শব্দদূষণমুক্ত ‘নীরব এলাকা’ ঘোষণা : শুধু আইনি কড়াকড়ি নয়, প্রয়োজন টেকসই ও সমন্বিত বাস্তবায়ন

প্রকাশ : ০৬ জুন ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

রাজধানী ঢাকাকে একটি বাসযোগ্য ও সুস্থ নগরী হিসেবে গড়ে তোলার লড়াইয়ে শব্দদূষণ প্রতিরোধ করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। বিশ্ব পরিবেশ দিবস-২০২৬ উদযাপন উপলক্ষে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) উদ্যোগে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এলাকা এবং গুলশান, বনানী, নিকেতন ও বারিধারাকে ‘নীরব এলাকা’ হিসেবে বহাল রাখার এবং আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার যে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ। ডিএনসিসির নবনিযুক্ত প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খানের এই ঘোষণা এবং শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে পরিবেশ অধিদপ্তর, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) ও বিআরটিএ-এর যৌথ উদ্যোগ নগরবাসীর মনে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। তবে আমাদের পূর্বের অভিজ্ঞতা বলে, কেবল ঘোষণা বা সাময়িক প্রচারণামূলক অভিযানের মাধ্যমে ঢাকার মতো মেগাসিটির দীর্ঘস্থায়ী ব্যাধি নিরাময় করা সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা, কঠোর আইনের ধারাবাহিক প্রয়োগ এবং সর্বস্তরের নাগরিক সচেতনতা।

শব্দদূষণকে চিকিৎসাবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞানীরা অভিহিত করেন একটি ‘নীরব ঘাতক’ হিসেবে। মাত্রাতিরিক্ত হর্ন, বিশেষ করে নিষিদ্ধ হাইড্রোলিক হর্নের বেপরোয়া ব্যবহার, নির্মাণকাজের তীব্র আওয়াজ এবং উচ্চশব্দে মাইক বা সাউন্ড সিস্টেম বাজানোর সংস্কৃতি আমাদের নাগরিক জীবনকে ক্রমান্বয়ে বিষাক্ত করে তুলেছে। বিশেষ করে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এলাকা, যা একটি দেশের প্রধান প্রবেশদ্বার এবং যেখানে দেশি-বিদেশি হাজারো মানুষের প্রতিদিন সমাগম ঘটে, সেটি দীর্ঘদিন ধরে তীব্র শব্দদূষণের কবলে রয়েছে। এ এলাকাকে শতভাগ নীরব এলাকা হিসেবে কার্যকর করার যে ঘোষণা ডিএনসিসি প্রশাসক দিয়েছেন, তা বাস্তবায়িত হলে তা হবে ঢাকার পরিবেশগত রূপান্তরের একটি বড় মাইলফলক। একইভাবে গুলশান, বনানী, বারিধারা ও নিকেতনের মতো আবাসিক এলাকাগুলোকে শব্দ ও বায়ু দূষণমুক্ত করার উদ্যোগও অত্যন্ত প্রশংসার দাবিদার।

আমরা জানি, ‘শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা’ দীর্ঘদিন ধরে কাগজে-কলমে বিদ্যমান থাকলেও এর সুফল সাধারণ মানুষ খুব একটা পায়নি। তবে আশার কথা হলো, সম্প্রতি প্রণীত ‘শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা ২০২৫’ অনুযায়ী ট্রাফিক পুলিশকে আইনগত বিশেষ ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে। ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) যথার্থই বলেছেন যে, এই ক্ষমতা পাওয়ার পর থেকে ট্রাফিক বিভাগ শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে ব্যাপকভাবে কাজ শুরু করেছে এবং এর সুফল নগরবাসী ধীরে ধীরে পেতে শুরু করবেন। ট্রাফিক পুলিশের এই সক্রিয়তা অত্যন্ত জরুরি, কারণ ঢাকার শব্দদূষণের সিংহভাগই ঘটে গণপরিবহন ও ব্যক্তিগত গাড়ির অনিয়ন্ত্রিত এবং অহেতুক হর্ন বাজানোর অভ্যাসের কারণে। ট্রাফিক পুলিশকে যদি নিয়মিত তদারকি, আধুনিক শব্দ পরিমাপক যন্ত্র (সাউন্ড লেভেল মিটার) সরবরাহ এবং তাৎক্ষণিক জরিমানা আদায়ের নির্বাহী ক্ষমতা কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে দেওয়া হয়, তবেই চালকদের মধ্যে হর্ন বাজানোর অপসংস্কৃতি দূর হবে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. লুৎফর রহমানের বক্তব্য থেকে জানা যায়, শব্দদূষণ রোধে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে সাইনবোর্ড স্থাপন, গণমাধ্যমে বিজ্ঞাপন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার চালানো হচ্ছে। এই সচেতনতামূলক প্রচারণা অবশ্যই প্রশংসনীয় এবং দীর্ঘমেয়াদি অভ্যাসের পরিবর্তনের জন্য এটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। কিন্তু এর পাশাপাশি এটাও মনে রাখতে হবে যে, শুধু সচেতনতা দিয়ে আইন অমান্যকারীদের সোজা পথে আনা সম্ভব নয়। যতক্ষণ না পর্যন্ত হর্ন বাজানোর অপরাধে কঠোর আর্থিক জরিমানা, ড্রাইভিং লাইসেন্স বাতিল বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা দৃশ্যমান হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত একশ্রেণির চালক হর্ন বাজানো বন্ধ করবে না। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)-এর ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; ফিটনেস সার্টিফিকেট দেওয়ার সময় গাড়ির হর্ন এবং সাইলেন্সার পাইপ যথাযথ আছে কি না এবং তা আইনসম্মত কি না, তা কঠোরভাবে পরীক্ষা করতে হবে।

ডিএনসিসি প্রশাসক তার বক্তব্যে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বাস্তবসম্মত কথা বলেছেন, ‘আমরা বলছি না একদিনেই এটা শতভাগ করা সম্ভব, তবে নগরবাসীর সহযোগিতায় এটা বাস্তবায়নের মাধ্যমে প্রমাণ করে দেখাব।’ এই বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের আশাবাদী করে। ঢাকার মতো একটি জটিল, জনবহুল এবং আইন অমান্য করার প্রবণতাযুক্ত মেগাসিটির পরিবেশ রাতারাতি পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। তবে গুলশান, বনানী, বারিধারা ও নিকেতন সোসাইটির মতো স্থানীয় সামাজিক সংগঠন ও কল্যাণ সমিতিকে এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা একটি অত্যন্ত দূরদর্শী সিদ্ধান্ত। স্থানীয় বাসিন্দারা যদি নিজ নিজ এলাকায় শব্দদূষণের বিরুদ্ধে পাহারাদারের ভূমিকা পালন করেন, চালকদের হর্ন না বাজাতে উদ্বুদ্ধ করেন এবং সিটি কর্পোরেশন ও পুলিশ প্রশাসনকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেন, তবে এই উদ্যোগের সফলতা নিশ্চিত করা অনেক সহজ হবে। পরিশেষে আমরা বলতে চাই, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এলাকা এবং নির্দিষ্ট কিছু আবাসিক এলাকাকে ‘নীরব এলাকা’ হিসেবে সফলভাবে রূপান্তর করা গেলে, এই মডেলটি পরবর্তীতে পুরো ঢাকা শহর এবং দেশের অন্যান্য বিভাগীয় শহরেও বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে। এটি শুধু একটি পরিবেশগত আন্দোলন নয়, এটি আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্য ও মানসিক সুরক্ষার আন্দোলন। আমরা আশা করি, সিটি কর্পোরেশন, পরিবেশ অধিদপ্তর, ডিএমপি এবং বিআরটিএ- এই চার সংস্থার যে অভূতপূর্ব সমন্বয় দৃশ্যমান হয়েছে, তা যেন কোনো আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় বা সাময়িক প্রচারণার পর ঝিমিয়ে না পড়ে। প্রতিটি চিহ্নিত নীরব এলাকায় নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত (মোবাইল কোর্ট) পরিচালনা করা হোক এবং আইন অমান্যকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা হোক। একটি শান্ত, সুস্থ, শব্দদূষণমুক্ত ও বাসযোগ্য ঢাকা বিনির্মাণে সরকার, প্রশাসন এবং নগরবাসী কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করবে- এটাই আমাদের প্রত্যাশা।