অর্জন, গর্জন আর বর্জনের সংসদে কী পাচ্ছে জাতি
আরিফুল ইসলাম রাফি
প্রকাশ : ২০ জুন ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কিছু সংসদ শুধু আইন প্রণয়নের প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, বরং একটি যুগের প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকে। তেমনই বর্তমান সংসদ শুধু একটি নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত আইনসভা নয়; এটি একটি অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাস্তবতার রাজনৈতিক রূপ, একটি দীর্ঘ সংকটের পর জনগণের প্রত্যাশার কেন্দ্রবিন্দু এবং একই সঙ্গে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাগার। তাই এই সংসদকে ঘিরে যে আলোচনা, তা আসন সংখ্যা, সরকার গঠন কিংবা বিরোধী দলের শক্তিমত্তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রশ্ন আরও গভীর, এই সংসদ কি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে নতুন পথে নিয়ে যেতে পারবে, নাকি পুরোনো অভ্যাস ও পুরোনো সংকটের ভেতরেই আটকে যাবে?
বর্তমান সংসদকে বুঝতে হলে প্রথমে আমাদের বুঝতে হবে এর জন্মের প্রেক্ষাপট। গত দুই দশকে বাংলাদেশের রাজনীতি ধীরে ধীরে এমন এক অবস্থায় পৌঁছেছিল, যেখানে নির্বাচন, সংসদ এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি মানুষের আস্থা প্রায় বিলীন হয়ে যায়। সংসদ ছিল, কিন্তু অনেকের কাছে তা বিতর্কের সংসদ নয়; অনুমোদনের সংসদ। বিরোধী দল ছিল, কিন্তু কার্যকর বিরোধিতার ক্ষেত্র সংকুচিত ছিল। আইন পাস হতো, বাজেট পাস হতো, নীতি নির্ধারিত হতো; কিন্তু জনগণের বড় একটি অংশ মনে করত, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে যে গভীর ও বহুমাত্রিক আলোচনা হওয়া উচিত, তা অনুপস্থিত। সেই বাস্তবতা ভেঙে এসেছে এই সংসদ। এ কারণেই এর প্রতি মানুষের প্রত্যাশা সাধারণ কোনো সংসদের চেয়ে অনেক বেশি। মানুষ এই সংসদে শুধু নতুন মুখ দেখতে চায়নি; তারা নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি দেখতে চেয়েছে। তারা চেয়েছে এমন একটি সংসদ, যেখানে সরকারকে প্রশ্ন করা যাবে, বিরোধী দলকে জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হবে, এবং জাতীয় সমস্যাগুলো নিয়ে প্রকৃত অর্থে বুদ্ধিবৃত্তিক ও নীতিগত লড়াই হবে।
এই সংসদের সবচেয়ে বড় অর্জন সম্ভবত এখানেই। দীর্ঘ সময় পর বাংলাদেশ এমন একটি সংসদ পেয়েছে, যেখানে বিরোধী দল শুধু আনুষ্ঠানিক নয়, বাস্তব রাজনৈতিক শক্তি হিসেবেও উপস্থিত। গণতন্ত্রের ইতিহাস বলে, শক্তিশালী সরকার যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয় শক্তিশালী বিরোধী দল। কারণ ক্ষমতা স্বভাবতই কেন্দ্রীভূত হতে চায়; আর বিরোধী দলের কাজ হলো সেই ক্ষমতার ওপর নজরদারি করা। বর্তমান সংসদে সেই সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সরকারের প্রতিটি সিদ্ধান্ত, প্রতিটি নীতি এবং প্রতিটি ব্যয়ের ওপর প্রশ্ন তোলার মতো একটি সাংগঠনিক শক্তি রয়েছে। এটি গণতন্ত্রের জন্য ইতিবাচক।
তবে শক্তিশালী বিরোধী দল থাকা আর কার্যকর বিরোধী দল হওয়া এক জিনিস নয়। এখানেই শুরু হয় দ্বিতীয় অধ্যায়। বিরোধী দলের একটি অংশ সংসদের ভেতরে যেমন সক্রিয়, তেমনি সংসদের বাইরে আন্দোলন-সংগ্রামের রাজনীতিকেও সমান গুরুত্ব দিচ্ছে। ফলে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে, বিরোধী রাজনীতির কেন্দ্র কি সংসদ, নাকি রাজপথ? যদি সংসদের ভেতরে সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে যুক্তির মাধ্যমে চ্যালেঞ্জ করার পরিবর্তে বারবার সংসদ বর্জন, ওয়াকআউট কিংবা আন্দোলনের হুমকি প্রধান কৌশলে পরিণত হয়, তাহলে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়বে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সংসদ বর্জনের একটি দীর্ঘ এবং দুঃখজনক ঐতিহ্য আছে। প্রায় সব বড় দলই কোনো না কোনো সময় এই কৌশল ব্যবহার করেছে। সংসদ বর্জন শেষ পর্যন্ত সরকারের চেয়ে সংসদেরই বেশি ক্ষতি করেছে। কারণ সংসদীয় গণতন্ত্রে বিরোধী দলের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো সংসদ কক্ষের মেঝে, সংসদ ভবনের বাইরের মিছিল নয়। জনগণ একজন প্রতিনিধিকে সংসদে পাঠায় বক্তৃতা দেওয়ার জন্য নয়; সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করার জন্য। সেই জায়গায় বর্তমান সংসদের অন্যতম বড় পরীক্ষা হচ্ছে, বিরোধী দল কি সংসদকে তাদের প্রধান রাজনৈতিক মঞ্চে পরিণত করতে পারবে?
তবে এই সংসদের বিশেষত্ব শুধু বিরোধী দলের শক্তিতে নয়। এর আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো এর সামাজিক বৈচিত্র্য। এখানে দীর্ঘদিন নির্যাতিত ও বঞ্চিত মানুষের প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। এখানে আছেন আন্দোলনের কর্মী, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, বিভিন্ন পেশাজীবী এবং অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব থেকে উঠে আসা তরুণেরা। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, যারা রাজপথে পরিবর্তনের দাবি তোলে, তারা ক্ষমতার কাঠামোয় প্রবেশ করার পর সেই পরিবর্তনের দর্শন হারিয়ে ফেলে। ফলে বর্তমান সংসদের সামনে আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো, অভ্যুত্থানের রাজনীতি কি রাষ্ট্র পরিচালনার দর্শনে রূপান্তরিত হতে পারবে? কারণ আন্দোলন এবং রাষ্ট্র পরিচালনা এক জিনিস নয়। আন্দোলনের ভাষা আবেগের, রাষ্ট্র পরিচালনার ভাষা বাস্তবতার। আন্দোলনে স্লোগান কাজ করে, রাষ্ট্র পরিচালনায় কাজ করে নীতি। আন্দোলনে শত্রু ও মিত্র স্পষ্ট থাকে, কিন্তু সংসদে আপস, সমঝোতা এবং সমন্বয় অপরিহার্য। যারা পরিবর্তনের দাবিতে রাজপথে ছিলেন, তারা সংসদে এসে যদি একই ভাষা, একই পদ্ধতি এবং একই রাজনৈতিক মানসিকতা বহন করেন, তাহলে পরিবর্তনের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেওয়া কঠিন হবে।
এই সংসদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বাজেট বিতর্ক। কারণ শেষ পর্যন্ত কোনো সংসদের প্রকৃত চরিত্র প্রকাশ পায় তার বাজেট আলোচনায়। বক্তৃতা, স্লোগান, রাজনৈতিক উত্তেজনা; সবকিছুর বাইরে একটি সংসদকে বিচার করতে হয় সে দেশের সম্পদ বণ্টন কীভাবে করছে, তার ভিত্তিতে। বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা অত্যন্ত জটিল। মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনকে কঠিন করে তুলেছে। মধ্যবিত্তের সঞ্চয় কমেছে।
নিম্নবিত্তের জীবনযুদ্ধ আরও কঠিন হয়েছে। তরুণদের কর্মসংস্থান একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ব্যাংক খাতে আস্থার সংকট রয়েছে। বিনিয়োগের গতি প্রত্যাশার তুলনায় কম। এই অবস্থায় জনগণ আশা করেছিল, সংসদ বাজেটকে কেন্দ্র করে একটি জাতীয় অর্থনৈতিক সংলাপের মঞ্চে পরিণত হবে। বাজেটে সবার প্রত্যাশার প্রতিফলন আংশিকভাবে হয়েছে। বাজেট নিয়ে সরকারের পরিকল্পনা, বিরোধী দলের সমালোচনা এবং বিকল্প প্রস্তাব, সবই এসেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই আলোচনা কতটা জনজীবনের বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত ছিল? সংসদের বাইরে একজন কৃষক জানতে চান তার উৎপাদন খরচ কমবে কি না। একজন চাকরিপ্রার্থী জানতে চান নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে কি না। একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী জানতে চান ঋণ পাওয়া সহজ হবে কি না। একজন শহুরে নাগরিক জানতে চান দ্রব্যমূল্যের চাপ কমবে কি না। বাজেট বিতর্কের সফলতা তখনই, যখন এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জনগণ স্পষ্টভাবে পায়।
দুঃখজনকভাবে আমাদের সংসদীয় সংস্কৃতিতে এখনও বাজেট নিয়ে অনেক আলোচনা রাজনৈতিক অবস্থানকেন্দ্রিক, কিন্তু তুলনামূলক কম আলোচনা হয় কার্যকারিতা নিয়ে। কত টাকা বরাদ্দ হলো, তার চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো সেই টাকা কতটা কার্যকরভাবে ব্যয় হবে। উন্নয়ন প্রকল্পের ঘোষণা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতা। এই জায়গায় বর্তমান সংসদের সামনে একটি বড় সুযোগ রয়েছে, বাজেটকে রাজনৈতিক বক্তব্যের বিষয় না বানিয়ে বাস্তব জবাবদিহির বিষয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।
তবে এই সংসদের সবচেয়ে বড় শক্তি এবং সবচেয়ে বড় দুর্বলতা একই জায়গায় লুকিয়ে আছে। শক্তি হলো এর বহুমাত্রিকতা। দুর্বলতা হলো এর অতিরিক্ত মেরুকরণ। এখানে বহু কণ্ঠস্বর আছে, কিন্তু সেই কণ্ঠস্বরগুলো কি একে অপরকে শুনতে প্রস্তুত? এখানে বিতর্ক আছে, কিন্তু সেই বিতর্ক কি সমাধানের দিকে এগোচ্ছে? এখানে রাজনৈতিক উত্তাপ আছে, কিন্তু সেই উত্তাপ কি রাষ্ট্র সংস্কারের শক্তিতে পরিণত হচ্ছে? গণতন্ত্রের ইতিহাস আমাদের শেখায়, একটি সংসদের গুণ বিচার করা হয় না কত জোরে সরকার কথা বলেছে কিংবা কত কঠোর ভাষায় বিরোধী দল সমালোচনা করেছে, তা দিয়ে। বিচার করা হয়, সংসদ কি রাষ্ট্রকে আরও জবাবদিহিমূলক করেছে? দুর্নীতি কমিয়েছে? বিচারব্যবস্থাকে শক্তিশালী করেছে? অর্থনীতিকে গতিশীল করেছে? নাগরিক স্বাধীনতাকে সুরক্ষিত করেছে? এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, মানুষের জীবনমান উন্নত করেছে? আজকের বাংলাদেশে এই প্রশ্নগুলোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ জনগণ রাজনৈতিক নাটক দেখতে চায় না; তারা ফলাফল দেখতে চায়।
তারা জানতে চায় তাদের সন্তানের চাকরি হবে কি না, বাজারে গেলে নিত্যপণ্যের দাম সামাল দিতে পারবে কি না, কৃষক তার ফসলের ন্যায্যমূল্য পাবে কি না, ব্যবসায়ী বিনিয়োগের নিরাপত্তা পাবে কি না, এবং রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তভাবে কাজ করবে কি না।
এই সংসদ এখনও তার যাত্রার মাঝপথে। তাই এর চূড়ান্ত রায় দেওয়ার সময় আসেনি। তবে এটুকু বলা যায়, বহু বছর পর বাংলাদেশ এমন একটি সংসদ পেয়েছে, যার সামনে একই সঙ্গে বিশাল সম্ভাবনা এবং বিশাল ঝুঁকি রয়েছে। যদি এই সংসদ শক্তিশালী বিরোধী দলকে জবাবদিহির শক্তিতে, অভ্যুত্থানের চেতনাকে সংস্কারের শক্তিতে এবং বৈচিত্র্যময় প্রতিনিধিত্বকে কার্যকর নীতিতে রূপান্তর করতে পারে, তাহলে এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে একটি মাইলফলক হয়ে উঠবে। আর যদি গর্জন বিতর্ককে গ্রাস করে, বর্জন অংশগ্রহণকে প্রতিস্থাপন করে এবং অর্জন শুধু প্রতীকে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে ইতিহাস এটিকে আরেকটি হারিয়ে যাওয়া সম্ভাবনা হিসেবেই স্মরণ করবে।
এই সংসদের সামনে তাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন সরকার বা বিরোধী দলের নয়; সবচেয়ে বড় প্রশ্ন জাতির। জনগণ তাদের প্রতিনিধিদের হাতে একটি বিরল সুযোগ তুলে দিয়েছে। সেই সুযোগ কি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্ম দেবে, নাকি পুরোনো সংঘাতের পুনরাবৃত্তি ঘটাবে; তার উত্তরই নির্ধারণ করবে, অর্জন, গর্জন আর বর্জনের এই সংসদ থেকে জাতি শেষ পর্যন্ত কী পেল।
আরিফুল ইসলাম রাফি
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
