বাজেট হোক শিক্ষাবান্ধব

মো. আব্দুল্লাহ খান

প্রকাশ : ০৪ জুন ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

একটি দেশের ভবিষ্যতের নীল-নকশা হলো তার জাতীয় বাজেট। আমি মনে করি সেই নকশার প্রাণভোমরা হলো শিক্ষা খাতে বরাদ্দের পরিমাণ। অল্প কয়েকদিন পরেই জাতীয় অর্থবছর ২০২৬-২০২৭-এর জন্য বাজেট ঘোষণা করা হবে। বাজেট নিয়ে শুরু হবে নানা আলোচনা-সমালোচনা। প্রতি বছর যখন জাতীয় বাজেট ঘোষিত হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই অবয়ব পায় এক হিসাব-নিকাশের খতিয়ান। অর্থনীতিবিদরা জিডিপির শতাংশ মাপেন, রাজস্ব আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের সঙ্গতি খোঁজেন, আর সাধারণ মানুষ খোঁজেন করের বোঝা কতটা বাড়ল বা কমল। কিন্তু এসব হিসাবের আড়ালে যে প্রশ্নটি সবচেয়ে নিভৃতে, অথচ সবচেয়ে শক্তিশালীভাবে উঁকি দেয়, তা হলো- আমরা আসলে কেমন শিক্ষা চাই আর তার জন্য কেমন বাজেট তৈরি করছি?

বাজেটের খেরোখাতায় শিক্ষা খাতের বরাদ্দ শুধু কিছু সংখ্যার যোগ বা বিয়োগ নয়, এটি আসলে একটি জাতির আত্মপরিচয় ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের দলিল হিসেবে কাজ করে। ‘শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড’ এই প্রবাদ বাক্যটি আমদের সবারই জানা। কিন্তু আমরা যদি বিগত কয়েক দশকের বাজেট বিশ্লেষণ করি তাহলে একটি নির্মম সত্য সামনে আসে- আমাদের শিক্ষা খাতের বাজেট যেন এক চাকাওয়ালা ভাঙা গাড়ির মতো, যা জোড়াতালি দিয়ে কোনোমতে টেনে নেওয়া হচ্ছে। ইউনেস্কোর দেওয়া মানদণ্ড অনুযায়ী, একটি দেশের শিক্ষা খাতে মোট জিডিপির অন্তত ৪ থেকে ৬ শতাংশ অথবা মোট বাজেটের ২০ শতাংশ বরাদ্দ থাকা উচিত। অথচ আমাদের দেশে এই বরাদ্দ বছরের পর বছর ধরে জিডিপির ২ শতাংশের নিচে এবং মোট বাজেটের ১০ থেকে ১১ শতাংশের আশপাশে ঘুরপাক খাচ্ছে। এখন আমাদের প্রশ্ন হলো, এই সীমিত বরাদ্দ দিয়ে আমরা কেমন শিক্ষা নিশ্চিত করতে পারছি? আমাদের শিক্ষা বাজেটের একটি বড় অংশ ব্যয় হয় উন্নয়ন খাতের বাহিরে, যার মধ্যে রয়েছে শিক্ষক-কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা ও প্রশাসনিক ব্যয়। বাকি যে টুকু উন্নয়নমূলক কাজের জন্য বাজেট থাকে, তার সিংহভাগ চলে যায় দৃশ্যমান অবকাঠামো নির্মাণে- নতুন ভবন, সীমানা প্রাচীর তৈরি বা আসবাবপত্র কেনা ইত্যাদি । সন্দেহ নেই, শিক্ষার জন্য ভৌত অবকাঠামো প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের প্রশ্ন হলো; শুধু চাকচিক্য দেয়াল আর বহুতল ভবন কি মানসম্মত শিক্ষার গ্যারান্টি দিতে পারে? ভবন হচ্ছে, কিন্তু সেই ভবনের ভেতরে ল্যাবরেটরিতে আধুনিক যন্ত্রপাতি নেই, লাইব্রেরিতে নতুন বই নেই। সবচেয়ে বড় কথা, যে শিক্ষকেরা সেখানে পড়াবেন, তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন ও আধুনিক প্রশিক্ষণের জন্য বাজেটে পর্যাপ্ত বরাদ্দ থাকে না। ফলে আমরা অবকাঠামো পাচ্ছি সত্যি, কিন্তু শিক্ষার মান সত্যিকার অর্থে উন্নত হচ্ছে না। মেধার ও সৃজনশীলতার বিকাশ বাদ দিয়ে শুধু ইট-পাথরের দালান তোলার এই প্রবণতা শিক্ষাকে ভেতর থেকে ফাঁপা করে দিচ্ছে। বিশ্বজুড়ে এখন চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের হাওয়া বইছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা সায়েন্স, অটোমেশনের এই যুগে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে যুগোপযোগী করার কথা বলা হচ্ছে প্রতিনিয়ত। সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই নতুন শিক্ষাক্রম প্রবর্তন করা হয়েছে, যেখানে মুখস্থবিদ্যার চেয়ে বাস্তবমুখী ও অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিক্ষাকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু খাতাণ্ডকলমে এই রূপান্তর যতটা চমৎকার, বাস্তবে তা বাস্তবায়ন করা ততটাই ব্যয়বহুল ও চ্যালেঞ্জিং। অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিক্ষার জন্য প্রয়োজন আধুনিক ল্যাব, প্রযুক্তিগত সহায়তা, ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা এবং শিক্ষকদের নিবিড় প্রশিক্ষণ। আপনার মনেও প্রশ্ন জাগতে পারে, বর্তমানের শিক্ষা বাজেট কি এই বিশাল রূপান্তরের খরচ জোগাতে প্রস্তুত? উত্তরটা খুব একটা আশাব্যাঞ্জক নয়। কেননা, বাজেট বাড়লে তা শুধু মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখার জন্য বাড়ে, শিক্ষার কাঠামোগত রূপান্তরের জন্য যে বিশাল অঙ্কের বিশেষ তহবিল প্রয়োজন, তার প্রতিফলন কিন্তু বাজেটে দেখা যায় না।

আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দিকে তাকালে এক চরম হতাশার চিত্র ফুটে ওঠে। বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র‍্যাংকিংয়ে আমাদের পিছিয়ে থাকার অন্যতম প্রধান কারণ গবেষণায় বরাদ্দের অভাব। একটি দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মূল কাজ শুধু ডিগ্রি দেওয়া নয়, বরং নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করা। অথচ আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণার জন্য যে বরাদ্দ দেওয়া হয়, তা অনেক সময় মোট বাজেটের ১ শতাংশেরও কম। গবেষণাগারে আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাব, আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রবন্ধ প্রকাশের তহবিলের অভাব এবং শিক্ষকদের গবেষণায় উদ্বুদ্ধ করার মতো স্কলারশিপের ঘাটতির কারণে আমাদের উচ্চশিক্ষা আজ সার্টিফিকেট বিতরণের কারখানায় পরিণত হয়েছে। যেই দেশে গবেষণার বাজেট একটি বিলাসিতা হিসেবে দেখা হয়, সেই দেশে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ বা স্মার্ট সিটিজেন গড়ার স্বপ্ন দেখা শুধুই স্বপ্ন। আমার মতে, আমাদের শিক্ষা বাজেটের অন্যতম বড় গলদ হলো, এটি সমাজে বিদ্যমান শিক্ষাগত বৈষম্য দূর করতে পারছে না, বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা বাড়িয়ে দিচ্ছে। সরকারি অর্থায়নের ঘাটতি থাকার কারণে শিক্ষার ব্যয়ভার ক্রমান্বয়ে অভিভাবকের কাঁধে তুলে দেয়া হচ্ছে। ইউনেস্কোর এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বাংলাদেশে শিক্ষার মোট ব্যয়ের একটি বিশাল অংশ (প্রায় ৭০ শতাংশের বেশি) শিক্ষার্থীদের বহন করতে হয়- যা দক্ষিণ এশিয়ায় মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ। অন্যদিকে কোচিং বাণিজ্যের লাগাম টানা যাচ্ছে না, কারণ ক্লাসরুমে পর্যাপ্ত মনিটরিং ও শিক্ষকদের উপযুক্ত সম্মানী নিশ্চিত করার মতো বাজেট নেই। ধনী পরিবারের সন্তানরা নামী দামী ইংরেজি মাধ্যম বা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চ মূল্যে শিক্ষা কিনছে, আর দরিদ্র পরিবারের সন্তানরা সরকারি শিক্ষার নামে মানহীন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার শিকার হচ্ছে। বাজেটে যদি প্রান্তিক পর্যায়ের ও সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ উপবৃত্তি ও মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার জন্য বিশেষ বরাদ্দ না থাকে, তবে এই বাজেট শুধু বৈষম্যকেই পুনরুৎপাদন করবে।

আমরা যদি সত্যিই একটি সমতাভিত্তিক, প্রগতিশীল এবং উন্নত রাষ্ট্র গঠন করতে চাই, তবে শিক্ষাবাজেট নিয়ে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। শিক্ষা খাতকে অনুৎপাদনশীল খাত ভাবার মানসিকতা ত্যাগ করে একে ‘সেরা বিনিয়োগ’ হিসেবে গণ্য করতে হবে। আগামী বাজেটগুলোতে পর্যায়ক্রমে জিডিপির অন্তত ৪ শতাংশ বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে। দক্ষ ও মেধাবীদের শিক্ষকতা পেশায় আকৃষ্ট করতে আকর্ষণীয় বেতন কাঠামো ও নিয়মিত উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য বাজেটে সুনির্দিষ্ট কোটা থাকতে হবে। উচ্চশিক্ষায় গবেষণার জন্য একটি স্বাধীন ও বড় অংকের জাতীয় তহবিল গঠন করা প্রয়োজন, যা শুধু উদ্ভাবনী প্রজেক্টে ব্যয় করা হবে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রতিটি সরকারি স্কুলে উচ্চগতির ইন্টারনেট ও ল্যাব নিশ্চিত করার জন্য বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া দরকার, যাতে শহরের সঙ্গে গ্রামের ডিজিটাল বিভাজন কিছুটা হ্রাস পায়। আমাদের মনে রাখতে হবে, শিক্ষা কোনো করুণা বা দয়া নয়, এটি নাগরিকদের মৌলিক অধিকার। কোনো দেশের রাস্তাঘাট, সেতু বা মেগা প্রজেক্টের স্থায়িত্ব কয়েক দশক পর্যন্ত হতে পারে, কিন্তু শিক্ষা খাতে সঠিক বিনিয়োগের সুফল যুগ যুগ ধরে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রবাহিত হয়। আমরা যদি একটি মুখস্থনির্ভর, সার্টিফিকেট-সর্বস্ব এবং বৈষম্যমূলক সমাজ চাই, তাহলে বর্তমানের এই ঘাটতি ও ঐতিহ্যবাহী বাজেটই যথেষ্ট। কিন্তু আমরা যদি একটি বিজ্ঞানমনস্ক, দক্ষ, মানবিক এবং বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সক্ষম এমন প্রজন্ম গড়তে চাই, তবে বাজেটের খেরোখাতা বদলে ফেলার এখনই সময়।

মো. আব্দুল্লাহ খান

শিক্ষার্থী, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়