বিশ্বকাপের উন্মাদনা বনাম মানবিক সম্প্রীতি : আনন্দ যেন সংঘাতের কারণ না হয়

প্রকাশ : ১৩ জুন ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ফুটবল কিংবা ক্রিকেট- যেকোনো বিশ্বকাপই বিশ্বজুড়ে এক মহোৎসবের আমেজ নিয়ে আসে। আমাদের দেশেও এই উন্মাদনার পারদ চড়ে আকাশচুম্বী। প্রিয় দলের প্রতি নিখাদ ভালোবাসা, জার্সি পরা, পতাকা ওড়ানো কিংবা মাঝরাতে দলবেঁধে খেলা দেখার মাঝে এক অন্যরকম আনন্দ লুকিয়ে থাকে।

কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই সুস্থ ও নির্মল ক্রীড়ামোদি উন্মাদনা মাঝেমধ্যেই অন্ধ উগ্রতায় রূপ নিচ্ছে। খেলার মাঠের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা যখন গ্যালারি বা টিভি পর্দা পেরিয়ে আমাদের পাড়া-মহল্লায়, চায়ের দোকানে বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হিংসাত্মক রূপ নেয়, তখন তা সমাজ ও মানবতার জন্য এক বড় সতর্কসংকেত হয়ে দাঁড়ায়। ক্রীড়া সংস্কৃতির মূলভিত্তিই হলো ‘স্পোর্টসম্যানশিপ’ বা খেলোয়াড়সুলভ মনোভাব। খেলায় হার-জিত থাকবেই, এটাই চিরন্তন সত্য। কোনো দল জিতলে আনন্দ মিছিল হবে, উল্লাস হবে- সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই আনন্দের প্রকাশ যখন প্রতিপক্ষ দলের সমর্থকদের খোঁচা দেওয়া, কটূক্তি করা কিংবা তুচ্ছতাচ্ছিল্য করার পর্যায়ে চলে যায়, তখনই বিপত্তির শুরু হয়।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ট্রল করার সস্তা সংস্কৃতি আজ বাস্তব জীবনে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের জন্ম দিচ্ছে। সামান্য তর্কাতর্কি থেকে শুরু করে হাতাহাতি, এমনকি প্রাণহানির মতো নির্মম ঘটনাও আমাদের দেখতে হয়েছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক ও লজ্জাজনক।

আমাদের মনে রাখা দরকার, যে ভিনদেশি দল বা খেলোয়াড়দের নিয়ে আমরা সংঘাতে জড়াচ্ছি, তারা কিন্তু আমাদের এই মারামারির খবরও জানে না। খেলার মাঠে নব্বই মিনিট বা চার ঘণ্টার লড়াই শেষে প্রতিপক্ষ দলের খেলোয়াড়রা একে অপরের সঙ্গে কোলাকুলি করেন, জার্সি বদল করেন এবং পারস্পরিক সম্মান প্রদর্শন করেন।

অথচ দূর দেশের দর্শক হয়ে আমরা নিজেদের ভাই, বন্ধু বা প্রতিবেশীর সাথে শত্রুতামূলক আচরণ করছি।

ফুটবলের ঈশ্বর ডিয়েগো ম্যারাডোনা বা বর্তমানের লিওনেল মেসি, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো—কেউই কখনো তাদের সমর্থকদের অন্য দলের মানুষকে আঘাত করতে শেখাননি।

খেলার উদ্দেশ্য মানুষকে বিনোদন দেওয়া এবং বিশ্ববাসীকে এক সুতোয় গাঁথা, বিভেদ তৈরি করা নয়। বিশ্বকাপের এই উন্মাদনা যেন কোনোভাবেই সহিংসতায় না গড়ায়, সেজন্য এখনই সম্মিলিত সচেতনতা প্রয়োজন।

প্রথমত, পরিবার থেকে সচেতনতা শুরু করতে হবে। তরুণ প্রজন্মকে বোঝাতে হবে যে, খেলা কেবলই বিনোদনের একটি মাধ্যম, এটি জীবন-মরণের যুদ্ধ নয়।

দ্বিতীয়ত, স্থানীয় প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে খেলা চলাকালীন এবং খেলা শেষে যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে নজরদারি বাড়াতে হবে। বিশেষ করে জনসমাগমস্থলে বড় পর্দায় খেলা দেখানোর ক্ষেত্রে বাড়তি নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা জরুরি।

তৃতীয়ত, গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ইনফ্লুয়েন্সারদের ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে হবে, যাতে উসকানিমূলক কোনো কন্টেন্ট বা সংবাদ ছড়িয়ে না পড়ে।

পরিশেষে বলা যায়, খেলা হোক সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির সেতুবন্ধন। বিশ্বকাপের উন্মাদনা আমাদের হৃদয়ে আনন্দের দোলা দিক, কিন্তু তা যেন কোনো পরিবারের জন্য কান্নার কারণ না হয়ে দাঁড়ায়। আসুন, আমরা হারি বা জিতি- পরমতসহিষ্ণুতা বজায় রাখি। প্রিয় দলের প্রতি সমর্থন বজায় রেখেও প্রতিপক্ষকে সম্মান জানানোর মানসিকতা তৈরি করি। উগ্রতা বর্জন করে সুস্থ ক্রীড়া সংস্কৃতি চর্চার মাধ্যমে এবারের বিশ্বকাপকে আমরা সত্যিকারের একটি উৎসব হিসেবে উদযাপন করি।