বডি শেমিং সমাজের নীরব মানসিক নিপীড়ন

জান্নাতুল ফেরদৌস জেরিন

প্রকাশ : ১৭ জুন ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আমাদের আধুনিক সমাজ ক্রমাগত প্রযুক্তিনির্ভর ও তথ্যে পরিপূর্ণ হয়ে উঠলেও, মানুষের মানসিক সংবেদনশীলতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার ক্ষেত্রে এক গুরুতর ঘাটতি রয়ে গেছে, যার অন্যতম প্রকাশ হলো বডি শেমিং (Body Shaming) বা শারীরিক গঠন নিয়ে বিদ্রূপ এবং হয়রানি। এই মানসিক নিপীড়ন আপাতদৃষ্টিতে তুচ্ছ ঠাট্টা বা নিছক মন্তব্য হিসেবে বিবেচিত হলেও, এর শিকড় সমাজে অত্যন্ত গভীর এবং প্রভাব সুদূরপ্রসারী, যা শুধু ব্যক্তির আত্মবিশ্বাসকেই নয়, সামগ্রিকভাবে সমাজের মানবিক মূল্যবোধকেও ক্ষুণ্ণ করে। বডি শেমিং হলো কোনো ব্যক্তির শারীরিক চেহারা- তা সে ওজন, উচ্চতা, গায়ের রং, চুলের স্টাইল, পোশাক বা অন্য কোনো শারীরিক বৈশিষ্ট্যই হোক না কেন- তাকে কেন্দ্র করে নেতিবাচক মন্তব্য করা, উপহাস করা, বা অপমান করা।

এই ঘটনাটি কোনো নতুন বিষয় নয়, কিন্তু বর্তমান সময়ে সামাজিক মাধ্যম এবং মূলধারার মিডিয়ার ব্যাপক প্রসারের ফলে এর প্রকাশ এবং প্রভাব উভয়ই বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। মূলত দুটি প্রধান কারণ এই সমস্যাটিকে আরও জটিল করে তুলেছে: প্রথমত, মিডিয়ার মাধ্যমে তৈরি হওয়া ‘নিখুঁত শরীর’-এর অবাস্তব মানদণ্ড, এবং দ্বিতীয়ত, মানুষের মধ্যেকার সহানুভূতির অভাব ও অন্যের ব্যক্তিগত জীবনে নাক গলানোর প্রবণতা। গণমাধ্যম এবং বিশেষ করে বিজ্ঞাপন শিল্প যুগ যুগ ধরে একটি নির্দিষ্ট প্রকারের শারীরিক গঠনকেই ‘আদর্শ’ বা ‘কাম্য’ হিসেবে তুলে ধরেছে- যা হয়তো উচ্চতা, মেদহীনতা এবং ফর্সা ত্বকের উপর ভিত্তি করে তৈরি। এই অবাস্তব ও সংকীর্ণ মানদণ্ড সমাজের প্রতিটি স্তরে এমন একটি মনস্তত্ত্ব তৈরি করেছে যে, যারা এই ‘আদর্শ’-এর বাইরে, তারা যেন কোনোভাবে ত্রুটিপূর্ণ বা উপহাসের যোগ্য। এই অবাস্তব সৌন্দর্যের মানদণ্ডের কারণে, স্কুল থেকে শুরু করে কর্মক্ষেত্র, পরিবার এবং সামাজিক আড্ডায় শারীরিক গঠনের ভিন্নতা নিয়ে ক্রমাগত তিরস্কারের শিকার হতে হচ্ছে অসংখ্য মানুষ। স্কুলগামী শিশুরা প্রায়শই তাদের বন্ধু-বান্ধব বা এমনকি সিনিয়রদের কাছ থেকে ‘মোটা’, ‘হাতি’, ‘রোগা বাঁশ’, ‘খাটো’ ইত্যাদি নামে ডাকা হয়, যা তাদের শৈশবের মানসিক বিকাশে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে।

কৈশোরকালে যখন শরীর দ্রুত পরিবর্তিত হয় এবং আত্মপরিচয়ের সংকট চলে, তখন এই ধরনের মন্তব্য একটি কিশোর বা কিশোরীর মনে স্থায়ী নেতিবাচক ধারণা তৈরি করে। তারা নিজেদের সামাজিক পরিবেশে অনিরাপদ মনে করে, জনসম্মুখে আসতে ভয় পায় এবং তাদের মধ্যে তীব্র আত্মবিশ্বাসের অভাব দেখা দেয়। এর ফলে তারা সামাজিক কার্যকলাপ থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেয়, যা তাদের সামাজিক দক্ষতা বিকাশে বাধা দেয়। অন্যদিকে, প্রাপ্তবয়স্করাও এই হয়রানি থেকে মুক্ত নয়; কর্মক্ষেত্রে সহকর্মী বা বসদের কাছ থেকে ওজন বা চেহারা নিয়ে মন্তব্য শুনতে হয়, যা তাদের কর্মদক্ষতা এবং মানসিক সুস্থতাকে প্রভাবিত করে। সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিকটি হলো, অনেক সময় নিজের পরিবারের সদস্য বা ঘনিষ্ঠ আত্মীয়-স্বজনরাই স্নেহ বা উদ্বেগের আড়ালে এমন মন্তব্য করেন, যা শিকার হওয়া ব্যক্তির জন্য আরও বেশি আঘাতমূলক হয়। তাদের বক্তব্য থাকে- ’ তোমার ভালোর জন্যই বলছি, একটু ওজন কমাও’, বা ‘একটু মোটা হলে তো আর দেখতে ভালো লাগবে না’, এই ধরণের মন্তব্য ভালোবাসা নয়, বরং ক্ষতিকারক সমালোচনার ছদ্মবেশ।

বডি শেমিং-এর শিকার হওয়া ব্যক্তিদের ওপর এর মানসিক প্রভাব অত্যন্ত গুরুতর এবং বহুবিধ। মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, ক্রমাগত এই ধরনের হয়রানির ফলে শিকার ব্যক্তিরা দীর্ঘমেয়াদী মানসিক সমস্যার সম্মুখীন হন। এর মধ্যে অন্যতম হলো বিষণ্ণতা (Depression) এবং উদ্বেগ (Anxiety)। আত্মসম্মানবোধ এতটাই হ্রাস পায় যে তারা নিজেদের মূল্যহীন মনে করতে শুরু করে। আরও মারাত্মক সমস্যা হলো খাদ্যাভ্যাসজনিত রোগ (Eating Disorders) যেমন: অ্যানোরেক্সিয়া নার্ভোসা (Anorexia Nervosa) বা ভুল খাদ্যাভ্যাসের মাধ্যমে শরীরকে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা। অনেকে বিদ্রুপ এড়াতে অতিরিক্ত কঠোর ডায়েট শুরু করে, আবার অনেকে মানসিক চাপ সামলাতে অতিরিক্ত খাবার খাওয়া শুরু করে। এই মানসিক চাপ শেষ পর্যন্ত সামাজিক ফোবিয়া, আত্মণ্ডবিচ্ছিন্নতা এবং ক্ষেত্রবিশেষে আত্মহত্যার চিন্তাভাবনা পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারে। এই নেতিবাচক অভিজ্ঞতা জীবনভর একটি মানসিক বোঝা হিসেবে রয়ে যায়।

এছাড়াও, যখন কেউ তার শারীরিক গঠন নিয়ে লজ্জিত হন, তখন তিনি স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন থেকেও পিছিয়ে পড়েন। যেমন, কেউ হয়তো জিমে যেতে বা পার্কে হাঁটতে দ্বিধা বোধ করেন এই ভয়ে যে, অন্যেরা তার শারীরিক গঠন নিয়ে হাসাহাসি করবে। ফলে শারীরিক গঠন নিয়ে বিদ্রুপের চক্রটি শুধু মানসিক স্বাস্থ্যকেই নয়, ব্যক্তির সামগ্রিক জীবনযাপন এবং শারীরিক স্বাস্থ্যকেও সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করে। এই সামাজিক ব্যাধি মোকাবিলায় ব্যক্তিগত, প্রাতিষ্ঠানিক এবং সামাজিক স্তরে ব্যাপক সচেতনতা এবং উদ্যোগ গ্রহণ করা অপরিহার্য। প্রথমত, পরিবার হলো প্রতিরোধের প্রথম দুর্গ। বাবা-মা’কে অবশ্যই তাদের সন্তানদের মধ্যে শারীরিক বৈচিত্র্যকে সম্মান করার শিক্ষা দিতে হবে। সন্তানের শারীরিক গঠন নিয়ে কখনোই যেন নেতিবাচক মন্তব্য না আসে, সে বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে। তাদের শেখাতে হবে যে মানুষের মূল্য তার বাইরের চেহারাতে নয়, বরং তার চরিত্র, নৈতিকতা এবং কাজের মধ্যে নিহিত। দ্বিতীয়ত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা এখানে মুখ্য। স্কুল ও কলেজ কর্তৃপক্ষকে বুলিং এবং বডি শেমিং-এর বিরুদ্ধে কঠোর নীতি এবং ‘জিরো টলারেন্স’ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। পাঠ্যক্রমের মাধ্যমে মানসিক স্বাস্থ্য এবং শারীরিক বৈচিত্র্যের গুরুত্ব সম্পর্কে নিয়মিত আলোচনা ও কর্মশালার আয়োজন করা জরুরি। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে যাতে তারা এমন কোনো মন্তব্য না করেন যা শিক্ষার্থীদের মধ্যে শারীরিক হীনমন্যতা তৈরি করতে পারে। তৃতীয়ত, মিডিয়ার দায়বদ্ধতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিজ্ঞাপন এবং বিনোদনের মাধ্যমে শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট ধরনের শরীরকে ‘আদর্শ’ হিসেবে তুলে ধরা বন্ধ করতে হবে। বরং, সমাজের সব ধরনের শারীরিক বৈচিত্র্যকে স্বাভাবিক ও ইতিবাচকভাবে উপস্থাপন করতে হবে। মডেলিং এবং ফ্যাশন জগতে শারীরিক বৈচিত্র্যকে উৎসাহিত করতে হবে।

সর্বোপরি, প্রয়োজন একটি সাংস্কৃতিক পরিবর্তন- যেখানে শারীরিক গঠনের ভিন্নতাকে উপহাসের বিষয় না ভেবে তাকে মানব প্রকৃতির স্বাভাবিক অংশ হিসেবে গণ্য করা হবে। বডি শেমিং শুধুমাত্র একটি মন্তব্য নয়, এটি বৈষম্যের একটি গুরুতর রূপ, যা অন্যের মানসিক শান্তি এবং সুস্থ জীবনযাপনের অধিকার কেড়ে নেয়। আমাদের মনে রাখতে হবে, প্রতিটি মানুষের শরীরই তার নিজের এবং তার চেহারা নিয়ে মন্তব্য করার অধিকার অন্য কারও নেই। সহানুভূতি, সহমর্মিতা এবং অপরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধের মাধ্যমে আমরা এই বিষাক্ত সামাজিক প্রথা থেকে মুক্তি পেতে পারি। আসুন, আমরা এমন একটি সমাজ গড়ি যেখানে প্রতিটি ব্যক্তি তার শারীরিক গঠন যেমনই হোক না কেন, সে নিজেকে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবে এবং সম্মান লাভ করবে। এই সামাজিক নিপীড়ন বন্ধে প্রতিটি সচেতন নাগরিকের ব্যক্তিগত দায়িত্ব গ্রহণ করা আজ সময়ের দাবি।

জান্নাতুল ফেরদৌস জেরিন

শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়