মাদকের মরণকামড়ে ক্ষতবিক্ষত চট্টগ্রাম : রক্ষকদের মাসোহারা বাণিজ্য ও রাজনৈতিক আশ্রয়ের কালো হাত

এম. সফিউল আজম চৌধুরী

প্রকাশ : ০৬ জুন ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

পাহাড়, নদী আর সমুদ্রের এক অপূর্ব ভৌগোলিক মেলবন্ধনে অনন্য আমাদের দেশের প্রধান বাণিজ্যিক প্রবেশদ্বার ও ঐতিহ্যবাহী বন্দরনগরী চট্টগ্রাম। কিন্তু এই সগৌরব ঐতিহাসিক পরিচয়ের সমান্তরালে এখন এক ভয়ংকর অন্ধকার বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের এই প্রধান জনপদ ও তার আশপাশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল। তা হলো মাদকের অবাধ, অনিয়র্বিত এবং জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পাওয়া সর্বগ্রাসী বিস্তার। শহর থেকে গ্রাম, অভিজাত এলাকা থেকে বস্তি, ওলিগলি থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের নামী-দামী স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের হল এবং আঙিনা- আজ সর্বত্রই মাদকের বিষাক্ত থাবা অত্যন্ত সুস্পষ্ট ও দৃশ্যমান। এখন পরিস্থিতি এমন এক জটিল, মরণঘাতী ও সংবেদনশীল পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, শহর কিংবা দূরবর্তী গ্রাম, সর্বত্রই হাত বাড়ালেই অনায়াসে মিলছে প্রাণঘাতী ইয়াবা, ভয়াবহ ক্রিস্টাল মেথ বা আইস, ফেনসিডিল, হেরোইন, বুপ্রেনরফিন ইনজেকশন, এলএসডি ও ডিএমটির মতো প্রলয়ঙ্কারী মরণনেশা। এই মাদকের নীল দংশনে প্রতিনিয়ত তিলে তিলে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে দেশের মূল চালিকাশক্তি তরুণ ও যুবসমাজ, সম্পূর্ণ বিপথগামী হচ্ছে বিপুল সম্ভাবনাময় ছাত্রসমাজ, আর এর নির্মম সামাজিক ও মানসিক প্রতিক্রিয়ায় নীরবে নিভে যাচ্ছে হাজারও মা-বাবার লালিত স্বপ্ন। মাদক নিয়ন্ত্রণে একাধিক সরকারি বিশেষায়িত সংস্থা দিনরাত মাঠে সক্রিয় থাকা সত্ত্বেও কেন এই মরণখেলা কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছে না, সেই মূল অনুসন্ধানের গভীরে প্রবেশ করলে বেরিয়ে আসে এক অতলান্তিক শক্তিশালী অপরাধ সিন্ডিকেট, প্রশাসনের একশ্রেণির কর্মকর্তার নিয়মিত অবৈধ মাসোহারা এবং ঢ়ড়ষরঃরপধষ ক্ষমতার নগ্ন অপব্যবহারের এক চরম উদ্বেগজনক চিত্র।

ভৌগোলিক ও কৌশলগত অবস্থানের কারণে চোরাচালানিরা চট্টগ্রামকে মাদক পাচারের প্রধান আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ ট্রানজিট রুট এবং সবচেয়ে বড় লোভনীয় বাজার হিসেবে বেছে নিয়েছে। বিশেষ করে প্রতিবেশী মিয়ানমার সীমান্ত সংলগ্ন নাফনদী এবং কক্সবাজারের সুদীর্ঘ ও অরক্ষিত উপকূলীয় পথ ধরে ইয়াবা ও আইসের বিশাল বিশাল চালান প্রতিনিয়ত মৎস্যজীবী বা সাধারণ দরিদ্র বাহকদের মাধ্যমে চট্টগ্রামে প্রবেশ করে। এরপর অত্যন্ত সুনিপুণ কৌশলে তা ছড়িয়ে পড়ে মহানগরের কোতোয়ালী, বাকলিয়া, ডবলমুরিং, খুলশী, চান্দগাঁও, পতেঙ্গাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ও জনবহুল এলাকায়। এই চক্রের মূল হোতারা এখন সনাতন পদ্ধতির বাইরে গিয়ে নিত্যনতুন প্রযুক্তির আড়ালে ‘ডার্ক ওয়েব’ (উধৎশ ডবন), এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপ এবং পরিচয় গোপন রেখে মোবাইল ব্যাংকিং ও ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে তাদের কোটি কোটি টাকার আর্থিক লেনদেন নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করছে, যা সাধারণ ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে ধরা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুধু মূল শহর নয়, চট্টগ্রামের পটিয়া, আনোয়ারা, হাটহাজারী, রাউজানের মতো বড় বড় উপজেলাগুলোর প্রত্যন্ত গ্রামেও এখন মাদকের স্থায়ী পাইকারি ও খুচরা বিক্রয় কেন্দ্র গড়ে উঠেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়মিত অভিযানে মাঝে মাঝে চুনোপুঁটি, খুচরা বিক্রেতা বা নিছক দিনমজুর বাহকরা ধরা পড়লেও, পর্দার আড়ালে থাকা মূল হোতা, অর্থায়নকারী গডফাদার এবং কোটি কোটি টাকার খালাসি চালানগুলো বরাবরই অলৌকিকভাবে অধরা ও নিরাপদ থেকে যাচ্ছে।

মাদক চোরাচালান ও ব্যবসা প্রতিরোধে দেশে পুলিশ, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি), র‍্যাবসহ একাধিক শক্তিশালী ও বিশেষায়িত সংস্থা নিয়োজিত রয়েছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ের নিরপেক্ষ অনুসন্ধান এবং ভুক্তভোগী স্থানীয় মানুষের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত অভিযোগে উঠে এসেছে এক নির্মম সত্য। আর তা হলো, এই সমস্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট তদারকি সংস্থাগুলোর কিছু অসাধু, অর্থলোভী কর্মকর্তা-কর্মচারীর পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ সহায় ও আসকারাতেই নির্বিঘ্নে চলছে এই কোটি কোটি টাকার অবৈধ বাণিজ্য। নিয়মিত ‘মাসোহারা’ বা নির্দিষ্ট অঙ্কের মাসভিত্তিক ঘুষের বিনিময়ে চিহ্নিত মাদক স্পট ও তালিকাভুক্ত অপরাধীদের এক ধরনের অলিখিত আইনি দায়মুক্তি বা সেফ প্রটেকশন দেওয়া হয়। এমনকি অনেক সময় মাঠপর্যায়ের অভিযানে উদ্ধারকৃত মাদকের একটি বড় অংশ সরকারি মালখানায় জমা না দেখিয়ে গোপনে আবার সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কালো বাজারে ছেড়ে দেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগও রয়েছে। যখন ওপরের মহলের তীব্র চাপ থাকে কিংবা গণমাধ্যমে খবর চাউর হয়, তখন লোক দেখানো নামমাত্র কিছু খুচরা বিক্রেতা বা মাদকাসক্তকে সামান্য মাদকসহ ধরে কিংবা পরিত্যক্ত অবস্থায় কিছু মাদক উদ্ধার দেখিয়ে অভিযানের আনুষ্ঠানিকতা বা নাটক শেষ করা হয়। এই গভীর প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, নৈতিক স্খলন এবং অতিনিম্নস্তরের লোভের কারণে রাষ্ট্রীয় মাদক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা আজ সাধারণ মানুষের কাছে চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে।

এই মহাধ্বংসী সিন্ডিকেটের টিকে থাকার ও ডালপালা মেলার সবচেয়ে বড় খুঁটির জোর হলো অপরাধীদের সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবশালী আশ্রয়। নগর কিংবা গ্রামীণ জনপদ- সবখানেই আজ একটি চিত্র দেখা যায়, তা হলো চিহ্নিত বড় বড় মাদক ব্যবসায়ীরা কোনো না কোনো প্রভাবশালী ক্ষমতাসীন বা স্থানীয় রাজনৈতিক নেতার ছত্রছায়ায় বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ায়। দলীয় বড় বড় মিছিল-মিটিং, রাজনৈতিক সভা ও নির্বাচনি প্রচারণায় বিপুল অর্থের জোগান দিয়ে এবং নিজেদের দুর্ধর্ষ ক্যাডার বাহিনীকে ব্যবহার করে তারা খুব দ্রুতই রাজনৈতিক নেতাদের অত্যন্ত ‘কাছের মানুষ’ বা বিশ্বস্ত অনুসারী হয়ে ওঠে। এই রাজনৈতিক পরিচয়ের ঢাল বা রক্ষাকবচ ব্যবহার করে তারা স্থানীয় প্রশাসন ও সাধারণ জনগণকে অনায়াসে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখায়। কোনো মাদককারবারি দৈবাৎ গ্রেপ্তার হলেও প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের উপর মহলের তদবির ও আইনি মারপ্যাঁচের কারণে তারা দ্রুত জামিনে বেরিয়ে এসে বুক ফুলিয়ে আবারও একই পুরোনো ব্যবসায় দ্বিগুণ উৎসাহে লিপ্ত হয়। রাজনীতি যখন অপরাধীদের নিরাপদ পুনর্বাসন কেন্দ্র এবং আয়ের প্রধানতম উৎস হয়ে দাঁড়ায়, তখন মাদকের মতো মরণঘাতী সামাজিক ব্যাধি নির্মূল করা কোনো অবস্থাতেই সম্ভব নয়। ?একই সঙ্গে এই অন্ধকার সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সাংবাদিকতার পবিত্র আড়ালে লুকিয়ে থাকা সমাজবিরোধী কিছু কালো বিড়াল। মূলধারার সৎ, নির্ভীক ও সাহসী পেশাদার সাংবাদিকরা যখন নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মাদকের গডফাদারদের বিরুদ্ধে নিয়মিত কলম ধরছেন, ঠিক তখনই ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা কিছু আন্ডারগ্রাউন্ড পত্রিকা, নামসর্বস্ব অনলাইন পোর্টাল কিংবা ভুয়া প্রেস কার্ডধারী একশ্রেণির টাউট ব্যক্তি এই অপরাধের সরাসরি অংশীদার হচ্ছে। এরা মাঠপর্যায়ে গিয়ে মাদক স্পটগুলো থেকে সাংবাদিকদের নামে নিয়মিত মোটা অঙ্কের মাসোহারা বা চাঁদা তোলে। বিনিময়ে মাদক বিক্রেতাদের বিভিন্ন গোপন তথ্য সরবরাহ করে, প্রশাসনের অভিযানের খবর আগেভাগেই জানিয়ে দেয় কিংবা প্রতিপক্ষ থেকে রক্ষা করার জন্য এক ধরনের ভিউ মিডিয়া কাভারেজ বা ঢাল তৈরি করে দেয়।

সাংবাদিক পরিচয়ের এই চরম ও অবৈধ অপব্যবহারের ফলে প্রকৃত সৎ সংবাদকর্মীদের ভাবমূর্তি যেমন মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ হচ্ছে, তেমনি মাদকের এই আন্ডারগ্রাউন্ড নেটওয়ার্ক দিন দিন আরও বেশি সুরক্ষিত ও অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছে।

?মাদকের এই সংবেদনশীল স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি এবং মানবদেহে এর সুদূরপ্রসারী মরণঘাতী প্রভাব নিয়ে সুনির্দিষ্ট ও ভীতিজনক বৈজ্ঞানিক তথ্য দিয়েছেন দেশের একজন প্রথিতযশা ও জ্যেষ্ঠ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ এবং অধ্যাপক। সুরক্ষার স্বার্থে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এই বিশিষ্ট চিকিৎসক অত্যন্ত জোরালো ভাষায় সতর্ক করে জানান, ‘আধুনিক আইস বা ক্রিস্টাল মেথ এবং ইয়াবার মতো সিন্থেটিক মাদকগুলো মানবদেহের কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রকে স্থায়ীভাবে ধ্বংস করে দেয়। প্রথম প্রথম ক্ষণস্থায়ী উত্তেজনা বা কৃত্রিম ফুর্তি দিলেও, এটি দ্রুতই মস্তিষ্কের ডোপামিন নিঃসরণের প্রাকৃতিক ক্ষমতা চিরতরে শেষ করে দেয়।

এর ফলে একজন আসক্ত ব্যক্তি তীব্র মানসিক অবসাদ, চরম উগ্রতা, সিদ্ধান্তহীনতা এবং শেষ পর্যন্ত সিজোফ্রেনিয়া বা স্থায়ী উন্মাদনার দিকে ধাবিত হয়।’ তিনি আরও যুক্ত করেন যে, ‘ইনজেকশনের মাধ্যমে যারা বুপ্রেনরফিন বা হেরোইন নেন, তাদের ফুসফুসের সংক্রমণ, কিডনি অকেজো হওয়া এবং হেপাটাইটিস-বি, সি ও এইচআইভি (ঐওঠ) এর মতো প্রাণঘাতী রক্তবাহিত রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি শতভাগ। দীর্ঘমেয়াদে মাদক সেবনের কারণে হার্ট অ্যাটাক এবং লিভার সিরোসিস হওয়া এখন সাধারণ নিয়মে পরিণত হয়েছে। সবচেয়ে আশঙ্কার কথা হলো, এই বিষাক্ত রাসায়নিকগুলো তরুণদের প্রজনন ক্ষমতা সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিচ্ছে, যা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জিনগত কাঠামোর জন্যও এক বড় বিপর্যয়।’

?ঠিক একইভাবে মাদকের এই সামাজিক ধ্বংসযজ্ঞ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন চট্টগ্রামের একজন অত্যন্ত প্রবীণ সমাজবিজ্ঞানী ও প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ। তিনি গভীর আক্ষেপ ও ক্ষোভের সঙ্গে জানান যে, আমরা বর্তমানে এক চরম সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের অন্ধকার সুড়ঙ্গের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। আমাদের সোনালি অতীতে তরুণরা অবসরে লাইব্রেরিতে যেত, বিতর্ক করত কিংবা খেলার মাঠে ঘাম ঝরাত, আর আজ আধুনিকতার নামে মাদক তাদের হাতের মুঠোয় পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। দেশের নামি শিক্ষাতথ্যের হলগুলো পর্যন্ত আজ এই বিষাক্ত থাবা থেকে মুক্ত নয়। উচ্চশিক্ষার জন্য মেধা পাচার তো হচ্ছেই, আর দেশের ভেতরে যে বিপুল তরুণ শক্তি অবশিষ্ট থাকছে, তারাও এই মাদকের করাল গ্রাসে সম্পূর্ণ ধ্বংস ও পঙ্গু হয়ে যাচ্ছে। রাষ্ট্র ও সরকার যদি এখনই অত্যন্ত কঠোর হাতে এই ত্রিমুখী সিন্ডিকেটকে গুঁড়িয়ে দিতে না পারে, তবে আগামী এক দশকের মধ্যে আমরা একটি সম্পূর্ণ মেধাহীন ও পঙ্গু প্রজন্ম দেখতে পাব, যা একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য আত্মহত্যার শামিল।

?ঠিক একইভাবে প্রশাসনের সাবেক এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, যিনি অতীতে চট্টগ্রামে দীর্ঘ সময় অত্যন্ত সততার সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেছেন, তিনি পুরো ব্যবস্থার ভেতরের প্রাতিষ্ঠানিক গলদ ও দুর্বলতা নিয়ে অত্যন্ত খোলামেলা কথা বলেছেন। তার মতে, কঠোর আইন বা মাদক দমনের জন্য বিশেষায়িত সংস্থার কোনো অভাব বাংলাদেশে অতীতেও ছিল না, এখনও নেই। এখানে মূল অভাবটি হলো সদিচ্ছা, নৈতিকতা ও জবাবদিহিতার। মাদক নিয়ন্ত্রণ সংস্থাকে সবার আগে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও স্বাধীন করতে হবে। যতক্ষণ পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভেতরের এই সমস্ত কালো ভেড়া ও মাসোহারাভোগী কর্মকর্তাদের সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করে চাকরিচ্যুতি ও কঠোর ফৌজদারি আইনের মুখোমুখি না করা যাবে, ততক্ষণ সীমান্ত থেকে কোটি টাকার ইয়াবা বা আইস উদ্ধার করেও কোনো লাভ হবে না। কারণ মূল গোড়াতেই যেখানে গলদ ও পচন ধরেছে, সেখানে শুধু আগায় পানি ঢেলে বা পাতা ছেঁটে কোনো স্থায়ী ও কার্যকর সুফল আশা করা যায় না।

?যদি আইনি দিক থেকে এই অপরাধের বিচার করা হয়, তবে দেখা যাবে বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে মাদক সংক্রান্ত অপরাধের জন্য অত্যন্ত কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮ যা পরবর্তীকালে ২০২০ সালে আরও কঠোরভাবে সংশোধন করা হয়েছে, সেই আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট ও বাণিজ্যিক পরিমাণে মাদক চোরাচালান, উৎপাদন, কেনাবেচা বা বহনের অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি ‘মৃত্যুদণ্ড’ অথবা ‘যাবজ্জীবন কারাদণ্ড’ এবং সেই সঙ্গে বিপুল পরিমাণ অর্থদণ্ডের স্পষ্ট বিধান রয়েছে। কিন্তু খাতাণ্ডকলমে আইনের এই চরম কঠোরতা থাকলেও মাঠপর্যায়ে এর বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রে রয়েছে হাজারো সীমাবদ্ধতা ও ফাঁকফোকর। অনেক সময় দেখা যায় প্রভাবশালী ও মূল অপরাধীদের নাম প্রাথমিক এজাহার বা মামলা থেকেই কৌশলে বাদ দেওয়া হয় কিংবা তদন্তকারী কর্মকর্তা অনৈতিক সুবিধা নিয়ে আদালতে অত্যন্ত দুর্বল ও ত্রুটিপূর্ণ চার্জশিট বা অভিযোগপত্র দাখিল করেন।

আবার অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় সাধারণ মানুষ এই সমস্ত মাদক সম্রাট ও তাদের সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনীর ভয়ে আদালতে গিয়ে সাক্ষী দিতে সাহস পান না, যার ফলে আসামিরা আইনের ফাঁকফোকর গলে সহজেই খালাস পেয়ে যায়। এর পাশাপাশি মাদক ব্যবসার মাধ্যমে অর্জিত হাজার হাজার কোটি টাকা ঠিক কোথায় পাচার বা বিনিয়োগ হচ্ছে, তা অনুসন্ধানে আমাদের দেশে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের যথাযথ ও কঠোর প্রয়োগের চরম অভাব লক্ষ্য করা যায়। অপরাধীদের অবৈধ ও স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ রাষ্ট্রীয়ভাবে বাজেয়াপ্ত না করার কারণে জেল থেকে জামিনে বের হয়ে তারা আবারও সেই বিপুল কালো টাকা খাটিয়ে আরও বড় পরিসরে এই ব্যবসা শুরু করার সাহস পায়।

?চট্টগ্রাম তথা সমগ্র দেশকে এই মাদকের অভিশাপ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত করতে হলে শুধু গৎবাঁধা কিছু অভিযান, চুনোপুঁটিদের আটক বা লোক দেখানো গ্রেপ্তারের নাটক কোনো স্থায়ী সমাধান বয়ে আনবে না। এর জন্য প্রয়োজন একটি দীর্ঘমেয়াদি, সমন্বিত, সৎ এবং সম্পূর্ণ আপসহীন জাতীয় মহাপরিকল্পনা। সবার আগে আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভ্যন্তরে একটি কঠোর ও নিয়মতান্ত্রিক ‘শুদ্ধি অভিযান’ চালাতে হবে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও পুলিশের অভ্যন্তরে যে সমস্ত অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়মিত মাসোহারা গ্রহণ বা মাদকের ব্যবসার সাথে পরোক্ষভাবে যুক্ত, তাদের অবিলম্বে চিহ্নিত করে চাকরি থেকে স্থায়ী বহিষ্কার ও প্রচলিত ফৌজদারি আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। রাজনৈতিক পরিচয় ও দলের রঙ নির্বিশেষে সকল গডফাদার, অর্থায়নকারী ও পৃষ্ঠপোষকদের অভিন্ন অপরাধী হিসেবে গণ্য করে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে এবং অপরাধীর কোনো দল বা রাজনৈতিক পরিচয় নেই- এই রাষ্ট্রীয় নীতি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। মরণঘাতী মাদকের প্রবেশ ঠেকাতে মিয়ানমার ও পার্শ্ববর্তী সীমান্ত এলাকা এবং বঙ্গোপসাগরের সুদীর্ঘ সমুদ্রপথে কোস্ট গার্ড ও নৌবাহিনীর টহল ও নজরদারি অত্যাধুনিক প্রযুক্তির যেমন ড্রোন ও থার্মাল নাইট ভিশন ক্যামেরার মাধ্যমে সার্বক্ষণিক জোরদার করে সকল চোরাচালানি রুট চিরতরে সিল করে দিতে হবে। তথ্য মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসন এবং স্থানীয় পেশাদার সাংবাদিক সংগঠনগুলোর যৌথ উদ্যোগে ছদ্মবেশী, চাঁদাবাজ ও মাসোহারাভোগী ভুয়া সাংবাদিকদের দ্রুত তালিকাভুক্ত ও চিহ্নিত করে তাদের প্রেস কার্ড বাতিলসহ কঠোর আইনিব্যবস্থা করা সময়ের দাবি। একই সাথে প্রতিটি পরিবারে সন্তানদের পর্যাপ্ত সময় দেওয়া, তাদের নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষার বিস্তার ঘটানো এবং প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় সৎ নাগরিকদের সমন্বয়ে মাদক প্রতিরোধ কমিটি গঠন করে সর্বাত্মক সামাজিক সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। এর পাশাপাশি আসক্ত তরুণদের সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনতে পর্যাপ্ত সরকারি নিরাময় কেন্দ্রের আধুনিকায়ন, ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের মতো চিকিৎসা সুবিধা এবং সহজলভ্য পুনর্বাসন প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা জরুরি।

মাদকের এই ভয়ংকর বিস্তার রোধে শুধু প্রশাসনিক বা আইনি পদক্ষেপই যথেষ্ট নয়, এর জন্য প্রয়োজন একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক পরিবর্তন। তরুণদের মাদকের মরণকামড় থেকে দূরে রাখতে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত সহশিক্ষা কার্যক্রম, খেলাধুলা, বিতর্ক প্রতিযোগিতা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন বাড়াতে হবে, যাতে তাদের সৃজনশীল শক্তির সঠিক বিকাশ ঘটে এবং অবসর সময় কাটে। মাদককে ‘না’ বলার মানসিকতা গড়ে তুলতে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে বড় বড় গণমাধ্যম, টেলিভিশন চ্যানেল এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালানো আবশ্যক। পুনর্বাসন কেন্দ্রগুলোকে শুধু বন্দিশালা না বানিয়ে সেগুলোকে সহানুভূতি, সঠিক কাউন্সেলিং ও ভালোবাসার স্থান হিসেবে গড়ে তুলতে হবে, যেখানে মাদকাসক্ত যুবকরা মানসিক ট্রমা কাটিয়ে সুস্থ মানুষ হিসেবে সমাজে ফেরার নতুন আত্মবিশ্বাস ফিরে পাবে। মাদকাসক্তদের অপরাধী হিসেবে না দেখে তাদের চিকিৎসার যোগ্য রোগী হিসেবে বিবেচনা করা হলে এই সংকট কাটিয়ে ওঠা অনেক বেশি সহজ হবে। একই সঙ্গে তরুণদের বেকারত্ব দূরীকরণও মাদক দমনের অন্যতম একটি পরোক্ষ উপায়। রাষ্ট্র যদি কারিগরি শিক্ষা ও আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ আরও সহজলভ্য করতে পারে, তবে এই অন্ধকার পথ থেকে তরুণ সমাজকে অনেকাংশে দূরে রাখা সম্ভব হবে।

এম. সফিউল আজম চৌধুরী

লেখক, সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী, চট্টগ্রাম