যতের চাকরির বাজার শুধু ডিগ্রি নয়, বরং দক্ষতা, অভিজ্ঞতা এবং সৃজনশীলতাকেই বেশি গুরুত্ব দেবে। ইউনিসেফ এর মতে, তরুণদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মানসিক বিকাশে বিনিয়োগ একটি দেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য সবচেয়ে কার্যকর কৌশল। একইভাবে বিশ্ব ব্যাংক তরুণ মানবসম্পদ উন্নয়নকে টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল ভিত্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তরুণ সমাজের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো উদ্ভাবনী মানসিকতা। আজকের বিশ্বে শুধু চাকরি খোঁজা নয়, বরং চাকরি সৃষ্টি করাই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশেও ধীরে ধীরে স্টার্টআপ সংস্কৃতি বিকশিত হচ্ছে, যেখানে তরুণ উদ্যোক্তারা নতুন নতুন ধারণা নিয়ে কাজ করছে। এটি ভবিষ্যতের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক একটি দিক। যদি এই ধারাকে আরও উৎসাহিত করা যায়, তবে বেকারত্ব অনেকাংশে কমে আসবে। তবে তরুণদের সামনে কিছু গুরুতর সামাজিক ও মানসিক চ্যালেঞ্জও রয়েছে। মাদকাসক্তি, অতিরিক্ত ডিজিটাল আসক্তি, হতাশা, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ এবং মূল্যবোধের সংকট অনেক তরুণকে বিপথগামী করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত সময় ব্যয়, তুলনামূলক জীবনযাপনের চাপ এবং মানসিক অস্থিরতা তাদের উৎপাদনশীলতাকে ব্যাহত করছে। এই সমস্যাগুলোকে উপেক্ষা করা ভবিষ্যতের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সমাজ এবং রাষ্ট্র- সবাই একসঙ্গে কাজ করতে হবে। পরিবার সন্তানদের সঙ্গে সুস্থ সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে এবং তাদের মানসিক বিকাশে সহায়তা করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শুধুমাত্র একাডেমিক জ্ঞান নয়, জীবনদক্ষতা, নৈতিক শিক্ষা, নেতৃত্বগুণ এবং মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। শিক্ষকের ভূমিকাও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তারা শুধু জ্ঞানদানকারী নন, বরং ভবিষ্যৎ নাগরিক গঠনের কারিগর। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো তরুণদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা, প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা এবং উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ অর্থায়ন ও সহায়তা নিশ্চিত করা। পাশাপাশি একটি নিরাপদ, ন্যায়ভিত্তিক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক সামাজিক পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে তরুণরা নিজেদের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ পাবে। তরুণদেরও নিজেদের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। তাদের বুঝতে হবে যে, তারা শুধু নিজেদের ভবিষ্যৎ নয়, পুরো জাতির ভবিষ্যৎ বহন করছে। তাই সময়ের সঠিক ব্যবহার, নৈতিক আচরণ, পরিশ্রম ও দেশপ্রেম- এই গুণগুলো তাদের জীবনের অংশ হতে হবে। ব্যক্তিগত উন্নতির পাশাপাশি সামাজিক দায়িত্ববোধও তাদের মধ্যে গড়ে তুলতে হবে। ডিজিটাল যুগে তরুণদের জন্য সুযোগ যেমন বেড়েছে, তেমনি ঝুঁকিও বেড়েছে। প্রযুক্তি তাদের জীবনকে সহজ করেছে, কিন্তু একই সঙ্গে বিভ্রান্তির সুযোগও বাড়িয়েছে। তাই প্রযুক্তিকে সঠিকভাবে ব্যবহার করা শিখতে হবে, যাতে এটি উন্নয়নের হাতিয়ার হয়, ধ্বংসের নয়। তরুণ সমাজই ভবিষ্যতের বাংলাদেশ। তাদের হাতেই নির্ধারিত হবে দেশের অর্থনৈতিক শক্তি, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং নৈতিক ভিত্তি। যদি এই তরুণ শক্তিকে সঠিকভাবে গড়ে তোলা যায়- দক্ষতা, নৈতিকতা ও মানবিকতার সমন্বয়ে- তবে বাংলাদেশ একটি উন্নত, সমৃদ্ধ, প্রযুক্তিনির্ভর এবং মানবিক রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে। ভবিষ্যতের বাংলাদেশ কোনো স্বপ্ন নয়; সঠিক দিকনির্দেশনা পেলে তা বাস্তবতায় রূপ নিতে পারে, আর সেই বাস্তবতার মূল নির্মাতা হবে আজকের তরুণ সমাজ।

বাপ্পাদিত্য চৌধুরী প্রবাল

উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ, মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ