ঢাকা সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬, ১ আষাঢ় ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার পথে নতুন বাজেট : সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ

ইকবাল মাসুদ
সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার পথে নতুন বাজেট : সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত দীর্ঘদিন ধরেই জনসংখ্যার তুলনায় সীমিত বিনিয়োগ, জনবল সংকট, অবকাঠামোগত দুর্বলতা এবং উচ্চ ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য ব্যয়ের মতো নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এ প্রেক্ষাপটে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে ৬৯ হাজার ৩০৯ কোটি টাকা বরাদ্দ একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। গত অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ছিল প্রায় ৩৪ হাজার ৭১৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে স্বাস্থ্যখাতের বরাদ্দ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে এবং দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো স্বাস্থ্যখাতের বরাদ্দ জিডিপির ১ শতাংশ অতিক্রম করে ১.১ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।

এটি শুধু একটি বাজেট বৃদ্ধি নয়, বরং জনগণের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সরকারের অগ্রাধিকার এবং রাজনৈতিক অঙ্গীকারের প্রতিফলন। তবে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো এই অর্থের কার্যকর, স্বচ্ছ এবং জনগণকেন্দ্রিক ব্যবহার নিশ্চিত করা।

এবারের বাজেটে ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য’ নীতির আলোকে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ২৭ হাজার ৬০০ কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এটি স্বাস্থ্যখাতের ইতিহাসে অন্যতম বড় উদ্যোগ। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী জেনারেল প্র্যাকটিশনার (জিপি) মডেলের আদলে প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে এবং শহরের প্রতিটি ওয়ার্ডে এক বা একাধিক প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট গড়ে তোলা হবে।

এসব কেন্দ্রে মা ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা, সাধারণ রোগের চিকিৎসা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, নারী ও প্রবীণবান্ধব সেবা, প্রতিবন্ধীবান্ধব স্বাস্থ্যসেবা এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহের ব্যবস্থা থাকবে। প্রশিক্ষিত হেলথ ওয়ার্কার নিয়োগ দেওয়া হবে। একইসঙ্গে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোকে শক্তিশালী করে ২৪ ঘণ্টা অ্যাম্বুলেন্স সেবা, ডিজিটাল রেফারেল ব্যবস্থা এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিশ্চিত করার পরিকল্পনা নেওয়া কথা বলা হয়েছে।

এছাড়া স্বাস্থ্য খাতে ডিজিটাল রূপান্তরের অংশ হিসেবে ই-হেলথ কার্ড চালুর উদ্যোগ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এর মাধ্যমে রোগীর চিকিৎসা ইতিহাস, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ওষুধ সংক্রান্ত তথ্য দেশের যেকোনো হাসপাতাল বা ক্লিনিকে ব্যবহার করা যাবে। এতে চিকিৎসার মান উন্নত হবে এবং অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও ব্যয় কমবে। সরকার নতুন করে প্রায় এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগেরও পরিকল্পনা করেছে, যার ৮০ শতাংশ নারী হওয়ার কথা বলা হয়েছে। এটি শুধু স্বাস্থ্যসেবার মান বৃদ্ধি করবে না, নারীর কর্মসংস্থানেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। কিন্তু সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা শুধু বাজেট ঘোষণায় সীমাবদ্ধ নয়। জনগণ চায় সরকারি হাসপাতালে গেলে চিকিৎসক পাওয়া যাবে, প্রয়োজনীয় ওষুধ পাওয়া যাবে, পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য দীর্ঘ লাইনে দাড়াতে হবে না এবং চিকিৎসার জন্য ব্যক্তিগতভাবে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হবে না।

বর্তমানে অনেক রোগী সরকারি হাসপাতালে গিয়ে ওষুধ না পেয়ে বাইরে থেকে কিনতে বাধ্য হন। অনেক হাসপাতালে আধুনিক যন্ত্রপাতি থাকলেও দক্ষ জনবল ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সেগুলো ব্যবহার করা যায় না। ফলে জনগণের প্রত্যাশা হলো নতুন বরাদ্দের সুফল যেন সরাসরি স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে প্রতিফলিত হয়। বিশেষ করে গ্রামীণ জনগোষ্ঠী আশা করছে ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত হলে রাজধানীমুখী রোগীর চাপ কমবে এবং স্থানীয় পর্যায়েই অধিকাংশ স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া যাবে। তবে প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো বাস্তবায়ন ও সুশাসন। বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ অর্থের অভাব নয়, বরং কার্যকর বাস্তবায়ন এবং সুশাসনের ঘাটতি।

অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, অনেক সময় স্বাস্থ্যখাতের বরাদ্দ পুরোপুরি ব্যয় করা সম্ভব হয় না। প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা, ক্রয় প্রক্রিয়ায় জটিলতা, সমন্বয়ের অভাব এবং কিছু ক্ষেত্রে দুর্নীতি ও অপচয়ের কারণে জনগণ প্রত্যাশিত সুফল থেকে বঞ্চিত হয়। এবারের বাজেট বাস্তবায়নে তাই কয়েকটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে-

* শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন নয় পাশাপাশি পর্যাপ্ত চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ।

* হাসপাতালভিত্তিক প্রয়োজন অনুযায়ী যন্ত্রপাতি সরবরাহ ও রক্ষণাবেক্ষণ।

* ওষুধ ও চিকিৎসা সামগ্রীর নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ।

* প্রকল্প বাস্তবায়নে সময়ানুবর্তিতা।

* স্বাস্থ্যখাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।

স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন শুধু ভবন নির্মাণের মাধ্যমে সম্ভব নয়; বরং দক্ষ মানবসম্পদ এবং কার্যকর ব্যবস্থাপনাই এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালীকরণ স্বাস্থ্য সুরক্ষার মূল ভিত্তি। বাংলাদেশে ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য ব্যয় বা আউট অফ পকেট এক্সপেন্ডিচার এখনও অত্যন্ত বেশি। চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে গিয়ে অনেক পরিবার অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে।

এই সমস্যা সমাধানের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো শক্তিশালী প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা গড়ে তোলা। কমিউনিটি ক্লিনিক, ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং জেলা হাসপাতালগুলোকে কার্যকর ও সমন্বয় করা গেলে রোগীরা প্রাথমিক পর্যায়েই চিকিৎসা পাবেন। বিশেষ করে কমিউনিটি ক্লিনিকের কার্যকারিতা পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন ও স্থানীয় পর্যায়ের স্বাস্থ্য সেবা ঢেলে সাজাতে হবে। এতে রোগ জটিল হওয়ার আগেই ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে এবং উচ্চ ব্যয়ের চিকিৎসার প্রয়োজন কমবে। সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা অর্জনের জন্য প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে কেন্দ্র করে একটি সমন্বিত রেফারেল ব্যবস্থা গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি।

অসংক্রামক রোগ, তামাক নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপদ খাদ্য। বর্তমানে বাংলাদেশে মৃত্যুর প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে হৃদরোগ, স্ট্রোক, ডায়াবেটিস, ক্যানসার এবং কিডনি রোগ। তাই স্বাস্থ্য বাজেটের বড় অংশ শুধু চিকিৎসা নয়, রোগ প্রতিরোধমূলক কর্মসূচিতে বিনিয়োগ করা প্রয়োজন। তামাক নিয়ন্ত্রণ এ ক্ষেত্রে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তামাক ব্যবহারের কারণে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক মানুষ অসুস্থ হচ্ছেন এবং স্বাস্থ্যখাতে বিশাল অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। কার্যকর কর বৃদ্ধি, শক্তিশালী আইন প্রয়োগ এবং তামাক শিল্পের প্রভাবমুক্ত নীতিনির্ধারণের মাধ্যমে তামাক নিয়ন্ত্রণকে আরও জোরদার করতে হবে।

একইসঙ্গে নিরাপদ খাদ্য ও পুষ্টি নিশ্চিত করা জরুরি। অতিরিক্ত লবণ, চিনি এবং ট্রান্স-ফ্যাটযুক্ত খাদ্যের ব্যবহার কমাতে প্যাকেটজাত খাদ্যে কার্যকর ফ্রন্ট-অব-প্যাক সতর্কতামূলক লেবেলিং চালু করা যেতে পারে। শিশু ও কিশোরদের জন্য অস্বাস্থ্যকর খাদ্যের বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণেও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এখনও তুলনামূলকভাবে অবহেলিত। উদ্বেগ, বিষণ্ণতা, আত্মহত্যা এবং মাদকাসক্তির সমস্যা দিন দিন বাড়ছে। তাই এবারের স্বাস্থ্য বাজেট বাস্তবায়নের সময় মানসিক স্বাস্থ্যকে মূলধারার স্বাস্থ্যসেবার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, প্রশিক্ষিত জনবল বৃদ্ধি, স্কুল ও কর্মক্ষেত্রভিত্তিক সচেতনতা কর্মসূচি এবং কমিউনিটি পর্যায়ে সহায়তা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। মাদকাসক্তি প্রতিরোধ, চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সেবার জন্যও পর্যাপ্ত বিনিয়োগ প্রয়োজন।

সরকারি-বেসরকারি সমন্বয় প্রয়োজন। বর্তমানে দেশের স্বাস্থ্যসেবার একটি বড় অংশ বেসরকারি খাতের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। তাই স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়নে সরকারি ও বেসরকারি খাতের মধ্যে কার্যকর অংশীদারিত্ব অপরিহার্য। পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) মডেলের মাধ্যমে টেলিমেডিসিন, ডায়াগনস্টিক সেবা, ক্যানসার চিকিৎসা, জরুরি চিকিৎসা এবং বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ করা সম্ভব। তবে এ ক্ষেত্রে মান নিয়ন্ত্রণ, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে পারলে সুফল পাওয়া যাবে।

সবশেষে বলা যায়, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের স্বাস্থ্য বাজেট বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য একটি ঐতিহাসিক সুযোগ সৃষ্টি করেছে। বরাদ্দ বৃদ্ধি, সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার উদ্যোগ, ই-হেলথ কার্ড, স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ, ওষুধ ও ভ্যাকসিন সরবরাহ এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করার পরিকল্পনা দেশের স্বাস্থ্যখাতকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে। তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে প্রয়োজন সুষম বণ্টন, দক্ষ বাস্তবায়ন, শক্তিশালী সুশাসন, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন, অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ, তামাক নিয়ন্ত্রণ, নিরাপদ খাদ্যব্যবস্থা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ এবং সরকারি-বেসরকারি সমন্বয়। জনগণের প্রত্যাশা পূরণে স্বাস্থ্যখাতকে শুধু ব্যয়ের খাত হিসেবে নয়, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও জাতীয় অগ্রগতির অন্যতম প্রধান বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। তাহলেই এবারের বাজেট সত্যিকার অর্থে একটি সুস্থ, সক্ষম ও মানবিক বাংলাদেশ গঠনের ভিত্তি স্থাপন করতে সক্ষম হবে।

ইকবাল মাসুদ

জনস্বাস্থ্য কর্মী

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত