রক্তের আল্পনায় শয়তানের হাসির ইতিবৃত্ত
আয়াজ আহমদ বাঙালি
প্রকাশ : ০১ জুন ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নদীমাতৃক বাংলার পলিমাটিতে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে হিন্দু এবং মুসলমান দুটি ধারা পাশাপাশি বয়ে চলেছে। এই দুই ধারা কখনও এক হয়ে তৈরি করেছে গঙ্গা-যমুনার এক অপূর্ব সংকর সংস্কৃতি, আবার কখনও রাজনৈতিক স্বার্থের ঘূর্ণিপাকে পড়ে একে অপরের রক্তে হাত রাঙিয়েছে। আমাদের অবচেতনে একদিকে যেমন আছে লালন-রবীন্দ্রনাথ-নজরুলের উদার সুর, অন্যদিকে ঠিক তেমনই জমে আছে সাতচল্লিশের দেশভাগের ক্ষত এবং দাঙ্গার বীভৎস কোলাহল। কাজী নজরুল ইসলাম তার ‘মন্দির ও মসজিদ’ প্রবন্ধে সমসাময়িক দাঙ্গার যে নগ্ন রূপ তুলে ধরেছিলেন, তা সেই সময়ের কথাই বলে না; তা ছিল আগামী শতাব্দীর এক নির্মম সত্যের পূর্বাভাসও। বর্তমান সময়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আজ এই সত্যটিই স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, যুগের সাথে পোশাক এবং উপাসনালয়ের দেয়াল বদলালেও মানুষের আদিম পশুত্ব ও বাইরের স্বার্থান্বেষী শয়তানের চরিত্র একটুও বদলায়নি।
হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কের গভীরে প্রবেশ করলে প্রথমেই যে সত্যটি বুকে এসে আঘাত করে, তা হলো এই দুই সম্প্রদায়ের সাধারণ মানুষ আসলে একই রকম শোষণের শিকার। কিন্তু ধর্মের এক অদ্ভুত আফিম তাদের এমনভাবে আচ্ছন্ন করে রাখে যে, তারা নিজেরা ক্ষুধার্ত থেকেও অন্য ধর্মের মানুষের রক্ত পিপাসায় মত্ত হতে পারে। এই যে উগ্রতা, এর পেছনে আধ্যাত্মিক চেতনা নেই, আছে এক ধরনের অন্ধ অহংকার। আজ যে মানুষ ধর্মের নামে অন্য একজনকে পশুর মতো পিটিয়ে মারছে, সে হয়তো নিজেই জানে না তার নিজের ধর্মের মূল বাণী কী। হিন্দু ধর্মগ্রন্থের ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’ অর্থাৎ গোটা বিশ্বই আমার পরিবার, কিংবা ইসলামের ‘লা ইকরাহা ফিদ দ্বীন’-অর্থাৎ ধর্মে কোনো জোরজবরদস্তি নেই- এই পরম সত্যগুলো উৎসবের ব্যানার এবং রাজনৈতিক বক্তৃতার বাইরে কোথাও জায়গা পায় না। সাধারণ মানুষের এই অজ্ঞতাকেই পুঁজি করে একদল তথাকথিত ধর্ম ব্যবসায়ী এবং আধুনিক যুগের রাজনৈতিক কুশীলবরা। তারা দূর থেকে সুতো নাড়ায় এবং সাধারণ মানুষ শয়তানের ইশারায় নাচতে থাকা পুতুলের মতো নিজের ভাইয়ের গলায় ছুরি চালায়।
কাজী নজরুল যে সমুদ্রপারের বুনো বাঁদরের কথা বলেছিলেন, তারা আজ হয়তো সশরীরে নেই, কিন্তু তাদের রেখে যাওয়া ‘ভাগ করো এবং শাসন করো’ নীতিটি আজও নিখুঁতভাবে কাজ করে চলেছে। ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার এই নোংরা খেলায় সবচেয়ে সস্তা পণ্য হলো মানুষের আবেগ এবং ধর্ম। যখনই কোনো সমাজ বা রাষ্ট্রে বেকারত্ব, অর্থনৈতিক মন্দা কিংবা সুশাসনের অভাব চরম আকার ধারণ করে, তখনই খুব চতুরতার সঙ্গে মঞ্চে নামিয়ে দেওয়া হয় ধর্মীয় মেরুকরণের খেলা। হঠাৎ করেই আবিষ্কার হয় যে এক সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব অন্য সম্প্রদায়ের জন্য হুমকি। অথচ একটু গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যাবে, একজন দরিদ্র হিন্দু কৃষক এবং একজন দরিদ্র মুসলিম মজুরের জীবনযুদ্ধ, কান্না এবং পেটের ক্ষুধা একেবারেই অভিন্ন। শ্মশানে বা কবরে যাওয়ার আগে পর্যন্ত তাদের জীবনের কষ্টগুলো একই সুতোয় গাঁথা। কিন্তু ক্ষমতার লোভ অন্ধ মানুষগুলো এমন এক চশমা পরিয়ে দেয়, যার ফলে তারা প্রতিবেশীর চোখের জল দেখতে পায় না, দেখতে পায় মাথার টুপি কিংবা কপালে তিলক।
এই সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো আমাদের উৎসব এবং প্রতীকগুলোর রাজনীতিকরণ। যে উৎসবগুলো একসময় ছিল মিলনের উৎসব, যেখানে ঈদের সেমাই এবং দুর্গোৎসবের নাড়ু ভাগ করে নেওয়ার আনন্দ ছিল অকৃত্রিম, আজ সেখানেও ঢুকে পড়েছে সন্দেহের বিষবাষ্প। উৎসবের লাউড স্পিকারগুলো এখন আনন্দের গান না বাজিয়ে অনেক সময় অন্য পক্ষকে উসকানি দেওয়ার হাতিয়ার হয়ে উঠছে। আমরা মন্দির বা মসজিদের চূড়া যত উঁচু করছি, মানুষের মনের উদারতা ঠিক ততটাই নিচে নেমে যাচ্ছে। আমরা পাথরের দেয়াল পাহারা দিতে গিয়ে জ্যান্ত মানুষের বুক ঝাঁঝরা করে দিচ্ছি। অথচ নজরুল কতো সহজ এবং নির্মমভাবে আমাদের দেখিয়ে দিয়েছিলেন যে, কোনো দাঙ্গার সময়ই আকাশ থেকে কোনো অলৌকিক শক্তি এসে ইটের তৈরি উপাসনালয় রক্ষা করতে নামেনি। কারণ; সৃষ্টিকর্তা কোনো নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে বন্দী নন; তিনি থাকেন মানুষের ভালোবাসা এবং আত্মত্যাগে। যখন আমরা সেই মানুষকে হত্যা করি, তখন আসলে আমরা প্রকারান্তরে ঈশ্বর বা আল্লাহর অস্তিত্বকেই অপমান করি।
আজকের এই আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর সমাজেও যখন আমরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হিন্দু-মুসলিমের পারস্পরিক ঘৃণা এবং বিষোদ্গার দেখি, তখন মনে হয় আমাদের সমস্ত শিক্ষা এবং প্রগতি এক মস্ত বড় প্রহসন। আমরা চাঁদে মহাকাশযান পাঠাতে পারছি, কিন্তু পাশের বাড়ির ভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষজনের প্রতি মনের সংকীর্ণতা দূর করতে পারছি না। কিউরেটেড ট্রোল, ফেক নিউজ এবং সস্তা ট্রোলিংয়ের মাধ্যমে প্রতিদিন লাখ লাখ তরুণের মগজে এই বিষ ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এই তরুণরা খায়রু মিয়াঁ কিংবা সদানন্দ বাবুর সেই ট্র্যাজিক সত্যটি বোঝে না। মৃত্যুর পর যখন দেহ নিথর হয়ে পড়ে থাকে, তখন প্রকৃতির কাছে তার কোনো ধর্মীয় লেবেল থাকে না। তখন তা মানুষের লাশ হিসেবেই পড়ে থাকে। সেই লাশকে হিন্দু মনে করে শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হোক বা মুসলিম মনে করে কবরস্থানে—মাটি এবং আগুন কাউকেই আলাদা করে চেনে না। মাটি সবাইকে বুকে টেনে নেয় এবং আগুন সবাইকে ছাই করে দেয়। এই পরম বাস্তবতাকে ভুলে গিয়ে আমরা যখন শ্রেষ্ঠত্বের বড়াই করি, তখন আমাদের চেয়ে বড় মূর্খ আর কেউ হতে পারে না। তবে এই অন্ধকারের মধ্যেও কি কোনো আশার আলো নেই? নিশ্চয়ই আছে। যখন কোনো বড় বিপর্যয় আসে (যেমন বন্যা, মহামারি বা কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ) তখন কিন্তু মানুষ এই বিভাজনের দেয়াল ভেঙে আবার মানুষ হয়ে ওঠে। তখন কোনো মুসলিম যুবক রোজা রেখে হিন্দু প্রতিবেশীর জন্য অক্সিজেনের সিলিন্ডার বয়ে নিয়ে যায়, আবার কোনো হিন্দু পরিবার তাদের বাড়ির দরজা খুলে দেয় আশ্রয়হীন মুসলিম ভাইদের জন্য। এই যে সংকটের মুহূর্তে মানুষের ‘মানুষ’ সত্তার জেগে ওঠা, এটাই প্রমাণ করে, আমাদের মজ্জাগত সম্প্রীতির বীজ এখনও মরে যায়নি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই মানবিকতা দেখার জন্য কেন আমাদের সবসময় কোনও বিপর্যয়ের অপেক্ষা করতে হবে? কেন স্বাভাবিক সময়ে আমরা একে অন্যকে সহজভাবে গ্রহণ করতে পারি না? সমালোচনা এবং কটাক্ষের সুরে বলতে গেলে, আমরা আসলে এক অদ্ভুত ভণ্ডামির মধ্যে বাস করছি। আমরা মুখে বলি ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’ কিন্তু মনে মনে অন্য ধর্মের রীতিনীতিকে নিচু চোখে দেখি। আমরা প্রগতিশীলতার মুখোশ পরে চায়ের দোকানে সম্প্রীতির গল্প করি, কিন্তু নিজের সন্তান যখন অন্য ধর্মের কাউকে জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নিতে চায়, তখন আমাদের আদিম অনমনীয় রূপ বেরিয়ে পড়ে। এই দ্বিচারিতা বন্ধ না হলে কোনোদিনও প্রকৃত সম্প্রীতি আসবে না। সম্প্রীতি কোনো রাজনৈতিক চুক্তি নয় যে কাগজে সই করলেই তা অর্জিত হবে।
আয়াজ আহমদ বাঙালি
আসাম, ভারত
