দক্ষতার চেয়ে সার্টিফিকেটের মূল্য বেশি কেন
নাহিসা আক্তার ফাতেমা
প্রকাশ : ২১ জুন ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বর্তমান সময়ে আমরা এমন এক সমাজে বাস করছি, যেখানে একজন মানুষের যোগ্যতা যাচাইয়ের আগে তার হাতে থাকা সার্টিফিকেটের সংখ্যা গোনা হয়। কে কতটা দক্ষ, সৃজনশীল বা বাস্তব জীবনের সমস্যার সমাধান করতে সক্ষম এসবের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় তার সিজিপিএ, ট্রান্সক্রিপ্ট কিংবা বিভিন্ন কোর্সের সনদপত্র। যেন কয়েকটি কাগজই একজন মানুষের সমগ্র মেধা ও সক্ষমতার পরিচয় বহন করে।
ছোটবেলা থেকেই আমাদের শেখানো হয়, ভালো ফলাফলই সফলতার চাবিকাঠি। পরিবার, আত্মীয়স্বজন এমনকি সমাজও একজন শিক্ষার্থীর মূল্যায়ন করে তার নম্বরের ভিত্তিতে। পরীক্ষায় ভালো ফল করলে প্রশংসা মেলে, কিন্তু একজন মানুষ কতটা দক্ষ হয়ে উঠছে বা কতটা বাস্তবমুখী জ্ঞান অর্জন করছে, সে বিষয়ে খুব কমই আলোচনা হয়। ফলে শিক্ষা ধীরে ধীরে জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্র থেকে সরে গিয়ে নম্বরকেন্দ্রিক প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে এ বাস্তবতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অনেক শিক্ষার্থী শেখার আনন্দের জন্য নয়, বরং পরীক্ষায় ভালো ফল করার উদ্দেশ্যে পড়াশোনা করে। নতুন কিছু জানার আগ্রহের চেয়ে ‘সিজিপিএ কত হবে’- এই চিন্তাই বড় হয়ে ওঠে। কারণ চাকরির বাজারে প্রথম দিকের প্রশ্নগুলোর একটি হলো, ‘রেজাল্ট কেমন?’ তাই অনেকেই দক্ষতা উন্নয়নের চেয়ে ভালো সার্টিফিকেট অর্জনের দৌড়ে শামিল হয়। কিন্তু বাস্তব জীবন শুধু সার্টিফিকেট দিয়ে চলে না। একজন মানুষকে টিকে থাকতে হলে প্রয়োজন আত্মবিশ্বাস, যোগাযোগ দক্ষতা, নেতৃত্বগুণ, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতা। বইয়ের পাতায় অনেক প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়, কিন্তু বাস্তব জীবনের জটিল পরিস্থিতির সমাধান করতে হয় অভিজ্ঞতা, সৃজনশীলতা ও দক্ষতার মাধ্যমে।
প্রায়ই দেখা যায়, অনেকের একাডেমিক ফলাফল অসাধারণ হলেও কর্মক্ষেত্রে তারা নিজেদের দক্ষতার ঘাটতির কারণে পিছিয়ে পড়েন। আবার এমন অনেক মানুষ আছেন, যাদের ফলাফল হয়তো খুব উজ্জ্বল নয়, কিন্তু দক্ষতা, পরিশ্রম ও উদ্ভাবনী চিন্তার কারণে তারা কর্মজীবনে সফলতার শিখরে পৌঁছেছেন। কারণ বাস্তবতা নম্বর নয়, কাজের মাধ্যমে মানুষকে মূল্যায়ন করে।
তাহলে প্রশ্ন হলো, দক্ষতার চেয়ে সার্টিফিকেটের মূল্য এত বেশি কেন?
এর অন্যতম কারণ আমাদের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থা। এখানে একজন শিক্ষার্থীর মেধা যাচাই করা হয় কয়েক ঘণ্টার পরীক্ষার মাধ্যমে। একজন মানুষ কতটা চিন্তাশীল, কতটা উদ্ভাবনী কিংবা বাস্তব সমস্যার সমাধান করতে সক্ষম এসবের চেয়ে মুখস্থবিদ্যার মূল্য অনেক বেশি। ফলে শিক্ষার্থীরা ধীরে ধীরে পরীক্ষাকেন্দ্রিক মানসিকতার মধ্যে আবদ্ধ হয়ে পড়ে।
চাকরির বাজারও এই প্রবণতাকে আরও শক্তিশালী করেছে। একটি পদের জন্য যখন হাজার হাজার আবেদন জমা পড়ে, তখন নিয়োগদাতারা প্রাথমিক বাছাইয়ের ক্ষেত্রে সিজিপিএ বা সার্টিফিকেটকে সহজ সূচক হিসেবে ব্যবহার করেন। এতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হলেও অনেক প্রতিভাবান ও দক্ষ মানুষ সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন, যাদের বাস্তব দক্ষতা হয়তো কাগজে-কলমে প্রকাশ পায় না।
বর্তমানে আবার একটি নতুন প্রবণতা তৈরি হয়েছে, যাকে বলা যায় ‘সার্টিফিকেট কালচার’। অনেকেই এখন শেখার জন্য নয়, বরং সিভি সমৃদ্ধ করার জন্য বিভিন্ন কোর্সে অংশ নেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সার্টিফিকেট প্রদর্শন এক ধরনের অর্জনের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে জ্ঞান অর্জনের চেয়ে প্রমাণ প্রদর্শনের প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমরা ধীরে ধীরে এমন এক বাস্তবতার দিকে এগোচ্ছি, যেখানে মানুষ কী জানে তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, তার কাছে কী প্রমাণপত্র রয়েছে।
তবে সার্টিফিকেটের গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। একটি সার্টিফিকেট একজন মানুষের পরিশ্রম, অধ্যবসায় ও শিক্ষাজীবনের স্বীকৃতি বহন করে। এটি নতুন সুযোগের দ্বার খুলে দিতে পারে। কিন্তু শুধুমাত্র সার্টিফিকেট দিয়ে একজন মানুষের প্রকৃত যোগ্যতা বিচার করা কখনোই সম্ভব নয়।
একজন মানুষকে মূল্যায়ন করতে হলে তার দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, সৃজনশীলতা, দায়িত্ববোধ এবং শেখার আগ্রহকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ একটি ভালো সার্টিফিকেট হয়তো চাকরির সুযোগ এনে দিতে পারে, কিন্তু সেই অবস্থান ধরে রাখতে হলে শেষ পর্যন্ত দক্ষতারই প্রয়োজন হয়।
বর্তমান প্রজন্মের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সার্টিফিকেট ও দক্ষতার মধ্যে সঠিক ভারসাম্য তৈরি করা। শুধু সার্টিফিকেটের পেছনে ছুটলে চলবে না, আবার দক্ষতার অজুহাতে পড়াশোনাকেও অবহেলা করা যাবে না। প্রকৃত সফলতা তখনই আসে, যখন জ্ঞান ও দক্ষতা একসঙ্গে বিকশিত হয়।
শেষ পর্যন্ত, কাগজে লেখা কয়েকটি অর্জন হয়তো একজন মানুষের সাময়িক পরিচয় বহন করতে পারে; কিন্তু তাকে সত্যিকারের আলাদা করে তোলে তার কাজ, তার দক্ষতা এবং বাস্তব জীবনে নিজেকে প্রমাণ করার ক্ষমতা। সার্টিফিকেট দরজা খুলতে পারে, কিন্তু সেই দরজার ওপারে টিকে থাকার শক্তি দেয় শুধু দক্ষতাই।
নাহিসা আক্তার ফাতেমা
নৃবিজ্ঞান বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
