বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া সম্পর্কের নতুন দিগন্ত
জুবাইয়া বিনতে কবির, অর্থনীতিবিদ, গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট
প্রকাশ : ২৪ জুন ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার সম্পর্ক দীর্ঘদিনের আস্থা, বন্ধুত্ব ও পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। সাম্প্রতিক উচ্চপর্যায়ের সফর দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন মাত্রা দিয়েছে। কূটনৈতিক সৌজন্যের গণ্ডি পেরিয়ে এই সফর অর্থনীতি, শ্রমবাজার, বাণিজ্য ও আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে।
কোনো সরকার প্রধানের প্রথম বিদেশ সফর সব সময়ই বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। এটি কেবল কূটনৈতিক বার্তাই নয়, ভবিষ্যৎ পররাষ্ট্রনীতির দিকনির্দেশনাও বহন করে। মালয়েশিয়াকে প্রথম গন্তব্য হিসেবে বেছে নেওয়া দুই দেশের ঐতিহাসিক সম্পর্কের গুরুত্বকেই প্রতিফলিত করে। বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া সম্পর্ক নতুন নয়। স্বাধীনতার পর থেকেই দুই দেশের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। অতীতের বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের সফর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ভিত্তিকে আরও সুদৃঢ় করেছে। বর্তমান সফর সেই ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতারই একটি নতুন সংযোজন। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার দীর্ঘদিন ধরে লাখো বাংলাদেশির জীবিকার অন্যতম উৎস। নানা কারণে শ্রমবাজারে স্থবিরতা সৃষ্টি হলেও সাম্প্রতিক আলোচনা নতুন আশার সঞ্চার করেছে। বৈধ ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় কর্মী পাঠানোর উদ্যোগ প্রবাসীদের জন্য আশাব্যঞ্জক বার্তা বহন করছে।
বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিরা দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। মালয়েশিয়ায় নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হলে রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি পাবে, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করতে সহায়ক হবে। অভিবাসন ব্যয় কমানো এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করা এখন সময়ের দাবি। শ্রমিক নিয়োগে স্বচ্ছতা নিশ্চিত হলে সাধারণ মানুষ কম খরচে বিদেশে যাওয়ার সুযোগ পাবে এবং মানবপাচার কমে আসবে। দুই দেশের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) বাস্তবায়িত হলে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে নতুন গতি আসবে। শুল্ক সুবিধা বৃদ্ধি পেলে বাংলাদেশের রপ্তানি খাত নতুন বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ পাবে।
মালয়েশিয়ার জন্য বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদার। একইভাবে মালয়েশিয়া বাংলাদেশের অন্যতম বড় বিনিয়োগকারী ও শ্রমবাজার। ফলে পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে সম্পর্ক আরও গভীর হওয়ার সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশের অবকাঠামো, জ্বালানি ও প্রযুক্তি খাতে মালয়েশিয়ার বিনিয়োগ বাড়লে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হবে। বিদেশি বিনিয়োগ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে আরও ত্বরান্বিত করতে পারে। বিশ্ব অর্থনীতির নতুন চালিকাশক্তি ডিজিটাল খাত। সেমিকন্ডাক্টর, স্মার্ট ম্যানুফ্যাকচারিং ও ডিজিটাল অবকাঠামোয় সহযোগিতা বাংলাদেশকে প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির পথে এগিয়ে নিতে সহায়তা করবে।
বিশ্বব্যাপী হালাল শিল্পের বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে মালয়েশিয়ার অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তিগত সহায়তা বাংলাদেশের জন্য নতুন রপ্তানি সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে। এলএনজি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও সমুদ্রসম্পদ অনুসন্ধানে সহযোগিতা জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। মালয়েশিয়ায় অধ্যয়নরত হাজারো বাংলাদেশি শিক্ষার্থী দুই দেশের মধ্যে জ্ঞান ও সংস্কৃতির সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করছে। যৌথ গবেষণা ও কারিগরি শিক্ষায় সহযোগিতা দক্ষ মানবসম্পদ গঠনে সহায়ক হবে। পর্যটন এবং সাংস্কৃতিক বিনিময় দুই দেশের জনগণের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া বৃদ্ধি করবে। এর মাধ্যমে সম্পর্ক আরও মানবিক ও গভীর হবে। সামরিক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা এবং শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে সমন্বয় দুই দেশের নিরাপত্তা সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করবে।
বর্তমান বিশ্বে আন্তঃদেশীয় অপরাধ মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ অপরিহার্য। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার সহযোগিতা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মালয়েশিয়ার সমর্থন বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করবে। জাতিসংঘ, ওআইসি এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক ফোরামে সমন্বিত অবস্থান দুই দেশের বৈশ্বিক প্রভাব বৃদ্ধি করতে সহায়ক হতে পারে। বর্তমান বিশ্বে কূটনীতির কেন্দ্রবিন্দু অর্থনীতি। বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি সহযোগিতাকে অগ্রাধিকার দিয়ে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া নতুন ধরনের অর্থনৈতিক কূটনীতির উদাহরণ সৃষ্টি করতে পারে।
পরিশেষে, বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার সম্পর্ক এখন শুধু বন্ধুত্বের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি ধীরে ধীরে একটি কৌশলগত অংশীদারত্বে রূপ নিচ্ছে। সঠিক পরিকল্পনা, কার্যকর বাস্তবায়ন এবং পারস্পরিক আস্থার ভিত্তিতে এই সম্পর্ক আগামী দিনে দুই দেশের জনগণের জন্য সমৃদ্ধি, স্থিতিশীলতা ও নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে পারে। মালয়েশিয়া সফর তাই নিছক একটি কূটনৈতিক সফর নয়; এটি হতে পারে দুই ভ্রাতৃপ্রতিম দেশের সম্পর্কের ইতিহাসে এক নতুন সোনালি অধ্যায়ের সূচনা।
