ঐতিহ্যের নামে প্রতারণা : খান জাহান আলীর দিঘির অন্তরালের গল্প
জুবাইয়া বিন্তে কবির
প্রকাশ : ১৪ জুন ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলার ইতিহাসে এমন কিছু নাম আছে, যাদের স্মরণ করলে ধর্ম, সংস্কৃতি, মানবতা ও সভ্যতার এক অনন্য সমন্বিত চিত্র চোখের সামনে ভেসে ওঠে। হযরত খান জাহান আলী (রহ.) তেমনই এক মহিমান্বিত ব্যক্তিত্ব। দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলার বিস্তীর্ণ জনপদে ইসলাম প্রচার, জনবসতি স্থাপন, সড়ক-সেতু নির্মাণ, জলাশয় খনন এবং নগরসভ্যতার বিকাশে তাঁর অবদান ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ। তাঁর নির্মিত মসজিদ, দিঘি ও স্থাপত্যকীর্তি আজও অতীতের গৌরব বহন করছে। কিন্তু তাঁর মাজারসংলগ্ন দিঘির কুমিরগুলোকে ঘিরে গড়ে ওঠা কিংবদন্তি, বিশ্বাস এবং সাম্প্রতিক ট্র্যাজেডি নতুন করে বহু প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
খান জাহান আলীর আগমন ও বাগেরহাটের উত্থান : পঞ্চদশ শতকের শুরুতে যখন দক্ষিণ বাংলার বিস্তীর্ণ অঞ্চল ছিল বনজঙ্গল ও জলাভূমিতে আচ্ছাদিত, তখন খান জাহান আলী (রহ.) এই অঞ্চলে এসে এক নতুন জনপদের ভিত্তি স্থাপন করেন। তিনি শুধু একজন সুফি সাধক ছিলেন না; ছিলেন একজন দক্ষ প্রশাসক, নগর পরিকল্পনাবিদ এবং সমাজসংস্কারক। তাঁর হাত ধরেই গড়ে ওঠে ঐতিহাসিক খলিফাতাবাদ, যা আজকের বাগেরহাট নামে পরিচিত। তাঁর নির্মিত ষাটগম্বুজ মসজিদ আজ বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদা লাভ করেছে।
দিঘি, কুমির ও লোকবিশ্বাসের জন্ম : খান জাহান আলীর মাজারসংলগ্ন বিশাল দিঘিটি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষের কৌতূহল ও বিশ্বাসের কেন্দ্রবিন্দু। লোককথা বলে, তিনি নিজ হাতে এখানে দুটি কুমির অবমুক্ত করেছিলেন। তাদের নাম ছিল ‘কালা পাহাড়’ ও ‘ধলা পাহাড়’। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই কুমির যুগল শুধু একটি প্রাণী নয়, বরং এক আধ্যাত্মিক প্রতীকে পরিণত হয়।
ইতিহাস ও কিংবদন্তির মাঝামাঝি সত্য : ইতিহাসবিদরা মনে করেন, কুমিরগুলো সম্ভবত স্থানীয় জলাভূমি থেকেই এসেছে। কিন্তু লোকবিশ্বাস তাদের অলৌকিক মর্যাদা দিয়েছে। শত শত বছর ধরে মানুষ বিশ্বাস করেছে, এই কুমিরের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করলে মানত পূরণ হয়, রোগমুক্তি আসে এবং জীবনের বিপদ দূর হয়। এই বিশ্বাসই পরবর্তীতে এক ভয়ংকর বাণিজ্যের ভিত্তি তৈরি করে।
ছয় শতকের সহাবস্থান : দীর্ঘ প্রায় ৬০০ বছর ধরে মানুষ ও কুমির একই পরিবেশে সহাবস্থান করেছে। মাজারে আগত অসংখ্য মানুষ দিঘির পাড়ে এসেছে, গোসল করেছে, মানত করেছে। অথচ আদি বংশের কুমিরদের দ্বারা মানুষের ওপর বড় ধরনের আক্রমণের ঘটনা ইতিহাসে খুব কমই পাওয়া যায়। এ কারণেই কুমিরগুলোকে ঘিরে মানুষের মধ্যে ভক্তি ও বিস্ময়ের এক মিশ্র অনুভূতি জন্ম নিয়েছিল।
আদি বংশের অবসান : কালের বিবর্তনে একসময় আদি কুমির বংশ বিলুপ্তির পথে এগিয়ে যায়। ২০০৬ সালে ‘কালা পাহাড়’ এবং ২০১৫ সালে ‘ধলা পাহাড়’-এর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে খান জাহান আলীর যুগের কুমির বংশের সমাপ্তি ঘটে। ইতিহাসের একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের সেখানেই ইতি টানা হয়।
মাদ্রাজ থেকে নতুন কুমিরের আগমন : ঐতিহ্য রক্ষার নামে ২০০৪ সালে ভারতের মাদ্রাজ ক্রোকোডাইল ব্যাংক থেকে ছয়টি কুমির আনা হয়। উদ্দেশ্য ছিল দিঘিতে কুমিরের উপস্থিতি বজায় রাখা। কিন্তু এই সিদ্ধান্তের দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল নিয়ে তখন যথেষ্ট গবেষণা বা জননিরাপত্তা বিশ্লেষণ করা হয়েছিল কি না, সে প্রশ্ন আজও রয়ে গেছে।
ঐতিহ্য রক্ষার নামে ভুল পরিকল্পনা : নতুন কুমিরগুলো ছিল ভিন্ন পরিবেশে বেড়ে ওঠা প্রাণী। তাদের আচরণ, এলাকা দখলের প্রবণতা এবং মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। ফলে ধীরে ধীরে দিঘির পরিবেশে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিতে শুরু করে।
মানুষের বিশ্বাস, খাদেমদের সুযোগ : মানুষের ধর্মীয় আবেগ ও সরল বিশ্বাসকে পুঁজি করে একশ্রেণির অসাধু ব্যক্তি কুমিরকে কেন্দ্র করে ‘মানত অর্থনীতি’ গড়ে তোলে। কেউ ছাগল মানত করত, কেউ হাঁস-মুরগি, কেউ নগদ অর্থ। কিন্তু প্রশ্ন হলো এই বিপুল দান কোথায় যেত?
ভক্তির আড়ালে বাণিজ্যের সাম্রাজ্য : অভিযোগ রয়েছে, মাজারের কিছু প্রভাবশালী খাদেম ও তাদের সহযোগীরা বছরের পর বছর ধরে এই মানতকে ব্যক্তিগত আয়ের উৎসে পরিণত করেছেন।
কুমিরকে ব্যবহার করা হয়েছে দর্শনার্থী আকর্ষণের হাতিয়ার হিসেবে। ধর্মীয় অনুভূতিকে নগদ অর্থে রূপান্তরের এই প্রবণতা শুধু অনৈতিকই নয়, ইসলামের মৌলিক শিক্ষারও পরিপন্থি।
ইসলাম কী বলে? ইসলামে মানত একটি ইবাদতসংশ্লিষ্ট বিষয়। কিন্তু কোনো প্রাণী, কবর বা মাজারকে কেন্দ্র করে অলৌকিক ক্ষমতার বিশ্বাস তৈরি করে অর্থ আদায় করা শরিয়তের দৃষ্টিতে গুরুতর বিভ্রান্তি।
আল্লাহ ছাড়া কারও কাছে সাহায্য প্রার্থনা কিংবা অলৌকিক ক্ষমতার আরোপ ইসলামের আকিদার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
কুমিরকে ঘিরে প্রতারণার জাল : হজরত খান জাহান আলী (রহ.)-এর মাজারকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ধর্মীয় আবেগ ও ঐতিহাসিক ঐতিহ্যকে পুঁজি করে দীর্ঘদিন ধরে একশ্রেণির অসাধু ব্যক্তি প্রতারণার এক অদৃশ্য জাল বিস্তার করেছে বলে নানা অভিযোগ রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কুমিরের নামে একাধিক পেজ ও গ্রুপ খুলে ‘মানত করলে মনোবাসনা পূরণ হবে’, ‘কুমিরের জন্য ছাগল দিলে রোগমুক্তি মিলবে’ কিংবা ‘বিশেষ তাবিজে ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটবে’ এমন বিভ্রান্তিকর প্রচারণা চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। শুধু তাই নয়, কুমিরের দাঁত, চামড়া কিংবা শরীরের বিভিন্ন অংশের অলৌকিক ক্ষমতার গল্প ছড়িয়ে ভুয়া বিজ্ঞাপন দেওয়ার ঘটনাও সামনে এসেছে। ধর্মীয় বিশ্বাসকে ব্যবহার করে মানুষের সরলতা ও দুর্বলতার সুযোগ নেওয়া শুধু নৈতিক অপরাধই নয়; এটি প্রতারণা, ভোক্তা অধিকার লঙ্ঘন এবং বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনেরও সুস্পষ্ট পরিপন্থি। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, একজন মহান সুফি সাধকের নাম ও স্মৃতিকে ব্যবহার করে এই প্রতারণার ব্যবসা বছরের পর বছর ধরে চলে এসেছে।
ঘুমের ওষুধ, প্রদর্শনী ও নির্যাতন : বন বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, দর্শনার্থীদের সামনে কুমিরকে সহজে দেখানোর জন্য কখনও কখনও খাবারের সঙ্গে চেতনানাশক ওষুধ প্রয়োগের অভিযোগও রয়েছে। যদি তা সত্য হয়, তবে এটি বন্যপ্রাণীর প্রতি চরম নিষ্ঠুরতা।
কুকুর থেকে শিশু : বিপদের পূর্বাভাস : ২০২৬ সালের আগে একটি কুকুরকে কুমির টেনে নেওয়ার ঘটনা ব্যাপক আলোচিত হয়েছিল। সেটিই ছিল বড় ধরনের সতর্কবার্তা। কিন্তু প্রশাসনিকভাবে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ার ফলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেয়।
ফাতেমার মৃত্যু : বিবেককে নাড়া দেওয়া এক ট্র্যাজেডি : আট বছরের শিশু ফাতেমার মৃত্যু শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়; এটি দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, দায়িত্বহীনতা এবং বাণিজ্যিক স্বার্থের নির্মম পরিণতি। একটি শিশুর জীবন কোনোভাবেই ঐতিহ্য রক্ষার অজুহাতে ঝুঁকির মুখে ফেলা যায় না। দায় কার? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে খাদেম, প্রশাসন, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ, বন বিভাগ এবং স্থানীয় ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা সবকিছুকেই নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে।
অন্ধবিশ্বাসের সামাজিক মূল্য : যখন ধর্মীয় আবেগ যুক্তির ওপর প্রাধান্য পায়, তখন সমাজে প্রতারণার ক্ষেত্র তৈরি হয়। খান জাহান আলীর মতো একজন মহান সুফি সাধকের নাম ব্যবহার করে মানুষকে বিভ্রান্ত করা তাঁর আদর্শের অবমাননা।
ঐতিহ্য সংরক্ষণ বনাম জননিরাপত্তা : ঐতিহ্য অবশ্যই সংরক্ষণ করতে হবে। কিন্তু কোনো ঐতিহ্য মানুষের জীবন থেকে বড় নয়। প্রয়োজন হলে আধুনিক প্রযুক্তি, সুরক্ষা বেষ্টনী এবং বিজ্ঞানসম্মত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ঐতিহ্য রক্ষা করতে হবে।
প্রশাসনের করণীয় : ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বিচার বিভাগীয় তদন্ত, আর্থিক অনিয়মের নিরীক্ষা এবং মাজার ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
খাদেম চক্রের জবাবদিহি : যদি প্রমাণিত হয় যে মানত, তাবিজ কিংবা কুমিরকে ব্যবহার করে প্রতারণামূলক বাণিজ্য পরিচালিত হয়েছে, তবে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদের রাষ্ট্রীয় তত্ত্বাবধান : মাজার ও এর ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোকে আরও কার্যকরভাবে রাষ্ট্রীয় তত্ত্বাবধানে আনা প্রয়োজন, যাতে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থে ঐতিহ্য ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
বন্যপ্রাণীর অধিকারও গুরুত্বপূর্ণ : কুমির কোনো প্রদর্শনীর বস্তু নয়। এটি একটি বন্য প্রাণী। তাকে তার স্বাভাবিক পরিবেশে বাঁচতে দিতে হবে।
ইতিহাসকে ব্যবসার পণ্য বানানো যাবে না : যে ঐতিহ্য মানুষের আত্মিক ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার, তাকে অর্থ উপার্জনের যন্ত্রে পরিণত করা জাতির জন্য লজ্জাজনক।
খান জাহান আলীর প্রকৃত শিক্ষা : হজরত খান জাহান আলী (রহ.) মানুষের কল্যাণ, জনসেবা, সহনশীলতা, মানবিকতা ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার শিক্ষা দিয়ে গেছেন। তিনি দিঘি খনন করেছেন মানুষের পানির প্রয়োজন মেটাতে, রাস্তা নির্মাণ করেছেন যোগাযোগ সহজ করতে, মসজিদ গড়েছেন ইবাদত ও জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র হিসেবে।
তাঁর জীবনাদর্শ ছিল মানুষের সেবা, কখনোই মানুষের বিশ্বাসকে পুঁজি করে অর্থ উপার্জন নয়। তাই তাঁর মাজারকে ঘিরে যদি প্রতারণা, অন্ধবিশ্বাস ও বাণিজ্যের বিস্তার ঘটে, তবে তা তাঁর মহান আদর্শের সম্পূর্ণ বিপরীত। প্রকৃত শ্রদ্ধা হবে তাঁর শিক্ষা ও মানবকল্যাণের দর্শনকে ধারণ করা, কুসংস্কার ও প্রতারণার বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া।
শেষ কথা : ইতিহাসের প্রতি শ্রদ্ধা, প্রতারণার বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা : খান জাহান আলীর দিঘির কুমির কেবল একটি প্রাণী ছিল না; এটি ছিল বাংলার ইতিহাসের জীবন্ত স্মারক। কিন্তু সেই ঐতিহ্যকে ঘিরে যদি প্রতারণা, অর্থ লুটপাট এবং জননিরাপত্তার অবহেলা জন্ম নেয়, তবে তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্র ও সমাজকে একযোগে দাঁড়াতে হবে। ফাতেমার মৃত্যু যেন আরেকটি সংবাদ শিরোনাম হয়ে না থাকে; বরং এটি হোক অন্ধবিশ্বাস ও ‘মানত বাণিজ্য’র বিরুদ্ধে আমাদের সম্মিলিত জাগরণের সূচনা।
জুবাইয়া বিন্তে কবির
অর্থনীতিবিদ, গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট
