হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী লোকজ খেলাধুলা

জান্নাতুল ফেরদৌস জেরিন

প্রকাশ : ১২ জুন ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

এক সময় গ্রামবাংলার নিস্তরঙ্গ বিকালে মেঠোপথ আর সবুজ মাঠগুলো মুখরিত থাকত কিশোর-কিশোরীদের প্রাণবন্ত কলকাকলিতে। সূর্য যখন পশ্চিম আকাশে হেলতে শুরু করত, তখন পাড়ায় পাড়ায় শুরু হতো গোল্লাছুট, দাঁড়িয়াবান্দা, ডাংগুলি কিম্বা হা-ডু-ডুর লড়াই। কিন্তু সময়ের নিষ্ঠুর বিবর্তনে আজ সেই চিরচেনা দৃশ্যপট প্রায় সম্পূর্ণ বদলে গেছে। শৈশবের সেই ধুলোমাখা আনন্দময় দিনগুলো এখন বন্দি হয়ে গেছে চার দেয়ালের কৃত্রিম খাঁচায় আর স্মার্টফোনের নীল আলোয়।

প্রযুক্তির তীব্র জোয়ার আর অপরিকল্পিত নগরায়ণের যাতাকলে পিষ্ট হয়ে হারিয়ে যেতে বসেছে আমাদের হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক বড় অংশ- এই লোকজ খেলাধুলা। বাঙালির এই নিজস্ব খেলাগুলো শুধু বিনোদনের মাধ্যম ছিল না, বরং তা ছিল সামাজিক মেলবন্ধনের এক অনন্য সেতু। লুকোচুরি, কুতকুত, ইচিং-বিচিং বা বৌ-চির মতো খেলাগুলো কোনো দামী সরঞ্জামের ওপর নির্ভরশীল ছিল না; স্রেফ এক টুকরো ভাঙা হাড়ি বা গাছের ডাল দিয়েই চলত হৃদয়ের সবটুকু উজাড় করা উৎসব। তবে বর্তমান প্রজন্মের কাছে এসব খেলার নাম এখন অনেকটা রূপকথার গল্পের মতো শোনায়। গবেষণায় দেখা যায়, গত দুই দশকে শুধু আমাদের অবহেলার কারণে গ্রাম ও শহর অঞ্চল থেকে প্রায় ৩০টিরও বেশি দেশীয় খেলা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এই হারিয়ে যাওয়ার নেপথ্যে প্রধান অন্তরায় হিসেবে কাজ করছে বর্তমানের ডিজিটাল আসক্তি। এখনকার শিশুরা খোলা মাঠে দৌড়াদৌড়ির চেয়ে ভিডিও গেম, ইউটিউব বা সোশ্যাল মিডিয়ায় সময় কাটাতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। মাঠের ফুটবল এখন মোবাইলের স্ক্রিনে ‘ফিফা’ গেমে রূপান্তরিত হয়েছে, যার ফলে শিশুদের শুধু শারীরিক স্থূলতাই বাড়ছে না, বরং তাদের সামাজিক ও মানসিক বিকাশেও তৈরি হচ্ছে এক বিশাল শূন্যতা। এর পাশাপাশি বড় শহরগুলোতে মাঠের তীব্র সংকট আর গ্রামীণ এলাকায় কৃষি জমি ভরাট করে দালানকোঠা নির্মাণের ফলে খেলার জায়গাগুলো সংকুচিত হয়ে আসছে।

যেটুকু সময় শিশুরা পায়, তার সিংহভাগ কাটে কোচিং আর স্কুলের ভারী ব্যাগের নিচে চাপা পড়ে। ফলে ‘শারীরিক শ্রমের’ বদলে ‘ভার্চুয়াল বিনোদনই’ তাদের একমাত্র সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞ মহলের মতে, লোকজ খেলাধুলা মানুষের ধৈর্য, নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা এবং দলবদ্ধভাবে কাজ করার মানসিকতা তৈরি করত। এসব খেলা হারিয়ে যাওয়ায় বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে সহনশীলতা কমছে এবং একাকীত্ব বাড়ছে, যা দীর্ঘমেয়াদী মনস্তাত্ত্বিক সমস্যার সৃষ্টি করছে। তবে আমাদের শিকড়কে রক্ষা করার সুযোগ এখনো শেষ হয়ে যায়নি। হারানো ঐতিহ্যকে পুনরুজ্জীবিত করতে প্রয়োজন পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ। প্রতিটি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে অন্তত সপ্তাহে একদিন দেশীয় খেলাধুলার বাধ্যতামূলক প্রতিযোগিতা আয়োজন করা যেতে পারে। একই সঙ্গে জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে নিয়মিত কাবাডি বা লাঠি খেলার মতো ইভেন্টগুলোকে সরকারিভাবে পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া জরুরি। আধুনিক প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে অনেক সহজ করেছে ঠিকই, কিন্তু শৈশবের সেই নির্মল আনন্দ আর মাটির ঘ্রাণ কেড়ে নিয়েছে। আমরা যদি আজ আমাদের ঐতিহ্যকে রক্ষা করতে না পারি, তবে আগামীর প্রজন্মের কাছে নিজেদের জাতিগত পরিচয় তুলে ধরা কঠিন হয়ে পড়বে।

জান্নাতুল ফেরদৌস জেরিন

শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়