সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত সাতক্ষীরার আঙুর চাষ ও কৃষিতে রূপান্তরের গল্প
প্রকাশ : ১৪ জুন ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাঙালি চিরকালই কৃষিজীবী, তবে এই কৃষির চিরাচরিত রূপ এখন দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। ঐতিহ্যগত ফসলের গণ্ডি পেরিয়ে আমাদের দেশের উদ্যমী কৃষকরা এখন বিশ্ববাজারের উচ্চমূল্যের ও বিদেশি ফল চাষে অভাবনীয় সাফল্য দেখাচ্ছেন। সম্প্রতি সাতক্ষীরার কৃষি উদ্যোক্তা হেলাল উদ্দিনের আঙুর চাষে অভাবনীয় সাফল্য সেই পরিবর্তনেরই এক উজ্জ্বল এবং অনন্য দৃষ্টান্ত। পেশায় একজন সাধারণ ট্রাক ড্রাইভার হয়েও, মেধা, একাগ্রতা ও প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেছেন যে, প্রবল ইচ্ছাশক্তি থাকলে যেকোনো অসম্ভবকেই সম্ভব করা যায়। বাংলাদেশের মাটিতে মিষ্টি আঙুর ফলে না- এমন একটি দীর্ঘদিনের প্রচলিত ও প্রতিষ্ঠিত অন্ধবিশ্বাসকে তিনি বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দেশের কৃষিতে এক নতুন আশার আলো জ্বেলেছেন।
সাধারণত আমাদের মনে একটি ধারণা বদ্ধমূল ছিল যে, বাংলাদেশের আবহাওয়া এবং জলবায়ু আঙুর চাষের জন্য মোটেও উপযুক্ত নয়। অনেকেই মনে করতেন, এ দেশের মাটিতে আঙুর গাছ বড় হলেও তার ফল হবে টক এবং তা বাণিজ্যিক উপযোগী হবে না। কিন্তু হেলাল উদ্দিন এই ধারণাকে সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণ করেছেন। ইউটিউবের মতো আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির মুক্ত মাধ্যমকে কাজে লাগিয়ে মাত্র দুটি চারা দিয়ে যে শখের যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা আজ ১৫ কাঠা জমিতে বিস্তৃত এক বিশাল বাণিজ্যিক বাগানে রূপ নিয়েছে। আমেরিকা, রাশিয়া, চীন, ইউক্রেন ও ইতালির মতো বিশ্বের বিভিন্ন জলবায়ুর দেশের প্রায় ২০টি দুর্লভ প্রজাতির আঙুর এখন তার বাগানে ঝুলছে। সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে লাল, কালো, হলুদ ও সবুজ রঙের সুস্বাদু মিষ্টি আঙুরের এই সমারোহ শুধু সাতক্ষীরা জেলাকেই নয়, বরং সমগ্র দেশের কৃষি খাতকে এক ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। সাতক্ষীরার বাইপাস সড়কের এই আঙুর বাগান শুধু একটি সফল কৃষি প্রকল্প নয়, এটি বাংলাদেশের বেকার যুবসমাজের জন্য একটি দিকনির্দেশনা এবং স্বাবলম্বী হওয়ার অনন্য অনুপ্রেরণা। আমাদের দেশে চাকরির পেছনে ছুটে চলা যুবকদের জন্য হেলাল উদ্দিনের এই উদ্যোগ এক বিরাট শিক্ষা। কৃষিকে যে আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় অত্যন্ত লাভজনক একটি ব্যবসায় রূপান্তর করা যায়, তিনি তা হাতে-কলমে দেখিয়ে দিয়েছেন।
হেলাল উদ্দিনের এই অভাবনীয় রূপান্তরের পেছনে আরেকটি বড় শক্তি হিসেবে কাজ করেছে পারিবারিক সহযোগিতা। তার স্ত্রী আলেয়া বেগমের প্রাথমিক সংশয় কাটিয়ে যেভাবে তিনি স্বামীর পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন এবং বাগান পরিচর্যায় সার্বক্ষণিক শ্রম দিচ্ছেন, তা আমাদের গ্রামীণ অর্থনীতিতে নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণের এক চমৎকার চিত্র তুলে ধরে। যৌথ প্রয়াস এবং সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে যে একটি সফল উদ্যোগ গড়ে তোলা সম্ভব, এই দম্পতি তা প্রমাণ করে দেখিয়েছেন। আজ দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এই বাগান দেখতে ভিড় করছেন এবং অনেকে নিজেই আঙুর চাষে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন। এর ফলে স্থানীয় পর্যায়ে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে গতিশীলতা আনতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে।
এই সাফল্যের আলোকেই আমাদের ভবিষ্যৎ কৃষি নীতি নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। বাংলাদেশ প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে বিভিন্ন দেশ থেকে আঙুরসহ অন্যান্য ফল আমদানি করে। যদি সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক স্তরে হেলাল উদ্দিনের মতো প্রান্তিক ও সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, কারিগরি সহায়তা এবং সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করা যায়, তবে দেশীয় বাজারেই এই ফলের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। এতে যেমন বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে, তেমনি দেশের ভেতরের পুষ্টির চাহিদাও মেটানো সহজ হবে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরকে এখন মাঠ পর্যায়ে এই ধরনের সফল উদ্যোগগুলো নিয়ে গবেষণা করতে হবে এবং কীভাবে দেশের অন্যান্য অঞ্চলে এর বিস্তার করা যায়, তার রূপরেখা তৈরি করতে হবে। পরিশেষে বলা যায়, হেলাল উদ্দিনের এই আঙুর বাগান কোনো অলৌকিক ঘটনা নয়, বরং এটি সঠিক জ্ঞান, কঠোর পরিশ্রম ও অদম্য ইচ্ছাশক্তির ফসল। চিরাচরিত চাষাবাদের গণ্ডি থেকে বেরিয়ে এসে আমাদের দেশের কৃষকেরা যে বিশ্বমানের ফলন ফলাতে সক্ষম, তা আজ প্রমাণিত। সাতক্ষীরার এই মিষ্টি আঙুরের সুবাস ছড়িয়ে পড়ুক টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়ায়। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এবং সঠিক বাজারজাতকরণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে, আগামী দিনে বাংলাদেশ ফল উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করে রপ্তানির নতুন দিগন্তে পা রাখবে- এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
