স্মৃতির মেলায় দাঁড়িয়ে সার্কাসের শেষ লড়াই

জুবাইয়া বিন্তে কবির

প্রকাশ : ১৩ জুন ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

রাত নামার আগেই গ্রামের মেলার মাঠে শুরু হতো এক অদ্ভুত উন্মাদনা। দূর থেকে ভেসে আসত মাইকের কর্কশ আহ্বান ‘আর মাত্র কিছুক্ষণ পর শুরু হবে বিশ্ববিখ্যাত সার্কাসের রোমাঞ্চকর প্রদর্শনী!’ রঙিন বাতির ঝলকানি, বাদ্যের তালে তালে মানুষের উচ্ছ্বাস, হাতে বেলুন আর তুলার মিষ্টি নিয়ে ছুটে চলা শিশুদের উজ্জ্বল চোখ সব মিলিয়ে সার্কাস ছিল এক টুকরো স্বপ্নের নাম। বিশাল তাঁবুর ভেতরে ঢুকে আমরা দেখতাম অসম্ভবকে সম্ভব করার এক বিস্ময়কর আয়োজন; কেউ আগুনের বৃত্ত পেরিয়ে ছুটে যেত, কেউ জীবনকে মুঠোয় নিয়ে আকাশে দোল খেত, আবার কেউ হাসির আড়ালে লুকিয়ে রাখত নিজের না- বলা কষ্টের গল্প। দর্শকের করতালিতে মুখর হয়ে উঠত চারদিক, অথচ সেই করতালির আড়ালেই রয়ে যেত শিল্পীদের নিঃশব্দ দীর্ঘশ্বাস।

কিন্তু প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিকতার এই সময়ে সেই ‘রঙিন বাতির ঝলকানি, ক্রমেই ম্লান হয়ে আসছে। হারিয়ে যাচ্ছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গড়ে ওঠা এক অনন্য শিল্পধারা, আর তার সঙ্গে অনিশ্চয়তার অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে হাজারো শিল্পীর জীবন।

সার্কাসের জন্ম: প্রাচীন রোম থেকে বাংলার মেলার মাঠে, সার্কাসের ইতিহাস প্রায় দুই হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো। ইতিহাসবিদদের মতে, প্রাচীন রোমের বিশাল বৃত্তাকার ক্রীড়াঙ্গন সার্কাস ম্যাক্সিমাস থেকেই ‘সার্কাস’ শব্দটির উৎপত্তি। সেখানে ঘোড়দৌড়, কসরত, যুদ্ধকৌশল ও বিভিন্ন প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হতো। আধুনিক সার্কাসের সূচনা হয় ১৭৬৮ সালে ইংল্যান্ডে, যখন অশ্বারোহী শিল্পী ফিলিপ অ্যাস্টলি প্রথমবারের মতো বৃত্তাকার মঞ্চে ঘোড়ার কসরতের সঙ্গে অন্যান্য বিনোদন যুক্ত করেন। পরে ইউরোপ, আমেরিকা ও এশিয়াজুড়ে সার্কাস জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। উনিশ শতকে ব্রিটিশ শাসনামলে কলকাতার মাধ্যমে ভারতীয় উপমহাদেশে আধুনিক সার্কাসের বিস্তার ঘটে।

বাংলাদেশে সার্কাসের যাত্রা : বাংলার সার্কাসের ইতিহাসও গৌরবময়। তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান বাংলাদেশের ভূখণ্ডে প্রথম সংগঠিত সার্কাস দল ছিল ‘লায়ন সার্কাস’, যা ১৯০৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে এর নাম পরিবর্তন করে ‘সাধনা লায়ন সার্কাস’ রাখা হয়। পাকিস্তান আমল এবং স্বাধীনতার পরও দেশে অসংখ্য সার্কাস দল গড়ে ওঠে। একসময় বরিশাল, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সাতক্ষীরা, বগুড়া ও রংপুর ছিল সার্কাস শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।

হাসির মুখোশের আড়ালের কান্না : সাতক্ষীরার তরুণ জোকার মোহাম্মদ বাবুর জীবন যেন আজকের সার্কাস শিল্পীদের প্রতিচ্ছবি। মঞ্চে তিনি মানুষকে হাসান; কিন্তু নিজের জীবনে হাসির সুযোগ খুব কম। আগে যেখানে বছরের অধিকাংশ সময় কাজ থাকত, এখন তিন-চার মাসের বেশি সার্কাস চলে না। বাকি সময় দিনমজুরি করে সংসার চালাতে হয়। করতালির শব্দ থেমে গেলে শুরু হয় জীবনযুদ্ধের কঠিন বাস্তবতা।

তাঁবুতেই জন্ম, তাঁবুতেই বেড়ে ওঠা : সার্কাস পরিবারগুলোর জীবন ভ্রাম্যমাণ। আজ বগুড়া, কাল যশোর, পরশু দিনাজপুর। এক মেলা থেকে আরেক মেলায় ছুটে চলাই তাদের নিয়তি। ফলে তাদের সন্তানদের জীবনে স্থায়ী ঠিকানা বলতে কিছু নেই। শিক্ষার আলো পৌঁছানোর আগেই অনেক শিশু মঞ্চের আলোয় দাঁড়াতে বাধ্য হয়। জন্মের পর থেকেই তারা যেন অনিশ্চয়তার উত্তরাধিকার বহন করে।

হারিয়ে যাওয়া শৈশবের গল্প : নূর-ই-জয়নব আকসার মতো অসংখ্য শিশুর গল্প আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়। স্কুলের বইয়ের বদলে তাদের হাতে উঠে আসে কসরতের সরঞ্জাম। স্বপ্ন দেখার বয়সেই তারা ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় জড়িয়ে পড়ে। শিক্ষাবঞ্চনা তাদের জীবনের সম্ভাবনাকে সংকুচিত করে দেয়। ফলে দারিদ্র্য ও অনিশ্চয়তার চক্র প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলতেই থাকে।

প্রযুক্তির পর্দায় হারিয়ে যাচ্ছে তাঁবুর আলো : একসময় মানুষ বিস্ময় দেখতে সার্কাসে যেত। এখন সেই বিস্ময় হাতের মুঠোয়। স্মার্টফোন, ইউটিউব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ওটিটি প্ল্যাটফর্ম সব মিলিয়ে বিনোদনের জগৎ বদলে গেছে। যে কসরত দেখতে একসময় হাজার মানুষ মাঠে ভিড় করত, এখন তা কয়েক সেকেন্ডে দেখা যায় মোবাইলের পর্দায়। ফলে সার্কাসের দর্শক দ্রুত কমে যাচ্ছে।

প্রশাসনিক জটিলতার বেড়াজাল : সার্কাস শিল্পের সংকট শুধু প্রযুক্তিগত নয়। প্রদর্শনীর অনুমতি পেতে দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, নানা বিধিনিষেধ ও আর্থিক ঝুঁকি উদ্যোক্তাদের নিরুৎসাহিত করছে। একটি দলকে চালিয়ে রাখতে যে বিনিয়োগ প্রয়োজন, তা এখন আর আয় দিয়ে তুলতে পারছে না অধিকাংশ মালিক।

পশুপাখির খেলা বন্ধ হওয়ার প্রভাব : একসময় বাঘ, ভাল্লুক, ঘোড়া কিংবা বানরের খেলা ছিল সার্কাসের বড় আকর্ষণ। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের স্বার্থে এসব প্রদর্শনী বন্ধ হওয়া অবশ্যই ইতিবাচক সিদ্ধান্ত। কিন্তু বিকল্প আকর্ষণ তৈরি না করেই পুরোনো কাঠামো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দর্শকসংখ্যা কমে গেছে। ফলে সার্কাস শিল্প নতুন সংকটের মুখোমুখি হয়েছে।

ঝুঁকির বিনিময়ে জীবিকা : সার্কাস শিল্পীদের প্রতিটি প্রদর্শনীতে লুকিয়ে থাকে মৃত্যুঝুঁকি। ট্রাপিজ, আগুনের খেলা কিংবা উচ্চতায় কসরত যে কোনো মুহূর্তে ঘটতে পারে দুর্ঘটনা। অথচ নেই কোনো জীবনবিমা, নেই স্বাস্থ্যসুরক্ষা, নেই পেশাগত নিরাপত্তা। আহত হলে চিকিৎসার খরচ বহন করতে হয় নিজেদেরই। শিল্পী সালেহা খাতুনের মতো অনেকেই তাই ঝুঁকিকে সঙ্গী করেই জীবন কাটান। আধুনিকায়নের সুযোগ কি নেই? বিশ্বের অনেক দেশ সার্কাসকে নতুনভাবে পুনর্নির্মাণ করেছে। চীনের অ্যাক্রোবেটিক শিল্প কিংবা কানাডার সমকালীন সার্কাস তার উজ্জ্বল উদাহরণ। প্রযুক্তিনির্ভর আলোকসজ্জা, নাটকীয় উপস্থাপনা, নান্দনিক মঞ্চসজ্জা ও মানবদেহের অসাধারণ কসরতের মাধ্যমে তারা নতুন দর্শক সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশের সার্কাসও চাইলে নতুন রূপে ফিরে আসতে পারে, যদি যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা ও পরিকল্পনা থাকে।

সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা হাজারো জীবন : সার্কাস হারিয়ে যাওয়া মানে শুধু একটি শিল্পের মৃত্যু নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাজারো শিল্পী, কর্মচারী, কারিগর, পরিবহন শ্রমিক এবং তাদের পরিবার। একই সঙ্গে হারিয়ে যাবে গ্রামীণ সমাজের বহু স্মৃতি, বহু লোকজ ঐতিহ্য। আমাদের সংস্কৃতির বৈচিত্র্যের একটি উজ্জ্বল অধ্যায় মুছে যাবে ইতিহাসের পাতা থেকে।

শিল্পীদের পারিশ্রমিক : সার্কাস শিল্পীদের আয়ের পরিমাণ অত্যন্ত অনিশ্চিত। বিভিন্ন প্রদর্শনীতে একজন শিল্পী দৈনিক ৩ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত পারিশ্রমিক পেতে পারেন, তবে তা নিয়মিত নয়। অনেক ক্ষেত্রে একটি ছোট দলের কয়েক ঘণ্টার প্রদর্শনী থেকে মোট আয় হয় মাত্র ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা, যা দলীয় সদস্যদের মধ্যে ভাগ হয়ে যায়। বছরের অধিকাংশ সময় কাজ না থাকায় অনেক শিল্পীকেই দিনমজুরি, রিকশা চালানো বা অন্য পেশায় যুক্ত হতে হয়।

একটি সার্কাস পরিচালনায় কী কী প্রয়োজন : একটি পূর্ণাঙ্গ সার্কাস পরিচালনা করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। প্রয়োজন হয় বিশাল তাঁবু, গ্যালারি, আলো-সাউন্ড ব্যবস্থা, নিরাপত্তা সরঞ্জাম, পরিবহন ব্যবস্থা, প্রশিক্ষিত শিল্পী, পোশাক, মঞ্চসজ্জা এবং আবাসনের। এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াত, তাঁবু স্থাপন ও খোলার জন্যও বড় কর্মীবাহিনী দরকার হয়। একটি দল যদি কোনো এলাকায় অন্তত ১৫ দিন প্রদর্শনী করতে না পারে, তাহলে আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে লোকসানের ঝুঁকি তৈরি হয়।

দুর্ঘটনা, আহত ও নিহত শিল্পীদের বাস্তবতা : বাংলাদেশে সার্কাস শিল্পীদের আহত বা নিহত হওয়ার কোনো কেন্দ্রীয় সরকারি পরিসংখ্যান নেই। তবে শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, ট্রাপিজ, আগুনের খেলা, মোটরসাইকেল স্টান্ট, উঁচু দড়ির কসরত এবং অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ প্রদর্শনীতে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। অনেক শিল্পী স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করেন বা পেশা ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। দুঃখজনক বিষয় হলো, তাদের জন্য নেই কোনো জীবনবিমা, দুর্ঘটনা তহবিল বা পেশাগত নিরাপত্তা ব্যবস্থা।

সমাজ ও রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি : একসময় সার্কাস ছিল গ্রামীণ সমাজের অন্যতম প্রধান বিনোদন। কিন্তু বর্তমানে অনেকেই এটিকে পুরোনো বা অপ্রয়োজনীয় বিনোদন হিসেবে দেখেন। অন্যদিকে কোনো মেলায় অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে তার দায় অনেক সময় সার্কাসের ওপর চাপানো হয়।

জুবাইয়া বিন্তে কবির

অর্থনীতিবিদ, গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট