বিদ্যুতের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি

জনজীবন ও অর্থনীতিতে পড়বে এর বড় প্রভাব

প্রকাশ : ০৮ জুন ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

দীর্ঘ দেড় দশকের রেকর্ড ভেঙে দেশে বিদ্যুতের দাম এক লাফে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উন্নীত করেছে সরকার। দুই ধাপে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর বিদ্যুতের এ বড় মূল্যবৃদ্ধি দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে শুধু উদ্বেগজনকই নয়, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর একটি বড় ধরনের আঘাত। বিদ্যুতের এই রেকর্ড মূল্যবৃদ্ধি করা হলো এমন এক সময়ে, যখন সাধারণ মানুষ এরইমধ্যেই উচ্চ মূল্যস্ফীতি, নিত্যপণ্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি এবং সংকুচিত ক্রয়ক্ষমতার কারণে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার মতো অবস্থায় রয়েছে।

সরকারের পক্ষ থেকে প্রায়ই বলা হয়, বিদ্যুৎ খাতে বিশাল ভর্তুকির চাপ সামাল দিতে এবং আইএমএফসহ আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোর ঋণ সহায়তার শর্তপূরণ করতে মূল্যবৃদ্ধি অনিবার্য ছিল। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বিদ্যুৎ খাতের এ কাঠামোগত লোকসান ও ভর্তুকির দায় কেন বারবার শুধু সাধারণ গ্রাহকের ঘাড়েই চাপানো হবে? বিদ্যুৎ খাতের অব্যবস্থাপনা, সিস্টেম লস এবং ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ তথা কেন্দ্রভাড়া বাবদ বেসরকারি কেন্দ্রগুলোকে অলস বসিয়ে রেখে হাজার হাজার কোটি টাকা পরিশোধের যে সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, তা দূর করার কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি। রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মেয়াদ বারবার বাড়িয়ে রাষ্ট্রীয় কোষাগার শূন্য করার দায় সাধারণ মানুষের নয়।

বিদ্যুতের এই রেকর্ড মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব শুধু মাস শেষের বিদ্যুৎ বিলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এটি একটি বহুমাত্রিক ‘ডমিনো ইফেক্ট’ বা চেইন রিঅ্যাকশন তৈরি করবে। বিদ্যুৎ হলো যে কোনো উৎপাদন ও সেবা খাতের মূল চালিকাশক্তি। এর মূল্যবৃদ্ধিতে শিল্প-কারখানায় উৎপাদন খরচ বাড়বে। ফলে দেশীয় পণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমবে এবং রপ্তানি বাণিজ্য বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। সেচের খরচ বাড়ায় কৃষিপণ্যেরও উৎপাদন ব্যয় বাড়বে, যার চূড়ান্ত প্রভাব পড়বে নিত্যপণ্যের বাজারে। উৎপাদন ও পরিবহণ খরচ বাড়ার অজুহাতে ব্যবসায়ীরা স্বভাবতই সব ধরনের পণ্য ও সেবার দাম বাড়িয়ে দেবে। এতে করে বাজারে নতুন করে মূল্যস্ফীতি দেখা দেবে, যা সীমিত আয়ের মানুষের জন্য হবে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা।

আমরা মনে করি, শুধু দাম বাড়িয়ে ঘাটতি পূরণের এই নীতি থেকে সরকারের বের হয়ে আসা উচিত। বিদ্যুৎ খাতে টেকসই শৃঙ্খলা ফেরাতে হলে সবার আগে প্রয়োজন এর ভেতরের গলদগুলো দূর করা। রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সঙ্গে চুক্তি পুনর্বিবেচনা করে ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝা দ্রুত কমাতে হবে। বিদ্যুৎ খাতের দুর্নীতি, অপচয় এবং সিস্টেম লস শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে। আমদানিকৃত ব্যয়বহুল জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান এবং নবায়নযোগ্য শক্তির প্রসারে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।

একটি কল্যাণকামী রাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত জনগণের জীবনকে সহজতর করা, সংকটে ফেলা নয়। আন্তর্জাতিক সংস্থার শর্ত পূরণ কিংবা ভর্তুকি সমন্বয়ের নামে দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে তীব্র আর্থিক কষ্টের মুখে ঠেলে দেওয়া কোনো টেকসই সমাধান হতে পারে না। আমরা সরকারের প্রতি বিদ্যুতের এই রেকর্ড মূল্যবৃদ্ধি পুনর্বিবেচনা করার এবং একইসঙ্গে বিদ্যুৎ খাতের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিদ্যমান অনিয়ম ও অপচয় দূর করে একটি সাশ্রয়ী, জবাবদিহিমূলক ও গণমুখী জ্বালানি নীতি প্রণয়নের জোর দাবি জানাচ্ছি।