প্রযুক্তির পালকে প্রকৃতির প্রত্যাবর্তন

আমানুর রহমান

প্রকাশ : ০৭ জুন ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আমাদের প্রিয় গ্রহ পৃথিবী আজ এক অভূতপূর্ব অস্তিত্ব-সংকটের মুখোমুখি। এর মূল কারণ আমাদেরই অপরিণামদর্শী কর্মকাণ্ড। শিল্পবিপ্লবের পর থেকে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা এরইমধ্যে প্রায় ১.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেয়েছে। আবহাওয়া সংস্থাগুলোর সর্বশেষ তথ্যমতে, বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা ৪২০ পিপিএম (পার্টস পার মিলিয়ন) ছাড়িয়ে গেছে, যা গত কয়েক মিলিয়ন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এই পরিসংখ্যান শুধু কিছু গাণিতিক সংখ্যা নয়; বরং এটি আমাদের আসন্ন ধ্বংসের সুস্পষ্ট সতর্কবার্তা। অপ্রত্যাশিত বন্যা, খরা বা ভয়াবহ দাবানলের মাধ্যমে প্রতিদিনই আমরা এর প্রমাণ পাচ্ছি। শুধু প্রথাগত সচেতনতা, স্লোগান কিংবা অপরিকল্পিত বৃক্ষরোপণ দিয়ে এই সুবিশাল বৈশ্বিক বিপর্যয় ঠেকানো আর কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

আমাদের এখন প্রয়োজন বিজ্ঞানের সুনিপুণ, যুগান্তকারী ও কার্যকর প্রয়োগ। তাই আবেগ বা খণ্ডিত চিন্তাভাবনা থেকে নয়, বরং বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ও আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়েই পরিবেশ রক্ষার মূল নকশা তৈরি করতে হবে, যা পৃথিবীকে আবারও একটি নিরাপদ ও টেকসই আবাসে পরিণত করবে।

পরিবেশ সুরক্ষায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় এবং দৃশ্যমান অবদান হলো জীবাশ্ম জ্বালানির বিকল্প হিসেবে নবায়নযোগ্য শক্তির উদ্ভাবন ও প্রসার। আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থার (আইইএ) তথ্যমতে, বৈশ্বিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এখন আসছে সৌর, বায়ু ও জলবিদ্যুতের মতো নবায়নযোগ্য উৎস থেকে। বিশেষ করে, আধুনিক সোলার ফটোভোলটাইক (পিভি) সেলগুলোর কর্মদক্ষতা অতীতের তুলনায় প্রায় ২০-২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা স্বল্প আলোতেও অনেক বেশি শক্তি উৎপাদনে সক্ষম। কয়লা বা তেলের মতো জীবাশ্ম জ্বালানি পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করলে বিপুল পরিমাণ গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গত হয়, অথচ সৌর বা বায়ুবিদ্যুৎ সেই নির্গমনের হারকে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে পারে। বিজ্ঞান স্পষ্টভাবে প্রমাণ করেছে যে, প্রকৃতির অফুরন্ত শক্তিকে কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও পরিবেশ রক্ষা- এ দুটিরই একসঙ্গে অর্জন সম্ভব। এই রূপান্তর শুধু পরিবেশকেই দূষণমুক্ত করছে না, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সবুজ অর্থনীতির মজবুত ভিত্তিও গড়ছে।

বায়ুমণ্ডলে এরইমধ্যে যে বিপুল পরিমাণ কার্বন জমা হয়েছে, শুধু ভবিষ্যৎ নির্গমন কমিয়ে তার মারাত্মক প্রভাব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হওয়া সম্ভব নয়। আর ঠিক এখানেই আশার নতুন আলো দেখাচ্ছে ‘কার্বন ক্যাপচার অ্যান্ড স্টোরেজ’ (সিসিএস) বা কার্বন ধারণ ও সংরক্ষণ প্রযুক্তি। গ্লোবাল সিসিএস ইনস্টিটিউটের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে গড়ে ওঠা বৃহৎ বাণিজ্যিক কার্বন ক্যাপচার প্রকল্পগুলো প্রতিবছর প্রায় ৪ কোটি (৪০ মিলিয়ন) টন কার্বন ডাই-অক্সাইড বাতাস থেকে শুষে নিয়ে মাটির গভীর স্তরে নিরাপদে মজুত করছে। এটি মূলত প্রাকৃতিক কার্বন-চক্রকে বিপরীতমুখী করার একটি দুঃসাহসিক ও কার্যকর বৈজ্ঞানিক প্রচেষ্টা। কলকারখানা, ইস্পাতশিল্প বা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে নির্গত ধোঁয়া সরাসরি বায়ুমণ্ডলে মেশার আগেই এই অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে কার্বন আলাদা করে ফেলা যায়। নির্গমন কমানোর পাশাপাশি বাতাস থেকে সরাসরি কার্বন শুষে নেওয়ার এই পদ্ধতিটি জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে আমাদের লড়াইয়ে এক মোক্ষম হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।

পরিবেশদূষণের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে প্লাস্টিকের ভয়াবহতা আজ সর্বজনবিদিত। এর স্থায়ী সমাধানে বিজ্ঞান নিয়ে এসেছে ‘বায়োপ্লাস্টিক’ এবং সিন্থেটিক বায়োলজির যুগান্তকারী ধারণা। জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচির (ইউএনইপি) পরিসংখ্যান বলছে, প্রতিবছর প্রায় ৮০ লাখ টন প্লাস্টিক বর্জ্য নদ-নদী ও মহাসাগরগুলোতে গিয়ে পড়ছে, যা সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে।

এর বিপরীতে, উদ্ভিদভিত্তিক পলিমার বা সেলুলোজ দিয়ে তৈরি বায়োপ্লাস্টিক মাত্র তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে প্রাকৃতিকভাবে মাটিতে মিশে যায়; অথচ সাধারণ প্লাস্টিকের ক্ষেত্রে সময় লাগে শত শত বছর। বিজ্ঞানীরা এখন গবেষণাগারে এমন বিশেষ এনজাইম বা ব্যাকটেরিয়া তৈরি করছেন, যা পরিবেশে ছড়িয়ে থাকা সাধারণ প্লাস্টিককেও দ্রুত বিনষ্ট করতে সক্ষম। ক্ষতিকর পেট্রোকেমিক্যালের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে জৈব উপাদানের দিকে এই বৈজ্ঞানিক পদযাত্রা প্রমাণ করে যে, মানবসৃষ্ট যেকোনো জটিল সমস্যার সমাধান মানুষের উদ্ভাবিত প্রযুক্তির ভেতরেই লুকিয়ে আছে। প্লাস্টিকের অভিশাপ থেকে পৃথিবীকে মুক্ত করতে বিজ্ঞানের এই উদ্ভাবনগুলো শুধু চমৎকার বিকল্পই নয়, বরং অস্তিত্ব রক্ষার চূড়ান্ত বাধ্যবাধকতাও বটে।

বনভূমি ধ্বংসের ক্ষতিকর প্রভাব আমাদের জলবায়ুকে বিপর্যয়ের চরম সীমায় ঠেলে দিচ্ছে। এর প্রতিকারেও বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির আধুনিক প্রয়োগ অবিশ্বাস্য গতির সঞ্চার করেছে। গ্লোবাল ফরেস্ট ওয়াচের হিসাব অনুযায়ী, কৃষি ও নগরায়ণের বিস্তারের কারণে প্রতিবছর পৃথিবী থেকে গড়ে প্রায় ১ কোটি হেক্টর বনভূমি চিরতরে হারিয়ে যাচ্ছে। এই বিপুল শূন্যস্থান পূরণে মানুষের কায়িক শ্রমের পাশাপাশি এখন বিশেষায়িত ‘প্লান্টিং ড্রোন’ ব্যবহার করা হচ্ছে। পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ বীজের ক্যাপসুল বহন করে একটি ড্রোন দুর্গম এলাকায় দিনে প্রায় ৪০ হাজার পর্যন্ত বীজ রোপণ করতে পারে।

স্যাটেলাইট ইমেজিং ও রিমোট সেন্সিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা এখন বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের বনভূমির অবস্থা, অবৈধ গাছ কাটা বা দাবানলের প্রারম্ভিক ঝুঁকি রিয়েল-টাইমে পর্যবেক্ষণ করে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে পারছেন। হারানো সবুজকে দ্রুতগতিতে ফিরিয়ে আনার এই বৈজ্ঞানিক উদ্যোগ একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়: প্রযুক্তির ধ্বংসাত্মক ব্যবহারের দিন শেষ; এখন সময় এর নিরাময়কারী ক্ষমতার ওপর পূর্ণ আস্থা রাখার। ভবিষ্যতের দূষণমুক্ত জ্বালানি হিসেবে বিজ্ঞান বর্তমানে ‘গ্রিন হাইড্রোজেন’ বা সবুজ হাইড্রোজেনের ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দিচ্ছে, যা পরিবহন ও ভারী শিল্পখাতকে পুরোপুরি কার্বনমুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দেয়। ব্লুমবার্গ নিউ এনার্জি ফাইন্যান্সের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক শক্তির চাহিদার প্রায় ২৪ শতাংশ মেটানোর সক্ষমতা রাখে এই গ্রিন হাইড্রোজেন।

আমানুর রহমান

প্রাবন্ধিক, কবি ও সমাজকর্মী , চাষাড়া, নারায়ণগঞ্জ