ব্যাটারি : শক্তির আধার ও আমাদের পরিবেশ সচেতনতা

সরফরাজ শিপন

প্রকাশ : ০৮ জুন ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আধুনিক সভ্যতার প্রতিটি ধাপে বিদ্যুতের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য আমরা বিভিন্ন ধরনের ব্যাটারির ওপর নির্ভরশীল। এর মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত, নির্ভরযোগ্য এবং বহুল ব্যবহৃত প্রযুক্তি হলো ‘লিড অ্যাসিড ব্যাটারি’। আমাদের প্রিয় যানবাহন থেকে শুরু করে আইপিএস (IPS), ইউপিএস (UPS)-এর ব্যাকআপ পাওয়ার, এমনকি সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার স্টোরেজ— সবখানেই এর আধিপত্য। তবে এই অত্যন্ত প্রয়োজনীয় প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার এবং এর সঙ্গে জড়িত পরিবেশগত ঝুঁকি সম্পর্কে আমাদের নাগরিক সচেতনতা এখনও আশানুরূপ নয়। এটি একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে। ?লিড অ্যাসিড ব্যাটারি প্রযুক্তি প্রায় দেড়’শ বছরের পুরোনো। ১৮৫৯ সালে ফরাসি পদার্থবিজ্ঞানী গ্যাস্টন প্লান্টে এটি উদ্ভাবন করেন। যা ইতিহাসের প্রথম রিচার্জেবল ব্যাটারি। দীর্ঘ সময় পার হলেও এর সহজলভ্যতা, কম খরচ এবং উচ্চ কর্মক্ষমতার কারণে আজও এটি অপ্রতিদ্বন্দ্বী। একটি লিড অ্যাসিড ব্যাটারি মূলত সিসা (Lead), সিসা ডাই-অক্সাইড এবং সালফিউরিক অ্যাসিডের একটি চমৎকার রাসায়নিক সংমিশ্রণ। যখন এটি চার্জ হয়, তখন রাসায়নিক শক্তি বিদ্যুৎ শক্তিতে রূপান্তরিত হয় এবং যখন ডিসচার্জ হয়, তখন বিপরীত প্রক্রিয়াটি ঘটে। সহজলভ্য হলেও এই ব্যাটারির কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ওজন বেশি হওয়া, চার্জিংয়ের জন্য দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদে রক্ষণাবেক্ষণের জটিলতা এর অন্যতম নেতিবাচক দিক। ?তবে লিড অ্যাসিড ব্যাটারির সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গাটি হলো এর পরিবেশগত প্রভাব। এই ব্যাটারির ভেতরে থাকা সীসা একটি অত্যন্ত ক্ষতিকর ভারী ধাতু এবং সালফিউরিক অ্যাসিড একটি শক্তিশালী ক্ষয়কারী উপাদান। যখন একটি পুরোনো ব্যাটারি যেখানে-সেখানে ফেলা হয়, তখন এর ভেতরে থাকা সীসা মাটি ও পানির সঙ্গে মিশে গিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশ বিপর্যয় ডেকে আনে। সীসা মানবদেহে প্রবেশের পর মস্তিষ্ক, কিডনি, যকৃত ও হাড়ের মতো অঙ্গগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে এবং হাড় ও দাঁতে জমা হয়ে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করে। ইনস্টিটিউট ফর হেলথ মেট্রিক্স অ্যান্ড ইভালুয়েশন (IHME)-এর হিসাব অনুযায়ী, ২০২১ সালে বিশ্বজুড়ে ১৫ লাখেরও বেশি মানুষের মৃত্যুর জন্য সীসার সংস্পর্শ দায়ী ছিল, যার প্রধান কারণ ছিল হৃদরোগের সমস্যা। দুর্ভাগ্যবশত, আমাদের দেশে অনেক ক্ষেত্রে অনিবন্ধিত গ্যারেজ বা অসাধু চক্র পুরোনো ব্যাটারি থেকে অবৈধভাবে সীসা সংগ্রহ করে, যা পরিবেশ এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইউনাইটেড নেশনস এনভায়রনমেন্ট প্রোগ্রাম (UNEP)-এর প্রতিবেদন অনুসারে, বাংলাদেশে ১,১০০ টির বেশি অনানুষ্ঠানিক ও টখঅই পুনর্ব্যবহার কার্যক্রম রয়েছে। ব্যাটারি ভাঙার সময় যে অ্যাসিড নির্গত হয়, তা জমির উর্বরতা নষ্ট করে এবং পানির স্তরকে বিষিয়ে তোলে। এই বিষাক্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আমাদের এখনই কঠোর হতে হবে। ?আমাদের এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উপায় হলো ‘সার্কুলার ইকোনমি’ বা বৃত্তাকার অর্থনীতির ধারণা গ্রহণ করা। লিড অ্যাসিড ব্যাটারি মূলত ৯৯ শতাংশ পর্যন্ত পুনর্ব্যবহারযোগ্য। আমরা যদি পুরোনো ব্যাটারিগুলো যত্রতত্র না ফেলে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে অনুমোদিত রিসাইক্লিং কারখানায় জমা দিতে পারি, তবে সীসা এবং প্লাস্টিকের মতো মূল্যবান সম্পদ পুনরায় ব্যবহার করা সম্ভব। এক্ষেত্রে সরকারি কঠোর নজরদারি ও নীতিমালা প্রয়োগ অত্যন্ত জরুরি, যাতে কোনো অসাধু ব্যবসায়ী পরিবেশের ক্ষতি না করে বা অস্বাস্থ্যকর উপায়ে ব্যাটারি রিসাইকেল করতে না পারে। সাধারণ মানুষকেও সচেতন করতে হবে যে, পুরোনো ব্যাটারি কোনো সাধারণ বর্জ্য নয়, এটি একটি বিপজ্জনক রাসায়নিক পণ্য। ?সর্বোপরি, লিড অ্যাসিড ব্যাটারি আমাদের আধুনিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। একে পুরোপুরি বর্জন করা আপাতত সম্ভব নয়। কিন্তু দায়িত্বশীল ব্যবহারের মাধ্যমে এর নেতিবাচক প্রভাব কমিয়ে আনা সম্ভব। প্রতিটি সচেতন নাগরিকের দায়িত্ব হলো, ব্যাটারি নষ্ট হলে তা যেন নির্দিষ্ট ডাম্পিং পয়েন্টে বা অনুমোদিত বিক্রেতার কাছে ফেরত দেওয়া হয়। আসুন, আমরা আধুনিক প্রযুক্তির সুফল ভোগ করার পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষায় সচেষ্ট হই। প্রযুক্তির উৎকর্ষ যেন আমাদের পৃথিবীর ধ্বংসের কারণ না হয়, সেটি নিশ্চিত করাই হোক আমাদের আজকের অঙ্গীকার। একটি সবুজ ও টেকসই পৃথিবী গড়তে সঠিক ব্যাটারি ব্যবস্থাপনা এখন সময়ের দাবি।

সরফরাজ শিপন

শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ, সরকারি শাহ্ সুলতান কলেজ, বগুড়া