বাবা সন্তানের জীবনের অদৃশ্য মহীরুহ
জুবায়েদ মোস্তফা
প্রকাশ : ২২ জুন ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মানুষের জীবনে কিছু শব্দ আছে, যেগুলোর গভীরতা ভাষার সীমাকে অতিক্রম করে যায়। ‘বাবা’ তেমনই এক শব্দ। মাত্র দুটি অক্ষরের এই শব্দটির মধ্যে লুকিয়ে আছে এক অনন্ত মহাকাব্য, এক অমলিন ত্যাগগাথা এবং নিঃস্বার্থ ভালোবাসার এক অতল সমুদ্র। উচ্চারণে ক্ষুদ্র হলেও এর ব্যাপ্তি আকাশের মতো বিস্তৃত, সমুদ্রের মতো গভীর এবং পাহাড়ের মতো অটল।
একজন সন্তানের জীবনে বাবা শুধু একজন অভিভাবক নন, বরং তিনি আশ্রয়, আস্থা, নিরাপত্তা ও সাহসের অপর নাম। পৃথিবীর আলো দেখার পেছনে যেমন মায়ের অবদান অনস্বীকার্য, তেমনি বাবার অবদানও অনিবার্য ও অপরিমেয়।
একজন সন্তানের জন্ম থেকে শুরু করে তার প্রতিষ্ঠা লাভের প্রতিটি অধ্যায়ে বাবার নিঃশব্দ সংগ্রাম ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে। অথচ সেই সংগ্রামের সিংহভাগ গল্পই অপ্রকাশিত থেকে যায়। বাবার জীবনের অভিধানে নিজের জন্য খুব বেশি কিছু থাকে না। সেখানে সন্তানের চাওয়া-পাওয়া, স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎই সবচেয়ে বেশি জায়গা দখল করে থাকে। সন্তানের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য তিনি নিজের অগণিত ইচ্ছা বিসর্জন দেন। নিজের ক্লান্তি, কষ্ট কিংবা অভাবকে আড়াল করে সন্তানের জন্য রচনা করেন সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত। পৃথিবীর প্রতিটি বাবাই যেন এক নীরব যোদ্ধা, যিনি নিজের সুখকে নির্বাসনে পাঠিয়ে সন্তানের সুখের জন্য আমৃত্যু যুদ্ধ করে যান। বাবার ভালোবাসা অনেক সময় উচ্চারিত হয় না, প্রকাশিত হয় না কবিতার পঙ্?ক্তিতে কিংবা আবেগঘন বাক্যে। কিন্তু দিনের শেষে ঘামে ভেজা শরীর, ক্লান্ত চোখ, জীর্ণ পোশাক এবং মুখের সেই প্রশান্ত হাসি বলে দেয়, ভালোবাসার সবচেয়ে নির্মল রূপটির নাম বাবা। তিনি কখনো সন্তানের সামনে নিজের দুর্বলতা প্রকাশ করেন না। কারণ তিনি জানেন, সন্তানের কাছে তিনিই সবচেয়ে বড় সাহস ও শক্তির প্রতীক। প্রতিটি সন্তানের জন্য বাবা সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে প্রাপ্ত এক অমূল্য আশীর্বাদ। তিনি বটবৃক্ষের মতো মাথার উপর ছায়া হয়ে থাকেন। জীবনের প্রখর রোদ, দুঃসময়ের ঝড় কিংবা হতাশার অন্ধকার থেকে সন্তানকে রক্ষা করার জন্য তিনি সর্বদা প্রস্তুত থাকেন। সন্তানের নিরাপত্তার জন্য নিজের সমস্ত স্বস্তি ত্যাগ করতে তার এক মুহূর্তও দ্বিধা হয় না।
আমরা প্রায়ই বাবাকে পাহাড়, সমুদ্র কিংবা আকাশের সঙ্গে তুলনা করি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বাবা সর্বদা তুলনার ঊর্ধ্বে। পৃথিবীর কোনো উপমাই বাবার মহত্ত্বকে সম্পূর্ণভাবে ধারণ করতে পারে না। কারণ বাবার হৃদয়ের গভীরতা পরিমাপ করার মতো কোনো যন্ত্র আজও আবিষ্কৃত হয়নি। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মানবসভ্যতাকে বিস্ময়কর উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে, কিন্তু একজন বাবার আত্মত্যাগের পরিমাণ কিংবা তাঁর হৃদয়ের বিশালতা পরিমাপের সক্ষমতা এখনো অর্জন করতে পারেনি।প্রাচীন একটি প্রবাদ আছে- ‘একজন আদর্শ বাবা একশত শিক্ষকের সমান।’ কথাটি নিছক অলঙ্কার নয়, বরং বাস্তবতার নির্মম সত্য। একটি শিশু যখন পৃথিবীতে আসে, তখন তার ভালো-মন্দ বোঝার ক্ষমতা থাকে না। ধীরে ধীরে বাবা তাকে জীবনবোধ শেখান, শৃঙ্খলা শেখান, দায়িত্ববোধ শেখান এবং মানুষ হওয়ার শিক্ষা দেন। বাবার শিক্ষা শুধু বিদ্যালয়ের পাঠ্যবইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে পথপ্রদর্শক হয়ে থাকে।সময়ের প্রবাহে মানুষ বদলে যায়। পরিবর্তিত হয় সম্পর্কের রং, আবেগের তীব্রতা এবং ভালোবাসার সংজ্ঞা। কিন্তু বাবার ভালোবাসা এক বিরল ব্যতিক্রম। সময়, দূরত্ব কিংবা পরিস্থিতি কোনো কিছুই সেই ভালোবাসাকে ম্লান করতে পারে না। সন্তান যত বড়ই হোক না কেন, বাবার চোখে সে সবসময় ছোট্ট শিশুই থেকে যায়। আর এই অনুভূতিই পৃথিবীর সবচেয়ে বিশুদ্ধ অনুভূতিগুলোর একটি।অনেকে পৃথিবীকে যুদ্ধক্ষেত্রের সঙ্গে তুলনা করেন। এখানে প্রতিনিয়ত টিকে থাকার সংগ্রাম চলছে। সবাই জয়ী হতে চায়, সফল হতে চায়, অন্যদের ছাড়িয়ে যেতে চায়। কিন্তু এই প্রতিযোগিতাময় পৃথিবীতে একজন মানুষ আছেন, যিনি নিজের পরাজয়েই আনন্দ খুঁজে পান। তিনি হলেন বাবা।
একজন বাবা সবসময় চান তাঁর সন্তান তাকে ছাড়িয়ে যাক, তার চেয়ে বড় হোক, তার চেয়ে বেশি সফল হোক। সন্তানের সাফল্যে তিনি নিজের অপূর্ণ স্বপ্নের বাস্তবায়ন দেখতে পান। সন্তানের অর্জনই তার গর্ব, সন্তানের বিজয়ই তার বিজয়। তাই সন্তানের কাছে হেরে গিয়েও একজন বাবা প্রকৃত বিজয়ীর হাসি হাসতে পারেন। পৃথিবীর আর কোনো সম্পর্ক এতটা নিঃস্বার্থ নয়। দুঃখজনক হলেও সত্য, আধুনিকতার অগ্রযাত্রায় আমরা অনেক সময় মানবিকতার মৌলিক মূল্যবোধগুলো হারিয়ে ফেলছি। জীবনের ব্যস্ততা, কর্মব্যস্ত নগরসভ্যতা এবং আত্মকেন্দ্রিক মানসিকতার কারণে অনেক সন্তানই বৃদ্ধ বাবার পাশে দাঁড়ানোর সময়টুকু খুঁজে পায় না। যারা একদিন সন্তানের জন্য জীবনভর সংগ্রাম করেছেন, তাদের অনেককেই শেষ বয়সে ঠাঁই নিতে হয় বৃদ্ধাশ্রমে। এটি শুধু একটি সামাজিক ব্যর্থতা নয়; এটি মানবতারও পরাজয়।
যে বাবা সন্তানের হাত ধরে হাঁটতে শিখিয়েছেন, সেই বাবাকে বৃদ্ধ বয়সে একাকীত্বের কাছে সমর্পণ করা কোনো সভ্য সমাজের পরিচয় হতে পারে না। পৃথিবী তখনই সত্যিকার অর্থে সুন্দর হয়ে উঠবে, যখন কোনো বাবার শেষ আশ্রয় হবে না বৃদ্ধাশ্রম; যখন প্রতিটি পরিবার তাদের বয়োজ্যেষ্ঠদের ভালোবাসা, সম্মান ও যত্ন দিয়ে আগলে রাখবে, যখন অভিধানের পাতায় ‘বৃদ্ধাশ্রম’ শব্দটি থাকলেও বাস্তব জীবনে তার প্রয়োজনীয়তা থাকবে না।বাবা জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে উপস্থিত এক নীরব আশীর্বাদ। তার ছায়ায় বেড়ে ওঠে স্বপ্ন, তার ত্যাগে নির্মিত হয় ভবিষ্যৎ, তার দোয়ায় আলোকিত হয় সন্তানের পথচলা।
জুবায়েদ মোস্তফা
কবি, লেখক ও প্রাবন্ধিক
