জীবন যখন স্থায়ী নয়, তখনও ভেসে আসে আশা

মমতাজ উদ্দিন আহমদ, সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব, বান্দরবান পার্বত্য জেলা

প্রকাশ : ২৬ জুন ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

জীবনের শেষ নিয়ে ভাবছেন রবীন্দ্রনাথ; কিন্তু চোখে জল নয়, হাতে একটি জ্বলন্ত মশাল। মৃত্যু এখানে অন্ধ ফাঁদ নয়- এটা জীবনের স্বাদকে ঘন করে তোলে। মানুষ চলে যাবে, ফুলের মালা ঝরে পড়বে, গান থামবে একসময়। আর প্রেম? সেও মিলিয়ে যাবে স্মৃতির ধোঁয়ায়। অথচ এই হারিয়ে যাওয়া জীবনকে ফাঁকা করে না। উল্টে, যা ক্ষণভঙ্গুর, তাই-ই সবচেয়ে ছোঁয়ার মতো মূল্যবান, তীব্র, মিষ্টি, আকুল।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ক্ষণিকা কাব্যগ্রন্থের ‘শেষ’ কবিতাটি জীবনের অনিত্যতাকে শোকের অন্ধকারে নয়, আনন্দের দীপ্তিতে দেখার এক অপূর্ব জীবনদর্শন। এখানে মৃত্যু কোনো ভীতিকর পরিসমাপ্তি নয়; বরং জীবনের রসকে গভীরতর করে তোলার এক অনিবার্য সত্য। কবি জানেন, মানুষ থাকবে না, মালা শুকিয়ে যাবে, গান থেমে যাবে, প্রেমের মুহূর্তও একদিন স্মৃতির কুয়াশায় মিলিয়ে যাবে। তবু এই বিলুপ্তিই জীবনকে অর্থহীন করে না; বরং ক্ষণস্থায়ীত্বই জীবনকে করে তোলে জরুরি, মধুর, আকুল ও মূল্যবান।

রবীন্দ্রনাথের ‘শেষ’ কবিতার ‘থাকব না ভাই, থাকব না কেউ- থাকবে না ভাই কিছু’- এই উচ্চারণ প্রথমে যেন শূন্যতার কথা বলে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের কাব্যে শূন্যতা কখনও নিছক নৈরাশ্য নয়। শূন্যতা মনে হয় প্রথমে শুধু ফাঁকা কথা বলছে। অথচ রবীন্দ্রনাথের কবিতায় এটি কখনও নিছক হতাশা নয়। আসলে এই অভাবের মধ্যেই লুকিয়ে আছে উপস্থিতির সবচেয়ে গাঢ় আনন্দ। ফুল যে ঝরে যাবে, তাকেই তো তাড়াতাড়ি তুলে নিতে হয়। সুখ যে চলে যাবে, তাকেই ভালোবেসে ধরে রাখতে হয়। জীবন যে ক্ষণভঙ্গুর, তাকেই তো পুরোপুরি জীয়ে ওঠা দরকার। এ জানা তাই বিষ নয়, বরং অমৃতের মতো কাজ করে। মৃত্যু এখানে জীবনের শত্রু নয়, বরং তাকে আরও তীব্র করে তোলে।

এই কবিতার প্রধান শিক্ষা- জীবনকে দৈর্ঘ্যে নয়, গভীরতায় মাপতে হয়। ‘অধিক দিন তো বইতে হয় না শুধু একটি প্রাণ’- এই কথায় কবি মানুষের দীর্ঘায়ুর অহংকার ভেঙে দেন। অনেকদিন বেঁচে থাকা নয়, একটি প্রাণকে সম্পূর্ণভাবে জাগিয়ে তোলা- সেই তো সার্থকতা। ‘একটা প্রাণের জন্য ঢের দিন বাঁচার দরকার নেই‘- এই কথাটি দিয়ে কবি দীর্ঘায়ুর ধারণা ভাঙেন। বছরের পর বছর হাঁটা নয়; একটা প্রাণকে সম্পূর্ণ জাগ্রত করা- এটাই আসল সফলতা। যে মানুষ ভালোবাসে, অনুভব করে, পড়ে গেলেও ফের উঠে দাঁড়ায়, কান্নার মধ্যেও রঙ খুঁজে পায়- তার জীবন হয় পূর্ণ।

ব্যর্থতা মানুষের জীবনে অনিবার্য। কিনমশং রবীন্দ্রনাথ যেন বলতে চান, ব্যর্থতা কোনো চূড়ান্ত পরাজয় নয়; ব্যর্থতাও জীবনের রসের অংশ। গান থেমে গেলে যেমন কানে তার রেশ থাকে, তেমনি অসম্পূর্ণ সাধ, অপূর্ণ প্রেম, ভাঙা স্বপ্ন, হারানো দিন- এসবও মানুষের অন্তরে এক গভীর সুর রেখে যায়। যা শেষ হয়, তা মুছে যায় না; তা স্মৃতি, শিক্ষা, মমতা ও পরিণতির আলো হয়ে মানুষের ভেতরে থেকে যায়। তাই ব্যর্থতার বিলোপ মানে ব্যর্থতাকে অস্বীকার করা নয়; বরং তাকে জীবনের বৃহত্তর সুরে মিলিয়ে দেওয়া।

জীবনের কঠিন সত্যগুলো মাঝেমধ্যে এমন ভার হয়ে ওঠে যে মানুষ টলে যায়। বাড়ির চাপ, ঘাটতি, ছাড়া, অবহেলা, হারানো, আপনজনের দূরে চলে যাওয়া- এগুলো বুকের ভেতর ভারী হয়ে জমে। আর কবি? তার চোখে ধৈর্য মানে কাউটে বসে থাকা নয়। ওই ধৈর্য হচ্ছে আঘাত খেয়েও ভেতরটাকে জ্বালিয়ে রাখা। ফুল মৃদুল হলে কান্না নয়; বরং ততক্ষণ পর্যন্ত গন্ধ টেনে নেওয়া যতক্ষণ ফুল আছে। থামবে গান, তবু গাওয়া চলবে- এটাই ধৈর্যের নামান্তর।

জীবনের আশা খুঁজে পাওয়া যায় না বাইরের কথায়, পাওয়া যায় মানুষের ভেতরের শক্তিতে। ‘রক্ত নাচে দ্রুত ছন্দে’, ‘বাসনাতে ঢেউ উঠে যায়’- এমন লাইনে জীবন ফুটে ওঠে শরীর, মন, আত্মার গভীর তাপে। কবি মানুষকে টেনে নেন না নিষ্ক্রিয় হওয়ার দিকে, ডাকেন প্রেমে ঝাঁপ দিতে, আনন্দে হাত বাড়াতে, জীবনকে মেনে নিতে চাঙ্গা হয়ে। জীবন ধৈর্য ধরে কাটানোর নয়- অনুভব করা হোক, ভালোবাসা হোক, গড়ে তোলা হোক, ভেঙে গেলে আবার দাঁড়ানো হোক। মায়া কাটলেই যে জ্ঞান পাওয়া যায়, রবীন্দ্রনাথ তা মানেন না। খুলতে হয় জ্ঞানের চোখ, সেটা ঘটুক স্বর্গে; এ ধরায় ভালোবাসার আড়াল যেন থাকে। এমন আশা মানুষের গভীর ছোঁয়া বয়ে আনে। যুক্তি নিয়ে জীবন চলে না- চলে আলো-ছায়া মিলিয়ে স্নেহে, অজানাকে বিশ্বাস করে, রঙ খুঁজে সৌন্দর্যে। সত্যের ভারী পথেও এই মৃদু মায়া মানুষকে ধরে রাখে। অসুবিধা নয় এগুলো- আসলে এগুলোই হল তার সাহস।

ক্ষণিকার ‘শেষ’ কবিতা থেকে এই কথাটা শোনা যায়- সময় কাউকে নিয়ে থামে না, আবার মানুষও তার সামনে হাল ছাড়ে না। ভাঙা মুহূর্তের মধ্যে থাকা মানুষ যদিও থাকে, ভালোবাসা চলে যায় বছরের পর বছর। জীবনটা যতই ছোট হোক না কেন, তার ছায়া পড়ে অনেক দূরে। আকাঙ্ক্ষা যদি অপূর্ণ থাকে, তখনও তার গভীর ডাক মানুষকে নতুন করে খুঁজে পায়। যে ভগ্ন জায়গায় বসে ফুল গুছিয়ে রাখে, তার হার মানার কথা ভাবা যায় না।

ভাঙছে অনেকেই, আশঙ্কা আর ফেলে যাওয়ার ভারে মাথা নিচু করে। এমন সময় কবিতাটি এসে ঠান্ডা হাত রাখে কারও কাঁধে- সব মিলিয়ে যায় বলেই তো প্রতিটি মুহূর্ত এতটা গুরুত্বপূর্ণ। তাই দ্বিধা নয়, এগিয়ে যাওয়া; কান্না ছেড়ে গল্প লেখা; উদাসী ঝেড়ে ফেলে অপেক্ষা; শূন্যতা ছেড়ে চলা ভালোবাসার দিকে। সময়ের পেছনে হাঁটা মানে মৃত্যুর জন্য ঘড়ি ধরা নয়; বরঞ্চ জীবনকে ভরাট করা তার মধ্যেই।

‘থাকব না ভাই, থাকব না কেউ’- এটা হতাশার গান নয়। জীবনেরই এক উৎসব এখানে ধ্বনিত হয়। ভাঙা মুহূর্তগুলোতেও আনন্দ লুকিয়ে থাকে, ঠিক তেমনি ব্যর্থতা শেখায় নতুন পথ। অশ্রু যে রঙিন হতে পারে, তা অনেকেই জানে না। আর মুহূর্তের মধ্যেও চিরন্তনের ছোঁয়া টের পাওয়া যায়। রবীন্দ্রনাথ সেই সব ক্ষণিক সত্যকে ফুটিয়ে তুলেছেন ছন্দে, রসে, আর এক গভীর দৃষ্টিভঙ্গিতে।

মরণ আসবে, এটা ভয়ের নয়। ভয় হওয়া উচিত জীবনে না জীতে থাকা। শ্বাস যতক্ষণ চলে, ততক্ষণ মন খুলে দেওয়া, গড়া কিছু তৈরি করা, অপেক্ষা করা, হেরে যাওয়া- এগুলোই রইল। আমরা এগিয়ে যাই, তখনই আনন্দও হাজির হয়- সময়ের গতি মাথায় নিয়ে।

আমরা থাকব না- এই সত্য ভয়ংকর নয়। ভয়ংকর হলো, থাকাকালীন না বাঁচা। তাই যতক্ষণ প্রাণ আছে, ততক্ষণ ভালোবাসি, সৃষ্টি করি, ধৈর্য ধরি, ব্যর্থতাকে অতিক্রম করি, আর আনন্দের সঙ্গে এগিয়ে চলি- কালের পিছু পিছু।