প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০১ জুন, ২০২৬
দিন গেছে, গেছে মাস, চলে গেছে বছরের পর বছর। তবুও তিস্তার দুই পারের মানুষের দুঃখ ঘোচেনি, মেলেনি পানির ন্যায্য হিস্যা। ভারত একতরফা পানি আটকে রাখায় শুষ্ক মৌসুমে স্রোতস্বিনী তিস্তা হয়ে পড়ে মরুভূমি, আর বর্ষায় তাদের ছেড়ে দেওয়া অতিরিক্ত পানিতে বন্যা ও নদীভাঙনে বিপর্যস্ত হয় দুই কূল। ভেসে যায় দুপারের মানুষের তিল তিল করে গড়া স্বপ্নও। পরিতাপের বিষয়, দফায় দফায় প্রতিশ্রুতির পরেও তিস্তা পানিবণ্টন চুক্তি করেনি ভারত। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তিস্তা মহাপরিকল্পনার উদ্যোগ ও সমীক্ষার কাজ করা হলেও বাস্তবে কোনো ফলাফল আসেনি; বরং তা আটকে ছিল ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণের গোলকধাঁধায়। বর্তমানে বিএনপি সরকারের পথচলার শুরুতেই তিস্তা মহাপরিকল্পনায় কিছু সংশোধন এবং সেখানে পানি সংরক্ষণের বিষয়টি যুক্ত করে নতুনভাবে প্রকল্পটি উপস্থাপনের ঘোষণা এসেছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়েছেন, পদ্মা ব্যারাজের মতো তিস্তা ব্যারাজও হবে। পানিসম্পদ মন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে উঠে এসেছে, জুনের বাজেটে অনুমোদন শেষে আগামী জুলাই থেকেই এই মাস্টারমাইন্ড প্রজেক্টের কাজ শুরু হবে। তবে প্রকল্প ঘিরে যে বিস্তর ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে, সে বিষয়ে সরকারকে সচেতন থাকতে হবে। চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের’ কারণে বেইজিং এ প্রকল্পে অর্থায়নে শুরু থেকেই আগ্রহী। আবার এ অঞ্চলে চীনের আধিপত্য রুখতে ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সচেষ্ট। তবে বিগত দিনে ভারতের আপত্তির মুখে প্রকল্পটি যেভাবে থমকে গিয়েছিল, এর পুনরাবৃত্তি আর কাম্য নয়।
নদী বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ কোনো পরাশক্তির ভূ-রাজনৈতিক দাবার ঘুঁটি হতে পারে না। তিস্তা যেহেতু আমাদের জীবন-মরণের প্রশ্ন, তাই এ প্রকল্প বাস্তবায়নে কোনো তৃতীয় দেশের ওপর শতভাগ নির্ভরশীল হওয়া সমীচীন হবে না। দেশের স্বার্থে প্রয়োজনে নিজস্ব অর্থায়নে এবং বিশ্বের সবচেয়ে দক্ষ কারিগরি সংস্থাকে ভাড়া করে বৈজ্ঞানিক উপায়ে এ কাজ সম্পন্ন করতে হবে। একইসঙ্গে ভারতের কাছে পানির ন্যায্য হিস্যা চাওয়ার আন্তর্জাতিক আইনি লড়াইও সচল রাখা দরকার। ২০১১ সালে তিস্তা চুক্তির খসড়া চূড়ান্ত হলেও পশ্চিমবঙ্গের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির অজুহাতে তা আটকে যায়। এরপর দীর্ঘ সময় কেবল আশ্বাসের বাণীই মিলেছে। আমরা মনে করি, একটি আন্তর্জাতিক নদীর উজানে বাঁধ দিয়ে ভাটির দেশকে মরুভূমি বানিয়ে দেওয়া স্পষ্টতই অন্যায় এবং আন্তর্জাতিক রীতির লঙ্ঘন। ১৯৯৭ সালের আন্তর্জাতিক পানিপ্রবাহ কনভেনশন, যা ২০১৪ সালে আইনে পরিণত হয়েছে, সে অনুযায়ী উজানের দেশ ভাটির দেশের ক্ষতি করতে পারে না। ভারত কী বলবে- এ আশঙ্কায় হয়তো আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এতদিন জোরালো দাবি তোলা হয়নি; কিন্তু সেই নতজানু হয়ে থাকার বাস্তবতা এখন আর নেই।
ভুলে গেলে চলবে না, তিস্তাপারের লাখ লাখ মানুষ এরইমধ্যে ভাঙনে উদ্বাস্তু হয়েছেন। তিস্তায় পানির প্রবাহ ফিরিয়ে আনা এবং একইসঙ্গে বন্যা নিয়ন্ত্রণ করা তাই আজ সময়ের দাবি। কোনো ধরনের কালক্ষেপণ বা ভূরাজনৈতিক চাপের মুখে নতিস্বীকার না করে সরকারকে একটি সুনির্দিষ্ট ও বিজ্ঞানসম্মত রোডম্যাপ নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। তবেই ঘুচবে তিস্তাপারের মানুষের শত বছরের কান্না।