দক্ষতা না ডিগ্রি, কোনটি বেশি জরুরি
বাপ্পাদিত্য চৌধুরী প্রবাল
প্রকাশ : ০৬ জুন ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
বর্তমান যুগে ও কর্মসংস্থানের জগতে একটি বহুল আলোচিত প্রশ্ন হলো- ‘দক্ষতা না ডিগ্রি, কোনটি বেশি জরুরি?’ কিছুকাল আগেও ডিগ্রিকেই সাফল্যের প্রধান চাবিকাঠি মনে করা হতো। ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেট মানেই ভালো চাকরি- এমন একটি ধারণা সমাজে দীর্ঘদিন প্রচলিত ছিল।
কিন্তু ডিজিটাল যুগ, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা এবং কর্মক্ষেত্রের পরিবর্তিত চাহিদা সেই ধারণাকে অনেকটাই বদলে দিয়েছে। এখন প্রশ্ন উঠছে, শুধু ডিগ্রি যথেষ্ট কি না, নাকি বাস্তব দক্ষতাই আসল শক্তি? ডিগ্রি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। এটি একজন শিক্ষার্থীর একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান অর্জনের প্রমাণ দেয়। বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজে পড়াশোনার মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থী বিষয়ভিত্তিক ভিত্তি তৈরি করেন, গবেষণার ধারণা পান এবং একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ শিক্ষার পরিবেশে অভ্যস্ত হন। অনেক ক্ষেত্রে সরকারি চাকরি, শিক্ষকতা বা কিছু নির্দিষ্ট পেশায় ডিগ্রি একটি বাধ্যতামূলক শর্ত। অর্থাৎ ডিগ্রি ছাড়া অনেক দরজা খুলে না। কিন্তু বাস্তব কর্মক্ষেত্রে দেখা যায়, শুধু ডিগ্রি থাকলেই দক্ষতা নিশ্চিত হয় না। অনেক শিক্ষার্থী দীর্ঘবছর পড়াশোনা করেও কর্মজীবনে গিয়ে বাস্তব সমস্যার সমাধানে পিছিয়ে পড়েন। কারণ কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজন হয় বাস্তব অভিজ্ঞতা, সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা, যোগাযোগ দক্ষতা এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা। এই জায়গাতেই দক্ষতার গুরুত্ব সামনে চলে আসে। আজকের চাকরির বাজার দ্রুত পরিবর্তনশীল। বিশেষ করে প্রযুক্তি খাতে, যেমন ফ্রিল্যান্সিং, সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, ডিজিটাল মার্কেটিং, গ্রাফিক ডিজাইন বা ডেটা অ্যানালাইসিস- এখানে ডিগ্রির চেয়ে দক্ষতাই বেশি মূল্যবান।
উদাহরণস্বরূপ, একজন দক্ষ গ্রাফিক ডিজাইনার বা ওয়েব ডেভেলপার যদি বাস্তব কাজ ভালোভাবে করতে পারেন, তবে অনেক ক্ষেত্রে তার ডিগ্রি না থাকলেও চাকরি বা কাজের সুযোগ পেতে তেমন সমস্যা হয় না। বিশ্বব্যাপী ফ্রিল্যান্সিং প্ল্যাটফর্ম যেমন আপওয়ার্ক এবং ফাইভার দেখিয়েছে যে, ক্লায়েন্টরা ডিগ্রির চেয়ে কাজের মান ও পোর্টফোলিওকে বেশি গুরুত্ব দেয়। অর্থাৎ ‘আপনি কী জানেন’ তার চেয়ে ‘আপনি কী করতে পারেন’- এই প্রশ্নটি এখন বেশি প্রাসঙ্গিক।
তবে এর মানে এই নয় যে, ডিগ্রি অপ্রয়োজনীয়। বরং ডিগ্রি এবং দক্ষতা- দুটোর সমন্বয়ই সবচেয়ে শক্তিশালী। ডিগ্রি একজন মানুষকে একটি কাঠামোগত জ্ঞান দেয়, আর দক্ষতা সেই জ্ঞানকে বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করার ক্ষমতা তৈরি করে।
ডিগ্রি ছাড়া দক্ষতা অনেক সময় অসম্পূর্ণ হতে পারে, আবার দক্ষতা ছাড়া ডিগ্রি অনেক সময় অকার্যকর হয়ে পড়ে। বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো- তত্ত্বনির্ভর শিক্ষা বনাম বাস্তব দক্ষতার মধ্যে ভারসাম্যহীনতা।
অনেক শিক্ষার্থী পরীক্ষায় ভালো ফল করলেও বাস্তব সমস্যার সমাধানে দুর্বল থাকে। এজন্য এখন বিশ্বজুড়ে ‘দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা‘ উপর জোর দেওয়া হচ্ছে। কারণ কর্মক্ষেত্র এখন শুধু তথ্য জানার জায়গা নয়, বরং সেই তথ্য ব্যবহার করার জায়গা। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আত্মকর্মসংস্থান। আগের যুগে চাকরি মানেই সরকারি বা বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান ছিল। কিন্তু এখন তরুণরা নিজেরাই উদ্যোক্তা হচ্ছেন। অনলাইন ব্যবসা, স্টার্টআপ, কনটেন্ট ক্রিয়েশন- সব ক্ষেত্রেই দক্ষতা সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে। একজন সফল উদ্যোক্তার জন্য ডিগ্রির চেয়ে বাজার বোঝার ক্ষমতা, যোগাযোগ দক্ষতা এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা অনেক বেশি জরুরি। তবে সামাজিক বাস্তবতায় ডিগ্রির গুরুত্ব এখনও কমেনি। অনেক পরিবারে এখনও ডিগ্রিকে সাফল্যের প্রধান মানদণ্ড হিসেবে দেখা হয়। চাকরির বিজ্ঞাপনেও অনেক সময় নির্দিষ্ট ডিগ্রি চাওয়া হয়।
ফলে বাস্তবতা হলো- আমরা এখন একটি ‘দ্বৈত শর্ত’-এর যুগে আছি, যেখানে ডিগ্রি এবং দক্ষতা দুটোই প্রয়োজন, তবে তাদের ভূমিকা আলাদা। ভবিষ্যতের দিকে তাকালে দেখা যায়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন এবং ডিজিটাল অর্থনীতির কারণে চাকরির ধরন আরও পরিবর্তিত হবে।
অনেক প্রচলিত কাজ বিলুপ্ত হবে, আবার নতুন ধরনের কাজ সৃষ্টি হবে। এই পরিবর্তিত বাজারে টিকে থাকতে হলে শুধু সার্টিফিকেট যথেষ্ট হবে না; প্রয়োজন হবে ধারাবাহিকভাবে নতুন দক্ষতা অর্জনের মানসিকতা। ডিগ্রি দরজা খুলে দিতে পারে; কিন্তু সেই দরজা দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি দেয় দক্ষতা। তাই একজন সফল মানুষ হতে হলে প্রয়োজন ডিগ্রি ও দক্ষতার বাস্তব সমন্বয়, যেখানে দক্ষতাই হয়ে উঠবে মূল চালিকাশক্তি।
বাপ্পাদিত্য চৌধুরী প্রবাল
উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগ, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়
