জুয়ার নেশায় ধ্বংস হচ্ছে পরিবার

মো: তানভীর আহম্মেদ

প্রকাশ : ০৬ জুন ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বর্তমান সময়ে সমাজের অন্যতম ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি হয়ে উঠেছে জুয়ার আসক্তি। প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নয়ন মানুষের জীবনকে যেমন সহজ করেছে, তেমনি কিছু নেতিবাচক প্রবণতারও বিস্তার ঘটিয়েছে। এর মধ্যে অনলাইন জুয়া অন্যতম। সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘটে যাওয়া বহু মর্মান্তিক ঘটনার পেছনে জুয়ার আসক্তিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। এই নেশা শুধু ব্যক্তির জীবনকেই বিপর্যস্ত করছে না, বরং ধ্বংস করে দিচ্ছে পরিবার, সমাজ ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে।

একসময় জুয়া সীমাবদ্ধ ছিল নির্দিষ্ট কিছু স্থানে। কিন্তু এখন প্রযুক্তির কল্যাণে তা পৌঁছে গেছে মানুষের হাতের মুঠোয়। ফেসবুক, টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রামসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘ক্যাসিনো’, ‘লুডু বেট’, ‘ক্র্যাশ গেম’ কিংবা বিভিন্ন অনলাইন বেটিং প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ২৪ ঘণ্টা জুয়ার আসর বসছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, বেকার যুবক থেকে শুরু করে চাকরিজীবী, রিকশাচালক, এমনকি স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও এই আসক্তির শিকার হচ্ছে।

অনলাইন জুয়া ও বেটিংয়ের মাধ্যমে প্রতি বছর দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হচ্ছে। মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস এবং বিভিন্ন ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থার অপব্যবহার করে এই অবৈধ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। বিশেষ করে করোনা-পরবর্তী সময়ে স্মার্টফোনের সহজলভ্যতা এবং ইন্টারনেট ব্যবহারের ব্যাপক বিস্তারের ফলে অনলাইন জুয়ার প্রসার আরও বেড়ে গেছে।

জুয়ার সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে পরিবার। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, আসক্ত ব্যক্তি জুয়ার টাকা জোগাড় করতে গিয়ে পরিবারের মূল্যবান সম্পদ বিক্রি করে দিচ্ছেন। কারও কারও ক্ষেত্রে বসতভিটা, জমিজমা কিংবা গহনা পর্যন্ত বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি জুয়ায় আসক্ত হয়ে পড়লে পুরো পরিবার আর্থিক সংকটে নিমজ্জিত হয়। সন্তানের শিক্ষা, চিকিৎসা ও দৈনন্দিন ব্যয় নির্বাহ করা কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক নারী পারিবারিক সহিংসতা ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। ফলে বাড়ছে পারিবারিক কলহ, বিচ্ছেদ এবং সামাজিক অস্থিরতা।

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, জুয়া মাদকের মতোই একটি মারাত্মক আসক্তি। এটি মানুষের মস্তিষ্কে ক্ষণিকের আনন্দ ও উত্তেজনা সৃষ্টি করে, যা তাকে বারবার একই কাজের দিকে টেনে নিয়ে যায়। একবার জয়ের অভিজ্ঞতা মানুষকে আরও বড় লাভের আশায় পুনরায় খেলতে উৎসাহিত করে।

ধীরে ধীরে সে নিজের সঞ্চয়, সম্পদ এমনকি ভবিষ্যৎ নিরাপত্তাও হারিয়ে ফেলে।

তরুণদের মধ্যে এই প্রবণতা বৃদ্ধির পেছনে দ্রুত ধনী হওয়ার আকাঙ্ক্ষা, বেকারত্ব, হতাশা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জুয়ার বিজ্ঞাপনের প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সহজে অর্থ উপার্জনের স্বপ্ন দেখিয়ে অনেক প্ল্যাটফর্ম তরুণদের ফাঁদে ফেলছে, যার পরিণতি হয় ভয়াবহ।

জুয়ার এই ভয়ঙ্কর বিস্তার এখনই নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে এটি ভবিষ্যতে মহামারির রূপ নিতে পারে। তাই পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রকে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে। সরকারের উচিৎ অনলাইন জুয়া ও বেটিং পরিচালনাকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা। পাশাপাশি পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে তরুণদের নৈতিক শিক্ষা ও দায়িত্ববোধ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।

সর্বোপরি, জুয়া কোনো বিনোদন নয়; এটি একটি ধ্বংসাত্মক সামাজিক ব্যাধি। এর বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারলেই রক্ষা পাবে পরিবার, বজায় থাকবে সামাজিক স্থিতি এবং নিরাপদ হবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। কারণ একটি সুস্থ পরিবারই একটি সুস্থ সমাজ ও রাষ্ট্রের ভিত্তি।

মো: তানভীর আহম্মেদ

শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা