কোরবানি ঈদের এপিঠ-ওপিঠ
ফকরুল মাহমুদ আনাম নূর
প্রকাশ : ০২ জুন ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
মুসলমানদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব ঈদুল আজহা। আত্মত্যাগ, সহমর্মিতা ও মানবিকতার শিক্ষা নিয়ে প্রতিবছর এই উৎসব আসে মুসলিম উম্মাহর দ্বারে। হযরত ইবরাহিম (আ.)-এর মহান ত্যাগের স্মৃতিকে ধারণ করে সারা বিশ্বের মুসলমানরা কোরবানি আদায় করেন। তবে এই উৎসবকে ঘিরে যেমন রয়েছে আনন্দ, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও সামাজিক সম্প্রীতির অসংখ্য ইতিবাচক দিক, তেমনি রয়েছে কিছু বেদনা, বৈষম্য ও অনিয়মের চিত্রও। তাই কোরবানি ঈদের রয়েছে এক উজ্জ্বল এপিঠ, আবার কিছু অন্ধকার ওপিঠও।
ঈদুল আজহার প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হলো কোরবানির পশু। উৎসবের প্রস্তুতি শুরু হয় ঈদেরও প্রায় এক বছর আগে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের খামারি ও পশুপালকরা ছোট গরু, ছাগল ও ভেড়া লালন-পালন করে কোরবানির উপযোগী করে তোলেন। এরপর সেগুলো হাটে বিক্রি করে লাভের আশায় থাকেন। অনেক পরিবারের জীবিকা সম্পূর্ণভাবে এই পশুপালনের ওপর নির্ভরশীল। তবে যারা আমাদের ঈদের আনন্দকে পূর্ণতা দেন, তাদের জীবন অনেক সময় অনিশ্চয়তায় ঘেরা থাকে। অধিকাংশ খামারিকেই ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে কাজ করতে হয়। পশুখাদ্যের দাম বৃদ্ধি, রোগব্যাধি কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে অনেক সময় তারা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পশু হাটে ওঠার আগেই মারা যায়। আবার প্রতারণার শিকার হয়ে অনেকেই সর্বস্বান্ত হন। পরিবারের সচ্ছলতার আশায় দিন-রাত পরিশ্রম করা এসব মানুষের দুর্দশা সত্যিই বেদনাদায়ক।
খামারি ও ক্রেতাদের ঘিরে গড়ে ওঠে পশুর হাট, আর এই হাটকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হয় বিশাল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। কোরবানির ঈদ প্রতিবছর অসংখ্য সাময়িক কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে। কামারশালায় কাজের চাপ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। কোরবানির সরঞ্জাম বিক্রেতা, পরিবহন শ্রমিক, কসাই, এমনকি অনেক রিকশা ও ভ্যানচালকও অতিরিক্ত আয় করার সুযোগ পান। ফলে ঈদ শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং একটি বৃহৎ অর্থনৈতিক চক্রেরও অংশ। তবে এই অর্থনীতিকে ঘিরে নানা অনিয়মও দেখা যায়।
হাট ইজারা, বাজার নিয়ন্ত্রণ কিংবা পশুর দাম নির্ধারণে অনেক সময় সিন্ডিকেট ও রাজনৈতিক প্রভাব কাজ করে। কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে অতিরিক্ত মুনাফা লাভের অভিযোগও প্রায়ই শোনা যায়। পেটের দায়ে কিংবা পড়াশোনার প্রয়োজনে অনেক মানুষ পরিবার থেকে দূরে থাকেন। তাই ঈদ এলেই নাড়ির টানে সবাই ছুটে যেতে চান আপন ঠিকানায়। কিন্তু ঈদযাত্রা অনেকের জন্য হয়ে ওঠে ভোগান্তির আরেক নাম। ট্রেন ও বাসের টিকিট সংগ্রহ করতে গিয়ে মানুষকে নানাভাবে হয়রানির শিকার হতে হয়। অনলাইন টিকিট বিক্রি শুরু হওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই টিকিট শেষ হয়ে যায়। আবার কালোবাজারির কারণেও অনেক যাত্রী কাঙ্ক্ষিত টিকিট পান না।
অনেক সময় সিট না পেয়ে যাত্রীরা ট্রেনের ছাদে বা দরজার পাশে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে ভ্রমণ করেন। অন্যদিকে বাসভাড়াও বেড়ে যায়। যাঁদের বাস বা ট্রেনের টিকিট কেনার সামর্থ্য নেই, তারা অনেক সময় ট্রাক বা পিকআপে যাতায়াত করেন, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
প্রায় প্রতিবছরই ঈদযাত্রায় দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। ফলে বাড়ি ফেরার আনন্দ অনেক পরিবারের জন্য পরিণত হয় শোকে। ঈদের আগে পশুর হাটে দেখা যায় সমাজের আরেক বাস্তব চিত্র।
কেউ সামান্য সঞ্চয় নিয়ে একটি খাসি বা গরুর অংশ কিনতে আসেন, আবার কেউ কয়েক লাখ কিংবা কোটি টাকা মূল্যের পশু কিনে আলোচনায় আসেন। একই সমাজে বসবাসকারী মানুষের আর্থিক সক্ষমতার এই বিশাল বৈষম্য অনেক প্রশ্নের জন্ম দেয়। অনেক সময় কোরবানি ইবাদতের চেয়ে প্রদর্শনের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়, যা কুরবানির প্রকৃত চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
কুরবানির চূড়ান্ত সৌন্দর্য ফুটে ওঠে মাংস বণ্টনের মাধ্যমে। এর ফলে দরিদ্র মানুষও ভালো খাবার খাওয়ার সুযোগ পান এবং সমাজে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ববোধ জোরদার হয়। ধনী ও গরিবের মধ্যে সম্পর্কের একটি মানবিক সেতুবন্ধন তৈরি হয়। তবে কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায়, কোরবানির মাংস যথাযথভাবে বণ্টন করা হয় না। ফলে অনেক অসহায় মানুষ তাদের প্রাপ্য অংশ থেকে বঞ্চিত হন। কোরবানি মূলত ত্যাগের শিক্ষা দেয়।
এটি শুধু পশু জবাইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং লোভ, অহংকার ও স্বার্থপরতাকে বিসর্জন দেওয়ারও শিক্ষা দেয়।
তাই কোরবানির প্রকৃত তাৎপর্য তখনই পূর্ণতা পায়, যখন এর মাধ্যমে সমাজে সাম্য, সহমর্মিতা ও মানবিকতা প্রতিষ্ঠিত হয়। সব মিলিয়ে কোরবানি ঈদের রয়েছে দুটি দিক একটি আনন্দ, ত্যাগ, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও মানবিকতার; অন্যটি বৈষম্য, ভোগান্তি, অনিয়ম ও বেদনার। এই উৎসবের প্রকৃত সৌন্দর্য রক্ষা করতে হলে আমাদের শুধু পশু কুরবানিই নয়, বরং নিজেদের সংকীর্ণতা, লোভ ও অসচেতনতাকেও কোরবানি দিতে হবে। তাহলেই ঈদুল আজহা হয়ে উঠবে সত্যিকারের আত্মত্যাগ ও মানবকল্যাণের উৎসব।
ফকরুল মাহমুদ আনাম নূর
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
