বাস্তবভিত্তিক বাজেট বাঁচাবে বাংলাদেশ

আমানুর রহমান

প্রকাশ : ১৭ জুন ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

একটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক দিকনির্দেশনার চূড়ান্ত দলিল হলো জাতীয় বাজেট। বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানা পটপরিবর্তনের এই ক্রান্তিলগ্নে বাজেটের প্রতিটি সংখ্যা হয়ে ওঠে অর্থনীতির একেকটি রক্ষাকবচ। বাংলাদেশের জন্য ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ; কারণ, ঠিক এই সময়েই দেশটি স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের চূড়ান্ত ধাপে অবস্থান করছে। গত কয়েক বছরের বৈশ্বিক অস্থিরতা, ডলার সংকট ও আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির ফলে সামষ্টিক অর্থনীতিতে যে প্রবল চাপ সৃষ্টি হয়েছে, তা মোকাবিলা করে ৬ দশমিক ৫ থেকে ৭ শতাংশের টেকসই প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা মোটেও সহজসাধ্য নয়। প্রায় সাড়ে ৯ লাখ কোটি টাকার এই বিশাল বাজেটের সফল বাস্তবায়ন শুধু গতানুগতিক হিসাব-নিকাশ দিয়ে সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন অর্থনীতির নিখাদ ও প্রায়োগিক কৌশল। তাই এবারের বাজেট শুধু আয়-ব্যয়ের সাধারণ খতিয়ান নয়, বরং তা হওয়া উচিত অর্থনীতির কষ্টিপাথরে যাচাইকৃত এক সুনিপুণ পুনরুদ্ধারের রূপরেখা।

?সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের সবচেয়ে বড় সংকট এখন মূল্যস্ফীতি। এই মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরাই হবে বাজেটের সবচেয়ে বড় প্রায়োগিক পরীক্ষা। বিগত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯ থেকে ১০ শতাংশের বিপজ্জনক সীমানায় ঘুরপাক খাচ্ছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি তো মাঝে মাধেই দুই অঙ্কের ঘর স্পর্শ করে জনজীবনে নাভিশ্বাস তুলছে। এই উচ্চ মূল্যস্ফীতি দমনে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির সঙ্গে একটি কঠোর ও সুসংগত রাজস্বনীতির সমন্বয় অপরিহার্য। অর্থ সরবরাহ কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংক এরইমধ্যে নীতি সুদহার উল্লেখযোগ্য মাত্রায় উন্নীত করার যে উদ্যোগ নিয়েছে, বাজেটেও তার সুস্পষ্ট প্রতিফলন থাকা প্রয়োজন। পাশাপাশি, সরকারকে ব্যাংক খাত থেকে মাত্রাতিরিক্ত ঋণ গ্রহণ থেকে বিরত থাকতে হবে। সরকার অতিরিক্ত ঋণ নিলে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়, অর্থনীতিতে যা ‘ক্রাউডিং আউট ইফেক্ট’ নামে পরিচিত। ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সরকার যদি নিজস্ব আয় বৃদ্ধির মাধ্যমে বাজেট ঘাটতি যৌক্তিক সীমায় বেঁধে রাখতে পারে, তবেই রাজস্ব ও মুদ্রানীতির এই মেলবন্ধন জনমানুষের ক্রয়ক্ষমতা সুরক্ষায় সহায়ক হবে।

রাষ্ট্রের চালিকাশক্তি সচল রাখতে রাজস্ব সংগ্রহের পদ্ধতিটি আধুনিক ও যৌক্তিক নিয়মের অধীন হওয়া জরুরি। বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত ঐতিহাসিকভাবেই ৮ দশমিক ৫ থেকে ৯ শতাংশের আশপাশে আটকে আছে, যা উন্নয়নশীল দেশগুলোর গড় ১৫ শতাংশের তুলনায় অনেক পশ্চাৎপদ। পরোক্ষ কর বা ভ্যাটের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা মূলত সমাজের দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত মানুষের ওপর সবচেয়ে বেশি চাপ সৃষ্টি করে। বর্তমানে আমাদের মোট রাজস্ব আয়ের ৬০ শতাংশেরও বেশি আসে পরোক্ষ কর থেকে, যা স্পষ্টতই একটি বৈষম্যমূলক কাঠামো। তাই বাজেটে প্রত্যক্ষ কর বা আয়করের আওতা বাড়ানোর দিকে সর্বাধিক কৌশলগত গুরুত্ব দিতে হবে। স্বয়ংক্রিয়করণ বা অটোমেশনের মাধ্যমে কর ফাঁকির ছিদ্রপথগুলো রুদ্ধ করে নতুন করদাতাদের করজালে অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে রাজস্ব আদায়ের ভিত্তি সম্প্রসারণ করা এখন সময়ের অন্যতম দাবি। বিদেশি ঋণের মোহ ত্যাগ করে নিজস্ব রাজস্ব সক্ষমতা বৃদ্ধির এই কৌশল ব্যতীত দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা অর্জন অসম্ভব। বিশ্বায়নের এই যুগে কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি কতটা শক্তিশালী, তা অনেকাংশেই নির্ভর করে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ভারসাম্য রক্ষার দক্ষতার ওপর। বর্তমানে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ একটি স্থিতিশীল, তবে সতর্কতামূলক পর্যায়ে অবস্থান করছে। আমাদের রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৪ শতাংশই আসে শুধু তৈরি পোশাকশিল্প থেকে, যা ভবিষ্যতের জন্য চরম কাঠামোগত ঝুঁকির অশনিসংকেত। এলডিসি থেকে উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা হারালে রপ্তানি আয় ৮ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এই অভিঘাত সামলাতে ‘তুলনামূলক সুবিধা’ (কম্পারেটিভ অ্যাডভান্টেজ) তত্ত্বের আলোকে তথ্যপ্রযুক্তি, চামড়া, ওষুধ, হালকা প্রকৌশল ও কৃষিজাত পণ্য রপ্তানির ওপর বিশেষ প্রণোদনা ও নীতিসহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি, সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) বর্তমানে জিডিপির ১ শতাংশের নিচে রয়েছে, যা বাড়াতে ব্যবসায়ের পরিবেশ সহজতর করা অপরিহার্য। বৈধ পথে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স বাড়াতে হুন্ডির চেয়ে আকর্ষণীয় বিনিময় হার ও প্রণোদনা প্রদান করাও অত্যাবশ্যক। একইভাবে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে বিশাল বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ‘বিনিয়োগের বিপরীতে প্রাপ্তি’ (রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট) নীতি কঠোরভাবে প্রয়োগ করা বাঞ্ছনীয়। প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা ও দুর্নীতির কারণে প্রতিবছর ব্যয় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়, যা শেষ পর্যন্ত জনগণের কাঁধেই ঋণের বোঝা হিসেবে চাপে। তাই অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পগুলোতে বাজেট বরাদ্দ সম্পূর্ণ শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে হবে। শুধু সেসব মেগা প্রকল্পকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে, যেগুলো দ্রুততম সময়ে সম্পন্ন হয়ে সরাসরি দেশের জিডিপিতে দৃশ্যমান অবদান রাখবে এবং বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে।

দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি হলো মানবসম্পদ। অথচ ঐতিহাসিকভাবেই আমাদের বাজেটে এই খাতটি অবহেলিত।

জিডিপির অনুপাতে স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বরাদ্দ ১ শতাংশের নিচে এবং শিক্ষা খাতে তা মাত্র দেড় থেকে দুই শতাংশের ঘরে ঘুরপাক খাচ্ছে, যা ইউনেসকো নির্ধারিত আন্তর্জাতিক মানদণ্ড থেকে যোজন যোজন দূরে। আমাদের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আকার জিডিপির আড়াই শতাংশের কাছাকাছি হলেও এর বড় অংশই ব্যয় হয় সরকারি চাকরিজীবীদের পেনশন খাতে; ফলে তা প্রকৃত দরিদ্রদের খুব একটা কাজে আসে না। ২০৪০ সালের পর বাংলাদেশের ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা জনমিতিক লভ্যাংশের সুবিধা কমতে শুরু করবে। তাই সস্তা শ্রমিকের পরিবর্তে একটি দক্ষ, প্রযুক্তিজ্ঞানসম্পন্ন ও সুস্থ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে হলে এবারের বাজেটে স্বাস্থ্য, গবেষণা, কারিগরি শিক্ষা এবং প্রকৃত দরিদ্রদের জন্য সরাসরি নগদ সহায়তা খাতে বরাদ্দ বহুগুণ বৃদ্ধি করতে হবে। অর্থনীতির ‘হিউম্যান ক্যাপিটাল থিওরি’ স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে ভৌত অবকাঠামোর চেয়ে মানবসম্পদে বিনিয়োগের অর্থনৈতিক প্রাপ্তি বা রিটার্ন বহুগুণ বেশি। তাই ধীরগতির মেগা প্রকল্প থেকে সম্পদের বিজ্ঞানভিত্তিক পুনর্বণ্টন করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও গবেষণায় বরাদ্দ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় প্রকৃত দরিদ্রদের কাছে সহায়তা পৌঁছাতে এবং দুর্নীতি রোধে শতভাগ ডিজিটাল ডেটাবেজ ব্যবহার করা একটি অত্যন্ত জরুরি কৌশল। শুধু ইট-পাথরের কাঠামোগত উন্নয়নের বদলে মানুষের দক্ষতা, মেধা ও স্বাস্থ্যের পেছনে এই কৌশলগত বিনিয়োগই বাংলাদেশকে একটি উচ্চ আয়ের জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে রূপান্তরিত করার সুনিশ্চিত পথ।

আমানুর রহমান

প্রাবন্ধিক ও সমাজকর্মী