বাসযোগ্য পৃথিবীর খোঁজে বিপন্ন এই বিশ্ব
ফয়সল আহমদ বাবুল
প্রকাশ : ০৩ জুন ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
পৃথিবী কখনও তর্ক করে না, আলোচনা করে না। কোনো বিতর্কে জড়ায় না। কোনো সমঝোতাও চায় না। সে তার সংকেত পাঠায়। কোথাও দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ, কোথাও ভয়াবহ দাবানল। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে। দ্রুত গলে যাচ্ছে হিমবাহ। জলবায়ু পরিবর্তন আজ বিশ্বের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। এর প্রভাব প্রতিদিনই আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। প্রকৃতি যেন নীরবে তার বিপদের বার্তা জানিয়ে দিচ্ছে। মানুষ ও প্রকৃতি উভয়ই এর ক্ষতির শিকার হচ্ছে। এসব ঘটনা আর ভবিষ্যতের কোনো আশঙ্কা নয়। এগুলো বর্তমান বিশ্বের বাস্তব চিত্র। এই বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলার গুরুত্ব তুলে ধরতেই ২০২৬ সালের বিশ্ব পরিবেশ দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ক্লাইমেট অ্যাকশন বা জলবায়ু কার্যক্রম। প্রতিপাদ্যটি সবাইকে পরিবেশ রক্ষায় সচেতন ও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানায়। টেকসই ভবিষ্যৎ গড়তে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। জলবায়ু সুরক্ষায় এখনই উদ্যোগী হওয়া সময়ের দাবি।
বিশ্ব পরিবেশ দিবসের যাত্রা শুরু হয় ১৯৭২ সালে। জাতিসংঘের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত স্টকহোম সম্মেলনের পর এ দিবসের সূচনা করা হয়। ১৯৭৩ সাল থেকে ৫ জুন এটি বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে। বর্তমানে ১৫০টিরও বেশি দেশ দিবসটি পালন করে। পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ আন্তর্জাতিক আয়োজন। প্রতি বছর একটি নির্দিষ্ট প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়। সেই প্রতিপাদ্যের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত সমস্যাগুলো তুলে ধরা হয়। এটি জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। একই সঙ্গে পরিবেশ সুরক্ষায় সবাইকে আরও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানায়।
২০২৬ সালের বিশ্ব পরিবেশ দিবসের বৈশ্বিক আয়োজন অনুষ্ঠিত হবে আজারবাইজানের রাজধানী বাকুতে। পূর্ব ও পশ্চিমের সংযোগস্থলে অবস্থিত দেশটি ঐতিহাসিক সিল্ক রোডের অংশ। প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যে আজারবাইজান অত্যন্ত সমৃদ্ধ। এখানে রয়েছে উপক্রান্তীয় বনাঞ্চল, পাহাড়ি অঞ্চল ও তৃণভূমি। দেশের বিভিন্ন স্থানে ভিন্ন ভিন্ন জলবায়ুর বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। এ কারণে এখানে গড়ে উঠেছে সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য। নানা প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণীর আবাসস্থল হিসেবে দেশটি বিশেষ পরিচিত। প্রকৃতি ও পরিবেশ সংরক্ষণে আজারবাইজান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় আজারবাইজান নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। দেশটি প্যারিস চুক্তির সদস্য। সে অনুযায়ী ১৯৯০ সালের তুলনায় ২০৩৫ সালের মধ্যে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন ৪০ শতাংশ কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর দিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ২০৩০ সালের মধ্যে এ খাতের অংশ ৩০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ উদ্দেশ্যে বড় বড় সৌরবিদ্যুৎ ও বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন ব্যবস্থাও সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি স্মার্ট সিটি উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এসব পদক্ষেপ টেকসই উন্নয়ন ও পরিবেশ সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
কপ-২৯ আয়োজনের মাধ্যমে আজারবাইজান বৈশ্বিক জলবায়ু নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এই আয়োজন জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতাকে আরও শক্তিশালী করেছে। সেই ধারাবাহিকতায় দেশটি বিশ্ব পরিবেশ দিবস ২০২৬-এর জন্য একটি তাৎপর্যপূর্ণ স্লোগান গ্রহণ করেছে। স্লোগানটি হলো, ইনস্পায়ার্ড বাই নেচার, ফর ক্লাইমেট, ফর আওয়ার ফিউচার। এর বাংলা অর্থ, প্রকৃতি থেকে প্রেরণা, জলবায়ুর জন্য, আমাদের ভবিষ্যতের জন্য। এই বার্তা প্রকৃতির গুরুত্বকে নতুনভাবে তুলে ধরে। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে প্রকৃতি কোনো বিলাসিতা নয়। মানুষের জীবন ও জীবিকার সঙ্গে এর গভীর সম্পর্ক রয়েছে। জলবায়ু সহনশীলতা গড়ে তুলতেও প্রকৃতির ভূমিকা অপরিহার্য। তাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তার জন্য প্রকৃতি সংরক্ষণ অত্যন্ত জরুরি।
বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কে সতর্ক করে আসছেন। তাদের মতে, বৈশ্বিক উষ্ণতা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমিত রাখা জরুরি। তা না হলে মানবসভ্যতা গুরুতর সংকটের মুখে পড়তে পারে। শিল্পায়নের বিস্তার এ সমস্যাকে আরও বাড়িয়েছে। জীবাশ্ম জ্বালানির অতিরিক্ত ব্যবহারও এর একটি প্রধান কারণ। পাশাপাশি নির্বিচারে বন উজাড় পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। ফলে বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাসের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। এর প্রভাবে পৃথিবীর জলবায়ুর স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন। তাদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়। এটি খাদ্য নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি এবং মানবিক নিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি।
সংকটের মাঝেও আশার আলো রয়েছে। বিশ্বের অনেক দেশ ইতিবাচক পরিবর্তনের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিভিন্ন স্থানে ঘরের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল স্থাপন করা হচ্ছে। বায়ুবিদ্যুৎ টারবাইনও জ্বালানি উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। পরিবেশবান্ধব নগর পরিকল্পনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি বনভূমি পুনরুদ্ধারে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে। এসব পদক্ষেপ একটি সবুজ ও টেকসই ভবিষ্যতের বার্তা বহন করে। বিশ্ব পরিবেশ দিবস ২০২৬-এর প্রচারণায় এসব বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়ানোর আহ্বান জানানো হয়েছে।
কার্বন নিঃসরণ কমানোর প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে বন সংরক্ষণ ও টেকসই জীবনধারা গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য ‘জলবায়ু কার্যক্রম’ প্রতিপাদ্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। এ দেশের মানুষ এরইমধ্যে এর নানা প্রভাব অনুভব করছে। উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাচ্ছে। অনেক স্থানে নদীভাঙন ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও বন্যা নিয়মিত ক্ষয়ক্ষতি ডেকে আনছে। এসব দুর্যোগে প্রতিবছর লাখো মানুষের জীবন ও জীবিকা হুমকির মুখে পড়ে। কৃষি উৎপাদনও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। নিরাপদ পানির সংকট দিন দিন বাড়ছে। অনেক মানুষ বসতভিটা হারিয়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে পরিবেশ উদ্বাস্তু মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই বাস্তবতায় জলবায়ু কার্যক্রম বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত জরুরি। এটি শুধু পরিবেশ সুরক্ষার বিষয় নয়। এটি দেশের মানুষ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম।
এই বাস্তবতায় সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে। পরিবেশ সুরক্ষায় ছোট ছোট উদ্যোগও বড় পরিবর্তন আনতে পারে। বিদ্যুৎ ও পানির সাশ্রয়ী ব্যবহার প্রয়োজন। বেশি বেশি বৃক্ষরোপণ করতে হবে। প্লাস্টিকের ব্যবহার কমাতে হবে। পরিবেশবান্ধব পরিবহন ব্যবহারে উৎসাহিত হতে হবে। একই সঙ্গে সচেতন ও দায়িত্বশীল জীবনযাপন গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে পরিবেশ শিক্ষা জোরদার করতে হবে। গণমাধ্যমকে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে। সামাজিক সংগঠনগুলোকেও এগিয়ে আসতে হবে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মকে সম্পৃক্ত করা জরুরি। তাদের মধ্যে বিজ্ঞানভিত্তিক চিন্তা গড়ে তুলতে হবে। পরিবেশবান্ধব মূল্যবোধ চর্চায় উদ্বুদ্ধ করতে হবে। টেকসই ভবিষ্যৎ গড়তে এটি সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দাবি।
বিশ্ব পরিবেশ দিবস ২০২৬ আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য স্মরণ করিয়ে দেয়। পৃথিবী কারও জন্য অপেক্ষা করে না। সে প্রতিনিয়ত তার সংকেত পাঠিয়ে যাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব দিন দিন আরও স্পষ্ট হচ্ছে। তাই এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব আমাদের। জলবায়ু কার্যক্রম শুধু একটি প্রতিপাদ্য নয়। এটি মানবজাতির প্রতি একটি জরুরি আহ্বান। এই আহ্বান আমাদের দায়িত্বশীল ও সক্রিয় হতে উৎসাহিত করে। পরিবেশ রক্ষা আজ সময়ের অন্যতম চাহিদা। কারণ পরিবেশ সুরক্ষা মানে শুধু প্রকৃতিকে রক্ষা করা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের জীবন, স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ। আগামী প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ পৃথিবী গড়ে তোলাও এর লক্ষ্য। একই সঙ্গে এটি সুন্দর, বাসযোগ্য ও মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠার পথ দেখায়। তাই জলবায়ু সুরক্ষায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
ফয়সল আহমদ বাবুল
সিনিয়র শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক, সিরাজুল ইসলাম আলিম মাদ্রাসা, সিলেট
