হাসপাতালের দালালচক্র : চিকিৎসা যখন ব্যবসা, রোগী যখন পণ্য

আরিফুল ইসলাম রাফি

প্রকাশ : ০২ জুন ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

হাসপাতালের করিডোরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির চোখে তখন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সত্য একটাই, তার প্রিয়জনকে বাঁচাতে হবে। হাতে হয়তো পরীক্ষার রিপোর্ট, পকেটে সীমিত টাকা, মাথায় হাজারও দুশ্চিন্তা। চিকিৎসক কী বলবেন, কত খরচ হবে, রোগী বাঁচবে কি না; এসব অনিশ্চয়তার মধ্যেই সে হাসপাতালের গেটে প্রবেশ করে। আর ঠিক সেই মুহূর্তে তার পাশে এসে দাঁড়ায় আরেকটি ছায়া, ‘দালালচক্র’।

এই ছায়া কোনো একক ব্যক্তি নয়; এটি একটি ব্যবস্থা। একটি অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক। একটি অদৃশ্য বাজার, যেখানে রোগী মানুষ নয়, একটি ক্লায়েন্ট; অসুস্থতা একটি সুযোগ; আর চিকিৎসা একটি পণ্য। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের সবচেয়ে অস্বস্তিকর বাস্তবতাগুলোর একটি হলো হাসপাতালকেন্দ্রিক দালালচক্র। এই চক্রকে অনেকেই শুধু কয়েকজন অসাধু ব্যক্তির কার্যক্রম বলে মনে করেন। কিন্তু বাস্তবে এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতা, প্রশাসনিক উদাসীনতা, নৈতিক অবক্ষয় এবং বাণিজ্যিক মানসিকতার সম্মিলিত ফল।

একজন রোগী হাসপাতালে প্রবেশ করার আগেই তার চারপাশে তৈরি হয়ে যায় এক ধরনের বাজার। সেখানে রোগীকে কোন ক্লিনিকে পাঠানো হবে, কোন ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পরীক্ষা করানো হবে, কোন অ্যাম্বুলেন্স ব্যবহার করা হবে, কোন ওষুধ কেনা হবে; সবকিছুর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে কমিশনের হিসাব। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় রোগ নির্ণয় গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু এই চক্রের ভাষায় গুরুত্বপূর্ণ হলো ‘রেফারেল’। সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, এই ব্যবসা মানুষের সবচেয়ে দুর্বল মুহূর্তকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। একজন ব্যবসায়ী যখন কোনো পণ্য বিক্রি করেন, তখন ক্রেতার সামনে বিকল্প থাকে। কিন্তু একজন রোগীর সামনে সেই স্বাধীনতা অনেক সময় থাকে না। কারণ সে আতঙ্কিত, উদ্বিগ্ন এবং সময়ের চাপে থাকে। দালালচক্র ঠিক এই মানসিক অবস্থাকেই পুঁজি করে। তারা জানে, ভয় দেখানো সবচেয়ে কার্যকর বিপণন কৌশল। তাই বলা হয়, ‘এখানে চিকিৎসা ভালো হবে না’, ‘ডাক্তার পাবেন না’, ‘রোগীর অবস্থা খুব খারাপ’, ‘দ্রুত এই হাসপাতালে নিয়ে যান’, ‘এই টেস্ট এখনই করতে হবে।’

ফলে রোগী ও তার পরিবার সিদ্ধান্ত নেয় তথ্যের ভিত্তিতে নয়, ভয়ের ভিত্তিতে। এই দালালচক্রকে বোঝার জন্য শুধু হাসপাতালের গেটের দিকে তাকালে হবে না; তাকাতে হবে পুরো স্বাস্থ্য অর্থনীতির দিকে। আজ স্বাস্থ্যসেবা এমন এক খাতে পরিণত হয়েছে, যেখানে কোটি কোটি টাকার লেনদেন হয়। নতুন নতুন হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ফার্মেসি: সবকিছু মিলে একটি বিশাল বাজার গড়ে উঠেছে। বাজার থাকা অপরাধ নয়। সমস্যা তখনই শুরু হয়, যখন মুনাফা মানবিকতার ওপর প্রাধান্য পায়। চিকিৎসা একটি পেশা, কিন্তু একই সঙ্গে এটি একটি নৈতিক দায়িত্ব। একজন চিকিৎসক শুধু সেবা বিক্রি করেন না; তিনি মানুষের জীবন রক্ষার চেষ্টা করেন। অথচ যখন স্বাস্থ্য খাতের একটি অংশ কমিশন, রেফারেল এবং রোগী বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন চিকিৎসা পেশার মৌলিক দর্শন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আজ এমন বহু অভিযোগ শোনা যায় যে রোগীকে অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো হচ্ছে, নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানে পাঠানো হচ্ছে, কমিশনভিত্তিক রেফারেল চলছে। সব অভিযোগ সত্য না হলেও একটি প্রশ্ন অনিবার্যভাবে উঠে আসে, কেন সাধারণ মানুষ স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতি আস্থা হারাচ্ছে?

কারণ মানুষ শুধু খরচ নিয়ে উদ্বিগ্ন নয়; তারা সন্দেহ করতে শুরু করেছে যে, তাদের চিকিৎসা-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তগুলো আদৌ চিকিৎসাগত প্রয়োজনের ভিত্তিতে নেওয়া হচ্ছে কি না। আস্থা হারানো যেকোনো ব্যবস্থার জন্য সবচেয়ে বড় সংকট। একটি রাষ্ট্রের স্বাস্থ্যব্যবস্থা তখনই সফল, যখন সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করে যে চিকিৎসক তার রোগ সারাতে চান, তার পকেট খালি করতে নয়। কিন্তু যখন একজন রোগী হাসপাতালের গেটে দাঁড়িয়ে প্রথমেই দালালের মুখোমুখি হয়, তখন সেই বিশ্বাসে ফাটল ধরে। এই দালালচক্রের অস্তিত্বের পেছনে কয়েকটি কাঠামোগত কারণ রয়েছে। প্রথমত, সরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ অত্যন্ত বেশি। একজন চিকিৎসককে অনেক সময় কয়েক ঘণ্টার মধ্যে শত শত রোগী দেখতে হয়। ফলে রোগীরা পর্যাপ্ত তথ্য বা দিকনির্দেশনা পান না। এই শূন্যস্থান পূরণ করে দালালরা। দ্বিতীয়ত, স্বাস্থ্যসেবার তথ্য সাধারণ মানুষের কাছে সহজলভ্য নয়। একজন রোগী জানেন না কোন হাসপাতালে কোন সেবা আছে, কোন পরীক্ষা কোথায় হবে কিংবা জরুরি পরিস্থিতিতে কী করতে হবে। তথ্যের এই ঘাটতি দালালদের জন্য উর্বর ক্ষেত্র তৈরি করে। তৃতীয়ত, নজরদারির দুর্বলতা। বহুবার অভিযান চালানো হয়েছে, বহুবার দালাল আটক হয়েছে, কিন্তু সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি। কারণ ব্যক্তিকে সরিয়ে দিলেও কাঠামো অপরিবর্তিত থেকেছে। চতুর্থত, সমাজে নৈতিকতার অবক্ষয়। যখন প্রতিটি খাতে দ্রুত অর্থ উপার্জনের প্রবণতা বেড়ে যায়, তখন স্বাস্থ্য খাতও তার বাইরে থাকে না।

মানুষ যখন রোগীর মধ্যে একজন অসহায় মানুষকে নয়, একটি আয়ের উৎসকে দেখতে শুরু করে, তখন দালালচক্র জন্ম নেয়।

কিন্তু এই সমস্যার আরও গভীর একটি দিক রয়েছে, যা খুব কম আলোচনা হয়। দালালচক্র কেবল অর্থনৈতিক সমস্যা নয়; এটি সামাজিক বৈষম্যেরও প্রতিচ্ছবি। ধনী ব্যক্তি হয়তো পরিচিত চিকিৎসক, ব্যক্তিগত যোগাযোগ কিংবা উন্নত হাসপাতালে যাওয়ার সামর্থ্য রাখেন। কিন্তু দরিদ্র কৃষক, রিকশাচালক, গার্মেন্টস শ্রমিক বা নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষের সেই সুযোগ নেই। ফলে দালালদের প্রথম শিকার হয় তারাই। অর্থাৎ দালালচক্র এমন এক ব্যবস্থা, যা সমাজের সবচেয়ে দুর্বল মানুষদের আরও দুর্বল করে তোলে। একজন কৃষক হয়তো ফসল বিক্রি করে চিকিৎসার টাকা জোগাড় করেছেন, একজন মা হয়তো নিজের গয়না বিক্রি করেছেন সন্তানের অপারেশনের জন্য, একজন বৃদ্ধ হয়তো জীবনের শেষ সঞ্চয়টুকু নিয়ে হাসপাতালে এসেছেন; তাদের এই ত্যাগ যখন কমিশনভিত্তিক বাণিজ্যের অংশ হয়ে যায়, তখন তা কেবল আর্থিক শোষণ নয়; এটি মানবিক শোষণ।

আরও উদ্বেগজনক হলো, এই পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাস্থ্যসেবাকে একটি ভোগ্যপণ্যে পরিণত করছে। রোগী তখন নাগরিক নয়, গ্রাহক। হাসপাতাল তখন সেবাকেন্দ্র নয়, বাজার। চিকিৎসা তখন মানবিক দায়িত্ব নয়, বিক্রয়যোগ্য প্যাকেজ। আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন চিকিৎসা প্রযুক্তি দ্রুত উন্নত হচ্ছে। আধুনিক যন্ত্রপাতি, উন্নত অস্ত্রোপচার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক রোগ নির্ণয়; সবকিছুই স্বাস্থ্যসেবাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, প্রযুক্তির এই অগ্রগতি কি মানুষের প্রতি সহমর্মিতাও বাড়াচ্ছে? যদি হাসপাতালের করিডোরে একজন অসহায় রোগী এখনও দালালের হাতে জিম্মি হন, তাহলে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন মানবিক উন্নয়নে রূপান্তরিত হয়নি।

এখন প্রশ্ন হতে পারে, এই সমস্যার সমাধান কী? প্রথমত, হাসপাতালগুলোকে রোগীবান্ধব করতে হবে। তথ্যকেন্দ্র, স্বেচ্ছাসেবক, ডিজিটাল নির্দেশনা এবং সহজ অভিযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে রোগীকে সরাসরি সেবা নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, কমিশনভিত্তিক রোগী বাণিজ্যের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে। তৃতীয়ত, স্বাস্থ্যখাতে জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা বাড়াতে হবে। রোগীর অধিকার সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। চতুর্থত, চিকিৎসা শিক্ষায় নৈতিকতাকে আরও গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ একজন দক্ষ চিকিৎসক তৈরি করা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, একজন মানবিক চিকিৎসক তৈরি করা তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ।

সবশেষে একটি প্রশ্ন থেকেই যায়, একটি সভ্যসমাজে হাসপাতালের প্রকৃত পরিচয় কী? এটি কি এমন একটি স্থান, যেখানে মানুষের দুর্বলতা বিক্রি হয়? নাকি এমন একটি আশ্রয়, যেখানে মানুষ জীবনের সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তে সহমর্মিতা খুঁজে পায়? এই প্রশ্নের উত্তর শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কিংবা চিকিৎসকদের নয়; এটি পুরো সমাজের কাছে নৈতিক জবাবদিহিতার প্রশ্ন। কারণ হাসপাতালের দালালচক্র আসলে স্বাস্থ্যখাতের কোনো বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়। এটি আমাদের সামাজিক বিবেকের আয়না। সেখানে আমরা দেখতে পাই, মানুষের অসুস্থতা থেকেও মুনাফা করার প্রবণতা কতটা গভীরে পৌঁছেছে। যে সমাজে রোগীর কান্না কমিশনের অঙ্কে পরিণত হয়, যে সমাজে চিকিৎসা সেবা নয় বরং ব্যবসায়িক চুক্তিতে রূপ নেয়, সে সমাজের উন্নয়ন যতই হোক, তার মানবিকতা অপূর্ণ থেকে যায়। রাষ্ট্রের উন্নয়ন শুধু উঁচু ভবন, বড় সড়ক বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দিয়ে মাপা যায় না। একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত উন্নয়ন বোঝা যায় তার হাসপাতালের করিডোরে, সেখানে একজন অসহায় রোগী কতটা সম্মান, নিরাপত্তা ও ন্যায্যসেবা পাচ্ছেন, তার মাধ্যমে। আর যতদিন হাসপাতালের গেটে দালাল দাঁড়িয়ে থাকবে, ততদিন আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার সামনে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন ঝুলে থাকবে, আমরা কি সত্যিই চিকিৎসাকে সেবা হিসেবে দেখি, নাকি এটিকে শুধু আরেকটি লাভজনক ব্যবসায় পরিণত করেছি?

আরিফুল ইসলাম রাফি

শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়