ধর্ষণ-পরবর্তী শিশুহত্যা মামলার শাস্তির ইতিকথা

ড. মো. আনোয়ার হোসেন

প্রকাশ : ১১ জুন ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

পৃথিবীর বুক থেকে যখন একটি নিষ্পাপ শিশুর হাসিমুখ চিরতরে হারিয়ে যায় কোনো পৈশাচিক হিংস্রতায়, তখন মানবতা স্তব্ধ হয়ে পড়ে। বিশেষ করে ধর্ষণ-পরবর্তী শিশুহত্যার মতো জঘন্যতম অপরাধগুলো মানবসভ্যতার বিবেককে বারবার এক কঠিন কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দেয়। আইন ও বিচারব্যবস্থার মূল লক্ষ্যই হলো- এই ধরনের অন্ধকার মনস্তত্ত্বকে সমাজ থেকে উপড়ে ফেলা এবং ভুক্তভোগী পরিবারের অশ্রুসিক্ত চোখে ন্যায়বিচারের আলো ফুটিয়ে তোলা। সভ্যতার বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই বর্বর অপরাধের বিরুদ্ধে শাস্তির কঠোরতা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা কখনও মৃত্যুদণ্ড, কখনও রাসায়নিক খোজাকরণ, আবার কখনও বা আমৃত্যু কারাদণ্ডের রূপ নিয়েছে।

ইতিহাসের পাতা ওল্টালে বিশ্বজুড়ে এমন অনেক দৃষ্টান্তমূলক বিচারের নজির দেখা যায়, যেখানে অপরাধীকে তার নৃশংসতার চড়া মূল্য দিতে হয়েছে। যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় ৯ বছরের শিশু ফেলিসিয়া উইলিয়ামসকে ধর্ষণের পর হত্যার দায়ে গ্র?্যানভিল রিচি নামের এক অপরাধীকে আদালত চূড়ান্ত মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করে, যা বিশ্বজুড়ে কঠোর বিচার প্রক্রিয়ার এক অন্যতম উদাহরণ। ঠিক তেমনি চীনের ইউনান প্রদেশে এক কিশোরী সহপাঠীকে পাশবিক নির্যাতনের পর শ্বাসরোধে হত্যার ঘটনায় ১৪ বছর বয়সি এক নাবালককে দেশটির সর্বোচ্চ আদালত ঐতিহাসিক আমৃত্যু কারাদণ্ড প্রদান করে, যা চীনের বিচারিক ইতিহাসে অপ্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে এক নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত ছিল।

মধ্যপ্রাচ্য ও দূরপ্রাচ্যের দেশগুলোতে এই ধরনের পাশবিকতার শাস্তি অত্যন্ত তাৎক্ষণিক ও কঠোর রূপ নিয়ে থাকে। ইয়েমেনের রাজধানী সানায় মাত্র তিন বছরের এক কন্যা শিশুকে ধর্ষণের পর বর্বরোচিতভাবে হত্যার দায়ে এক অপরাধীকে শত শত মানুষের সামনে প্রকাশ্য ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়, যা অপরাধীদের মনে তীব্র ভীতির সঞ্চার করেছিল।

একইভাবে মধ্যপ্রাচ্যের আরেক দেশ ইরানে সাত বছর বয়সী এক আফগান শরণার্থী শিশুকে নির্মম নির্যাতনের পর হত্যার দায়ে আমির হোসেন পুরজাফর নামের এক অপরাধীকে দেশটির সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশে ফাঁসি কাষ্ঠে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দ্বীপরাষ্ট্র ইন্দোনেশিয়ায় চৌদ্দ বছর বয়সী স্কুলছাত্রী ইয়ুয়ুনকে গণধর্ষণ ও নৃশংস হত্যার ঘটনার পর তীব্র গণবিক্ষোভের মুখে তৎকালীন সরকার নতুন আইন পাস করে, যার অধীনে এই অপরাধের জন্য অপরাধীদের রাসায়নিক খোজাকরণসহ মৃত্যুদণ্ডের বিধান কার্যকর করা হয়। একইভাবে দূরপ্রাচ্যের দেশ জাপানেও এক শিশুকে চুরির উদ্দেশ্যে প্রবেশ করে ধর্ষণ ও হত্যার দায়ে জড়িত অপরাধীকে দীর্ঘ শুনানির পর আমৃত্যু কারাদণ্ড এবং ক্ষেত্রবিশেষে ফাঁসির ঐতিহাসিক রায় বহাল রাখে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট।

বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ রাষ্ট্র রাশিয়া এবং আফ্রিকার দেশগুলোতেও শিশুদের ওপর হওয়া এই ধরণের বর্বরতার বিরুদ্ধে কঠোরতম আইনি পদক্ষেপের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। রাশিয়ায় এক আট বছরের শিশুকে অপহরণ, ধর্ষণ ও বর্বরোচিতভাবে হত্যার দায়ে এক কুখ্যাত অপরাধীকে বিশেষ আদালতের মাধ্যমে যাবজ্জীবন একাকী কারাদণ্ড দেওয়া হয়। অপরদিকে আফ্রিকার দেশ মিশরে এক পাঁচ বছরের শিশুকে ঈদের দিনে ফুসলিয়ে নিয়ে গিয়ে পাশবিক নির্যাতন ও হত্যার দায়ে অপরাধীকে দ্রুততম সময়ে প্রকাশ্যে ফাঁসি দেওয়ার এক ঐতিহাসিক রায় কার্যকর করে কায়রোর ফৌজদারি আদালত।

আমেরিকার টেনেসি অঙ্গরাজ্যে এক শিশুকে পাশবিক নির্যাতন ও হত্যার অপরাধে জড়িত অপরাধীকে ইলেকট্রিক চেয়ারে বসিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার ইতিহাস রয়েছে, যা শুনানির সময় উপস্থিত দর্শকদেরও স্তব্ধ করে দিয়েছিল। এছাড়া ইদাহো এবং আলাবামার মতো অঙ্গরাজ্যগুলোও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাদের দণ্ডবিধিতে সংশোধন এনে শিশুদের ওপর হওয়া এই ধরণের জঘন্যতম অপরাধের একমাত্র শাস্তি হিসেবে ইনজেকশন প্রয়োগে বা ইলেকট্রিক চেয়ারে মৃত্যুদণ্ডকে অবধারিত করেছে।

লাতিন আমেরিকার দেশগুলো যেখানে সাধারণ অপরাধে মৃত্যুদণ্ড পরিহার করে চলে, তারাও শিশুদের সুরক্ষায় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। ব্রাজিলে এক ৭ বছরের শিশুকে নির্মমভাবে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যার ঘটনায় জড়িত অপরাধীকে দেশটির বিশেষ আদালত ৩০ বছরের কঠোর কারাদণ্ড প্রদান করে, যা দেশটির আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে বিবেচিত। অন্যদিকে মধ্য-আমেরিকার দেশ মেক্সিকোতে এক শিশুকে নৃশংসভাবে লাঞ্ছিত ও হত্যার দায়ে গ্যাং মেম্বারদের কোনো প্রকার প্যারোল বা ক্ষমা ছাড়াই ৬০ বছরের দীর্ঘ কারাদণ্ড দেওয়ার নজির রয়েছে।

ইউরোপের বিচার ব্যবস্থায় বন্দি সংশোধনের ওপর জোর দেওয়া হলেও শিশুহত্যা ও ধর্ষণের মতো অপরাধে তারা সর্বোচ্চ কঠোরতা প্রদর্শন করে। যুক্তরাজ্যে এক ৯ বছরের শিশুকে ফুঁসলিয়ে অপহরণ, ধর্ষণ ও হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত এক অপরাধীকে দেশটির আদালত ‘হোল লাইফ অর্ডার’ বা আমৃত্যু কারাদণ্ড দেয়, যার অর্থ অপরাধী জীবদ্দশায় কখনও কারাগার থেকে মুক্ত হতে পারবে না। ফ্রান্সের এক গ্রামীণ এলাকায় ৪ বছরের এক শিশুকে পাশবিক নির্যাতনের পর নদীতে ফেলে হত্যার দায়ে এক দম্পতিকে দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়।

সৌদি আরব এবং উত্তর কোরিয়ার মতো দেশগুলোতে এই ধরনের ঘৃণ্য অপরাধের বিচার ও শাস্তি অত্যন্ত দ্রুত ও প্রকাশ্যে সম্পন্ন হয়ে থাকে। সৌদি আরবে এক শিশুকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত অপরাধীকে ইসলামি শরিয়াহ আইনানুযায়ী প্রকাশ্য দিবালোকে তরবারি দ্বারা শিরশ্ছেদ করে শাস্তি কার্যকর করার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে।

অন্যদিকে উত্তর কোরিয়ায় শিশুদের ওপর হওয়া এই ধরনের পাশবিকতাকে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অপরাধ বিবেচনা করে প্রকাশ্য ফায়ারিং স্কোয়াডে লাইভ ফায়ার করে অপরাধীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার কঠোর নজির রয়েছে।

অস্ট্রেলিয়া এবং কানাডার মতো উন্নত দেশগুলো তাদের বিচারব্যবস্থায় ভুক্তভোগীর মানবিক দিকটিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে। অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে এক ৭ বছরের শিশুকে উৎসবের রাতে পাশবিক নির্যাতন ও হত্যার ঘটনায় অপরাধীকে কোনো প্রকার প্যারোলের সুযোগ না দিয়ে ৩৫ বছরের কঠোর কারাদণ্ড দেওয়া হয়। একইভাবে কানাডার টরন্টোতে এক শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যার দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে ২৫ বছর পর্যন্ত কোনো প্রকার আপিল বা প্যারোলের আবেদন করার অধিকার কেড়ে নিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছিল।

বিশ্বের ইতিহাসের এই বিচারগুলো প্রমাণ করে যে, সীমানা বা সংস্কৃতির ভিন্নতা থাকলেও নিষ্পাপ শিশুদের ওপর হওয়া পাশবিকতার বিরুদ্ধে পুরো পৃথিবীর মানবতা এক ও অভিন্ন। এবার আমরা দৃষ্টি ফেরাব আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশের দিকে, যেখানে সাম্প্রতিক সময়ে এই ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে বিচারব্যবস্থার এক ঐতিহাসিক ও দ্রুততম রূপ দেখা গেছে।

বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে সম্প্রতি এক নজিরবিহীন ও ঐতিহাসিক অধ্যায় রচিত হয়েছে রাজধানীর পল্লবীতে। জনপ্রিয় মডেল হাইস্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ৮ বছরের নিষ্পাপ শিশু রামিসা আক্তারকে তার প্রতিবেশী সোহেল রানা নামক এক নরপশু নিজের ফ্ল্যাটে ডেকে নিয়ে ধর্ষণ করে এবং পরবর্তীতে নৃশংসভাবে গলা কেটে হত্যা করে দেহ বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করে। এই ঘটনার পর পুরো দেশ যখন ক্ষোভে ফেটে পড়ে, তখন ঢাকা মহানগর শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকিন মাত্র ১৯ দিনের মাথায় মূল আসামি সোহেল রানা এবং তাকে সহায়তাকারী স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে চূড়ান্ত মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেন। মাত্র চার কার্যদিবসের মধ্যে সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ করে দেশের ইতিহাসের এই দ্রুততম বিচার ভুক্তভোগী পিতা আব্দুল হান্নান মোল্লাসহ পুরো সমাজকে এক দীর্ঘ প্রতীক্ষিত স্বস্তি এনে দিয়েছে।

অনুরূপ এক হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটেছিল মাগুরা জেলায়, যেখানে ৮ বছরের ছোট্ট শিশু আছিয়াকে তার বোনের শ্বশুরবাড়িতে বেড়াতে গিয়ে হিতু শেখ নামের এক প্রতিবেশীর পাশবিক লালসার শিকার হতে হয়। আশঙ্কাজনক অবস্থায় আছিয়াকে মাগুরা, ফরিদপুর এবং পরবর্তীতে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হলেও সে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। দেশজুড়ে তীব্র প্রতিবাদের মুখে মাগুরা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক এম জাহিদ হাসান মাত্র ১৪ কার্যদিবসের মধ্যে শুনানি শেষ করে অপরাধী হিতু শেখকে ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আদেশ দেন।

কক্সবাজারের উখিয়ার পালংখালীর লবণ মাঠে ৭ বছরের এক অবুঝ শিশুকে চকোলেটের লোভ দেখিয়ে তুলে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা করে সুটকেসে ভরে ফেলার ঘটনাটি মানবতাকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল।

এই মামলায় কক্সবাজার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২ এর বিচারক মোঃ ওসমান গণি আসামি মো. সোলেমানকে এক সিরিয়াল কিলার হিসেবে অভিহিত করে মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি দুটি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ৭ বছরের কারাদণ্ডের ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন। আদালত তার পর্যবেক্ষণে স্পষ্ট বলেন যে, শিশুদের ওপর এমন বর্বরতা চালানো অপরাধীদের সমাজে বেঁচে থাকার কোনো অধিকার নেই।

ঢাকার কেরানীগঞ্জের এক ডোবা থেকে উদ্ধার হওয়া কিশোরী মারিয়া আক্তারের ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাটিও এদেশের মানুষকে কাঁদিয়েছিল।

৩ বছর আগে মারিয়াকে দলবদ্ধভাবে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যা করে লাশ গুম করার দায়ে ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৪ এর বিচারক মুনশি মো. মশিউর রহমান আসামি সজীব, রকিব এবং শাওনকে চূড়ান্ত মৃত্যুদণ্ড দেন।

রাজধানীর অদূরে দোহার উপজেলায় ২০১৮ সালে এক কিশোরী মেয়েকে ঘরে একা পেয়ে ধর্ষণের পর নির্মমভাবে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। দীর্ঘ আইনি লড়াই এবং ১৯ জন সাক্ষীর জবানবন্দি পর্যালোচনার পর ঢাকার বিশেষ ট্রাইব্যুনাল এই মামলার একমাত্র আসামিকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আদেশ দেন। পরিশেষে বলতে চাই, ধর্ষণ-পরবর্তী শিশুহত্যার প্রতিটি ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সমাজের ভেতরে লুকিয়ে থাকা কিছু নরপশু কীভাবে মানবতাকে ধুলোয় মিশিয়ে দেয়। বিশ্বজুড়ে এবং বাংলাদেশের এই শাস্তির ইতিহাস শুধু অপরাধের খতিয়ান নয়, বরং এটি নিষ্পাপ শিশুদের হারিয়ে যাওয়া আত্মার জন্য ন্যায়বিচারের এক একটি দীর্ঘশ্বাস। আইনের এই কঠোর চাবুক এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে রায় বাস্তবায়নই শুধু আগামী দিনের শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ ও সুন্দর পৃথিবী গড়ে তুলতে পারে, যেখানে কোনো শিশুকে আর লালসার শিকার হয়ে অকালে ঝরে যেতে হবে না।

ড. মো. আনোয়ার হোসেন

প্রাবন্ধিক ও কথাসাহিত্যিক