বিলুপ্তির পথে সদাচরণ
আমানুর রহমান, শিক্ষার্থী, হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজ
প্রকাশ : ২৪ জুন ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
সভ্যতার ইতিহাসে মানুষের অগ্রগতি তার উদ্ভাবন দিয়ে মাপা হলেও পতন ত্বরান্বিত হয় মূল্যবোধের অবক্ষয়ে। আজকের এই দ্রুতগতির বিশ্বে প্রযুক্তি ও অবকাঠামোগত দিক দিয়ে আমরা অনেক এগিয়েছি ঠিকই; কিন্তু মৌলিক সামাজিক মূল্যবোধ বা সদাচরণের চর্চা দিন দিন একেবারে তলানিতে গিয়ে ঠেকছে। এর মূলে রয়েছে আমাদের আধুনিক জীবনযাত্রার যান্ত্রিকতা। অবিরাম ছুটে চলার এই ইঁদুরদৌড়ে আমরা পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার মানসিকতাটুকুও হারিয়ে ফেলছি।
ফলে আজ ‘সদাচরণ’ শুধু একটি বিলুপ্তপ্রায় শব্দই নয়, এটি যেন সমাজ থেকে হারিয়ে যাওয়া বিরল প্রজাতির কোনো পাখি।
ভার্চুয়াল জগতের আগ্রাসন আমাদের বাস্তব জীবনের সহমর্মিতাকে ক্রমশ গ্রাস করছে, যার সবচেয়ে করুণ শিকার আজকের তরুণ প্রজন্ম।
কিবোর্ডের আড়াল থেকে করা অশালীন আচরণ ও ট্রোলিং সাধারণ ভদ্রতার সব সীমানা ভেঙে দিয়েছে। ইউনেসকোর এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, বিশ্বব্যাপী প্রায় ৩০ শতাংশ শিক্ষার্থী অনলাইনে সাইবার বুলিং বা নির্যাতনের শিকার। এটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সহানুভূতির ভয়াবহ সংকটেরই প্রমাণ। সম্মান প্রদর্শনের বদলে আক্রমণাত্মক শব্দচয়ন যখন বিনোদনের অংশ হয়ে দাঁড়ায়, তখন সমাজের নৈতিক ভিত্তি নড়বড়ে হতে বাধ্য।
ইন্টারনেটের কল্যাণে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের মানুষের সঙ্গে আমরা যুক্ত হতে পারি ঠিকই; কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এই অদৃশ্য সংযোগের ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের মৌলিক মানবিকতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ। অন্যকে হেয় করার এই অসুস্থ প্রতিযোগিতা আমাদের প্রাত্যহিক জীবন থেকে শিষ্টাচারকে দ্রুত নির্বাসনে পাঠাচ্ছে।
ক্রমবর্ধমান নগরায়ণ, তীব্র প্রতিযোগিতা এবং জীবনযাত্রার লাগামহীন চাপ মানুষের ধৈর্য ও সহনশীলতাকে প্রায় নিঃশেষ করে দিচ্ছে। প্রতিদিনের যানজট, কর্মস্থলের অনিশ্চয়তা এবং অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে মানুষের মানসিক চাপ এখন যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি। বিভিন্ন বেসরকারি সমীক্ষা ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশের বড় শহরগুলোর রাস্তায় বা গণপরিবহনে সামান্য কথা-কাটাকাটি থেকে প্রায়ই সহিংস ও অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটছে। মানসিক অস্থিরতার কারণে মানুষের আচরণে সব সময় একধরনের আক্রমণাত্মক ভঙ্গি লক্ষ করা যায়। ফলে একটি ছোট্ট ‘ধন্যবাদ’ বা ‘দুঃখিত’ বলার মতো সাধারণ ভদ্রতাটুকুও অনেকের কাছে অপ্রয়োজনীয় বা দুর্বলতা বলে মনে হয়। আগে গণপরিবহনে বয়স্ক বা অসুস্থ কাউকে দেখলে তরুণরা যেখানে স্বেচ্ছায় বসার জায়গা ছেড়ে দিত, আজ সেখানে কানে হেডফোন গুঁজে নির্লিপ্ত থাকার দৃশ্যই বেশি চোখে পড়ে।
মানুষের মধ্যকার হৃদ্যতার এই শূন্যস্থান আমাদের প্রতিনিয়ত স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে যে, বস্তুগত দিক দিয়ে আমরা যতটা এগোচ্ছি, মানবিক মূল্যবোধের দিক থেকে ঠিক ততটাই পিছিয়ে পড়ছি।
শৈশবের যে আঙিনায় একসময় বড়দের সম্মান ও ছোটদের স্নেহের গল্প শোনানো হতো, আজ সেখানে শুধুই পরীক্ষার নম্বর ও ক্যারিয়ারের চাপ। অভিভাবকেরা সন্তানদের কোচিংয়ে পাঠাতে যতটা আগ্রহী, পারিবারিক শিষ্টাচার বা প্রতিবেশীর সঙ্গে সুন্দর করে কথা বলা শেখাতে ততটা নন। অন্যদিকে, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাও এখন অনেকাংশে পরীক্ষাকেন্দ্রিক ও গ্রেডনির্ভর হয়ে পড়েছে। সেখানে নৈতিকতা শেখানোর চেয়ে যেকোনো মূল্যে পরীক্ষায় ভালো ফলাফল অর্জনকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। যখন কোনো শিশুর সাফল্য শুধু তার নম্বরপত্র দিয়ে পরিমাপ করা হয় এবং তার আচরণের কোনো দৃশ্যমান মূল্যায়ন থাকে না, তখন তার বড় হয়ে একজন যান্ত্রিক ও অনুভূতিহীন মানুষে পরিণত হওয়াই স্বাভাবিক। ফলস্বরূপ, আমরা এমন এক প্রজন্ম তৈরি করছি, যারা প্রযুক্তির ভাষায় দারুণ পারদর্শী হলেও মানবিকতার ব্যাকরণে চরমভাবে ব্যর্থ।
সদাচরণ বা ভালো ব্যবহার কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়, বরং এটি একটি সুস্থ, নিরাপদ ও বাসযোগ্য সমাজের মূল ভিত্তি। উন্নত ও সুখী দেশগুলোর দিকে তাকালে আমরা সামাজিক সম্প্রীতির এক ভিন্ন চিত্র দেখতে পাই। প্রতিবছর প্রকাশিত ‘ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্ট’ বা বিশ্ব সুখ সূচকে শীর্ষে থাকা দেশগুলোর নাগরিকদের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস, সম্মান ও সামাজিক সৌজন্যবোধের হার সবচেয়ে বেশি। এ থেকেই প্রমাণিত হয়, শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়ন দিয়ে একটি সমাজের প্রকৃত শান্তি নিশ্চিত করা সম্ভব নয়; এর জন্য মানুষের প্রতি মানুষের নিঃস্বার্থ সম্মানবোধ একান্ত প্রয়োজন। সদাচরণ বিলুপ্তির এই নীরব মহামারি থেকে সমাজকে রক্ষা করতে হলে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রকে একযোগে কাজ করতে হবে। কারণ, একটি সুন্দর হাসি আর সামান্য বিনয়ী আচরণই পারে আমাদের এই যান্ত্রিক পৃথিবীকে পুনরায় মানবিক ধরণিতে রূপান্তর করতে।
