বাংলাদেশের মাছে মাইক্রোপ্লাস্টিক, বাজারের রুপালি ইলিশ কতটা নিরাপদ

আল শাহারিয়া

প্রকাশ : ০২ জুন ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাঙালির খাবার প্লেটে এক টুকরো ইলিশ মানেই যেন অমৃত। গরম ধোঁয়া ওঠা ভাতের সঙ্গে সর্ষে ইলিশ বা ইলিশ ভাজার ঘ্রাণ আমাদের রসনার তৃপ্তিকে এক অন্য মাত্রায় নিয়ে যায়। ‘মাছে ভাতে বাঙালি’ কথাটি আমাদের সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কিন্তু আপনি কি জানেন শখের এই মাছের সঙ্গে আমরা প্রতিদিন কী খাচ্ছি? আমরা কি কেবল প্রোটিন গ্রহণ করছি নাকি অজান্তেই শরীরে বিষ ঢোকাচ্ছি? সাম্প্রতিক গবেষণার ফলাফল আমাদের এই প্রশ্নগুলো করতে বাধ্য করছে। আমাদের প্রিয় ইলিশ এবং বাজারের অন্যান্য মাছের শরীরে এখন নীরব ঘাতক মাইক্রোপ্লাস্টিকের ভয়াবহ উপস্থিতি পাওয়া যাচ্ছে। এই অদৃশ্য প্লাস্টিক কণা আমাদের খাদ্যচক্রে এমনভাবে মিশে গেছে যা রীতিমতো শিউরে ওঠার মতো ঘটনা।

মাইক্রোপ্লাস্টিক হলো পাঁচ মিলিমিটারের চেয়ে ছোট প্লাস্টিকের কণা। আমরা দৈনন্দিন জীবনে যে পলিথিন, শ্যাম্পুর বোতল বা চিপসের প্যাকেট ব্যবহার করি সেগুলো একসময় খাল-বিল ও নদীতে গিয়ে পড়ে। বছরের পর বছর রোদে পুড়ে এবং পানির স্রোতের আঘাতে ভেঙে এগুলো অতি ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হয়। একে বলা হয় সেকেন্ডারি মাইক্রোপ্লাস্টিক। এছাড়া ফেসওয়াশ, টুথপেস্ট বা প্রসাধনীতে থাকা মাইক্রোবিডস সরাসরি ড্রেনের পানির সঙ্গে মিশে নদীতে চলে যায়। এগুলো প্রাইমারি মাইক্রোপ্লাস্টিক। নদীর মাছ খাবার মনে করে এই ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণাগুলো গিলে ফেলে। মাছের পেট থেকে এই বিষাক্ত কণা অত্যন্ত সহজেই চলে আসে আমাদের খাবার টেবিলে।

বাংলাদেশের নদী এবং বঙ্গোপসাগরের মাছে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়ে বেশ কয়েকটি উদ্বেগজনক গবেষণা হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকুয়াটিক জুলজি রিসার্চ গ্রুপ এবং সাস্টের মেরিন সায়েন্স বিভাগের বিজ্ঞানীদের যৌথ গবেষণায়, যা যুক্তরাজ্যভিত্তিক জার্নাল Water, Air, & Soil Pollution -এ ২০২৫ সালে প্রকাশিত হয়েছিল, ইলিশ মাছের অন্ত্র, যকৃত ও মাংসপেশির টিস্যুতে মাইক্রোপ্লাস্টিক কণার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় বাজার থেকে সংগ্রহ করা ইলিশ, রুই, কাতলা ও তেলাপিয়াসহ প্রায় পনেরোটি প্রজাতির মাছের ওপর পরীক্ষা চালানো হয়। ফলাফলে দেখা যায় প্রায় ৭৩ থেকে ৭৪ শতাংশ মাছের শরীরেই প্লাস্টিকের কণা রয়েছে।

সবচেয়ে আতঙ্কের বিষয় হলো সামুদ্রিক মাছের মধ্যে ইলিশের শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিকের ঘনত্ব অনেক বেশি পাওয়া গেছে। ইলিশ মূলত একটি পরিযায়ী মাছ। এটি ডিম ছাড়ার জন্য বঙ্গোপসাগর থেকে স্রোতের বিপরীতে মেঘনা ও পদ্মা নদীতে ছুটে আসে। এই দীর্ঘ যাত্রাপথে তারা নদী ও সাগরের দূষিত পানি থেকে প্রচুর পরিমাণে মাইক্রোপ্লাস্টিক গ্রহণ করে। ইলিশ মূলত পানি ছেঁকে খাবার খায়, ফলে দূষিত পানির স্তর অতিক্রম করার সময় এবং প্লাঙ্কটনের সঙ্গে প্রচুর প্লাস্টিক কণা এদের শরীরে প্রবেশ করে। ঢাকা শহরের চারপাশের নদীগুলো থেকে যে পরিমাণ প্লাস্টিক বর্জ্য প্রতিদিন বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পড়ছে তার চরম শিকার হচ্ছে এই রুপালি ইলিশ। অনেকেই ভাবতে পারেন মাছ কাটার সময় তো আমরা নাড়িভুঁড়ি ফেলে দিই। তাহলে প্লাস্টিক আমাদের শরীরে কীভাবে প্রবেশ করবে? বিজ্ঞানীদের মতে মাইক্রোপ্লাস্টিক শুধু মাছের পাকস্থলীতেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এগুলো এতই ক্ষুদ্র যে রক্তনালীর মাধ্যমে তা মাছের পেশি বা মাংসেও প্রবেশ করতে পারে। আর মাছ উচ্চতাপে রান্না করলেও এই প্লাস্টিক নষ্ট হয় না। প্লাস্টিক কণাগুলোর একটি মারাত্মক বৈশিষ্ট্য হলো এরা চুম্বকের মতো কাজ করে। পানির অন্যান্য ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ এবং ভারী ধাতু যেমন সিসা, ক্যাডমিয়াম বা পারদকে এরা সহজেই আকর্ষণ করে নিজেদের গায়ে আটকে রাখে। ফলে মাইক্রোপ্লাস্টিকের সঙ্গে সঙ্গে এই ভয়ংকর ভারী ধাতুগুলো আমাদের শরীরে প্রবেশ করছে।

চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে দীর্ঘমেয়াদে মাইক্রোপ্লাস্টিক শরীরে প্রবেশ করলে তা মানুষের হরমোন ব্যবস্থাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে। এটি কিডনি বিকল হওয়া, প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস এবং ক্যান্সারের মতো মরণব্যাধির ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। গর্ভবতী মায়ের শরীর থেকে প্লাসেন্টার মাধ্যমে এই বিষাক্ত কণা অনাগত সন্তানের শরীরেও প্রবেশ করতে পারে। এটি কোনো কাল্পনিক ভীতির কথা নয়। দেশি-বিদেশি চিকিৎসা সাময়িকীগুলোতে মানুষের রক্ত এবং ফুসফুসে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়ার খবর এরইমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে। আমরা প্রতিনিয়ত একটু একটু করে নিজেদের মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছি।

আমাদের কাঁচাবাজারগুলোতে যে মাছ বিক্রি হচ্ছে তার প্রায় পুরোটাই কোনো না কোনোভাবে দূষিত পানির শিকার। বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা বা বালু নদীর ভয়াবহ দূষণের কথা আমরা সবাই জানি। এই দূষিত পানিতে চাষ করা মাছও এখন আর নিরাপদ নয়। বাণিজ্যিক মাছের খামারে ব্যবহৃত ফিড বা খাবারেও অনেক সময় মাইক্রোপ্লাস্টিকের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। বিষয়টি শুধু জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি নয়। এটি আমাদের অর্থনীতির জন্যও একটি চরম অশনিসংকেত। বাংলাদেশ প্রতি বছর প্রচুর পরিমাণে মাছ বিদেশে রপ্তানি করে। ইলিশ আমাদের মর্যাদাপূর্ণ বা জিআই পণ্য। আন্তর্জাতিক বাজারে যদি আমাদের মাছে সহনশীল মাত্রার চেয়ে বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক বা ভারী ধাতু ধরা পড়ে তবে পুরো রপ্তানি বাজার রাতারাতি ধসে পড়বে। এতে হাজার হাজার মৎস্যজীবী এবং ব্যবসায়ী পথে বসবেন। আমাদের সম্ভাবনাময় ব্লু ইকোনমি বিনষ্ট হবে।

এই ভয়াবহ পরিস্থিতির জন্য আসলে দায়ী কে? এর দায় আমাদের সবার। আমরা প্রতিদিন টন টন প্লাস্টিক বর্জ্য কোনো পরিশোধন ছাড়াই সরাসরি প্রকৃতিতে ফেলে দিচ্ছি। আমাদের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার চরম ত্রুটি নদীগুলোকে প্লাস্টিকের ভাগাড়ে পরিণত করেছে। শহরের ড্রেন থেকে শুরু করে শিল্পকারখানার তরল বর্জ্য কোনো বাধা ছাড়াই নদীতে মিশছে। নদীর তলদেশে এখন কয়েক ফুট পুরু পলিথিনের স্তর জমে আছে।

আল শাহারিয়া

শিক্ষার্থী, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়