মুঠোফোনে শিশুদের বন্দি শৈশব
ওরাইনা খাঁন চৌধুরী
প্রকাশ : ২৮ জুন ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
একসময় শৈশব মানেই ছিল নির্মল আনন্দ, সীমাহীন দৌড়ঝাঁপ আর অফুরন্ত কৌতূহল। বিকাল হলেই গ্রামের মাঠ কিংবা শহরের খোলা জায়গা মুখর হয়ে উঠত শিশুদের হাসি-আনন্দে। দাদা-দাদি বা নানা-নানির মুখে রূপকথার গল্প, বন্ধুদের সঙ্গে লুকোচুরি, গোল্লাছুট, ফুটবল, ক্রিকেট কিংবা গাছে চড়ে ফল পাড়া- এসবই ছিল বেড়ে ওঠার স্বাভাবিক অংশ। রাতের আকাশে তারা গোনা, বর্ষার দিনে কাগজের নৌকা ভাসানো কিংবা পরিবারের সবার সঙ্গে বসে গল্প করার আনন্দ ছিল শিশুকালের সবচেয়ে বড় সম্পদ।
কিন্তু প্রযুক্তিনির্ভর বর্তমান সময়ে সেই শৈশব যেন ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। আজকের অনেক শিশুর হাতের খেলনা হয়ে উঠেছে স্মার্টফোন। ফলে প্রকৃতি, খেলাধুলা ও পারিবারিক বন্ধনের পরিবর্তে তারা দিন কাটাচ্ছে মোবাইলের ছোট্ট পর্দার মধ্যে।
বর্তমানে অনেক বাবা-মা ব্যস্ত জীবনের কারণে কিংবা শিশুকে শান্ত রাখার উদ্দেশ্যে খুব ছোট বয়স থেকেই তার হাতে মোবাইল ফোন তুলে দেন। শিশুটি কান্না করলে, খেতে না চাইলে, ঘুমাতে না চাইলে কিংবা দুষ্টুমি করলে তার সামনে কার্টুন বা ভিডিও চালিয়ে দেওয়া হয়। এতে কিছু সময়ের জন্য অভিভাবকের কাজ সহজ হয়ে যায়, কিন্তু ধীরে ধীরে শিশুর মধ্যে মোবাইলের প্রতি নির্ভরশীলতা তৈরি হয়। একসময় সে মোবাইল ছাড়া খেতে, ঘুমাতে কিংবা সময় কাটাতে চায় না। এই নির্ভরশীলতা ধীরে ধীরে আসক্তিতে পরিণত হয়, যা শিশুর স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে।শিশুর প্রথম বিদ্যালয় হলো পরিবার। দাদা-দাদী কিংবা নানা-নানীর গল্প শিশুর কল্পনাশক্তিকে সমৃদ্ধ করে, ভাষা শেখায় এবং পারিবারিক সম্পর্ককে আরও গভীর করে। কিন্তু বর্তমানে গল্পের বই কিংবা পারিবারিক গল্পের আসর অনেকটাই হারিয়ে গেছে। তার পরিবর্তে ইউটিউব, শর্ট ভিডিও, অনলাইন গেম এবং বিভিন্ন অ্যাপ শিশুদের অবসরের প্রধান সঙ্গী হয়ে উঠেছে। এতে শিশুরা ধীরে ধীরে বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে এবং তাদের চিন্তা-ভাবনার পরিসর সংকুচিত হচ্ছে। অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহারের সবচেয়ে বড় ক্ষতি চোখের ওপর পড়ে। দীর্ঘ সময় স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকার ফলে চোখের ক্লান্তি, ড্রাই আই সিনড্রোম, মাথাব্যথা এবং দূরের জিনিস ঝাপসা দেখার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। শিশুদের চোখ বিকাশমান অবস্থায় থাকে, তাই তাদের ক্ষেত্রে এই ক্ষতি আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। দীর্ঘক্ষণ স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকার সময় চোখের পলক ফেলার হার কমে যায়, ফলে চোখ শুষ্ক হয়ে অস্বস্তি তৈরি হয়। অনেক শিশুকে অল্প বয়সেই চশমা ব্যবহার করতে হচ্ছে, যা তাদের আত্মবিশ্বাসেও প্রভাব ফেলে।
শুধু চোখ নয়, মোবাইলের অতিরিক্ত ব্যবহার শিশুর মানসিক বিকাশেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। তারা ধীরে ধীরে একাকী হয়ে পড়ে, বাস্তব জীবনের বন্ধুদের সঙ্গে খেলা বা কথা বলার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে।
ভার্চুয়াল জগতে অতিরিক্ত সময় কাটানোর ফলে সামাজিক দক্ষতা কমে যায় এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণে সমস্যা দেখা দেয়। অনেক শিশুর মধ্যে রাগ, অস্থিরতা, জেদ এবং হতাশা বেড়ে যায়। মোবাইল না দিলে কান্না করা, আক্রমণাত্মক আচরণ করা বা অস্থির হয়ে পড়া এখন অনেক পরিবারে সাধারণ দৃশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিক্ষাজীবনের ওপরও এর গভীর প্রভাব পড়ছে। পড়াশোনার প্রতি মনোযোগ কমে যাচ্ছে, বই পড়ার অভ্যাস হারিয়ে যাচ্ছে এবং দীর্ঘ সময় মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ছে। ছোট ছোট ভিডিও দেখার অভ্যাসের কারণে শিশুরা ধৈর্য হারিয়ে ফেলছে। ফলে স্মৃতিশক্তি, বিশ্লেষণ ক্ষমতা এবং সৃজনশীলতা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক শিক্ষার্থী অনলাইন ক্লাসের নামে মোবাইল ব্যবহার করলেও পরে তা গেম, সোশ্যাল মিডিয়া এবং ভিডিও দেখার মাধ্যমে অপব্যবহার করছে।খেলাধুলা শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বর্তমানে অনেক শিশু মাঠে যায় না। ফুটবল, ক্রিকেট, দৌড়ঝাঁপ, লুকোচুরি কিংবা গোল্লাছুটের মতো খেলাগুলো ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। এর ফলে শিশুদের শারীরিক সক্রিয়তা কমে যাচ্ছে, বাড়ছে স্থূলতা, দুর্বলতা এবং বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি। খেলাধুলা শুধু শরীর গঠন করে না, বরং দলগত কাজ, নেতৃত্ব, শৃঙ্খলা এবং আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলে—যা ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য অপরিহার্য।
অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের কারণে শিশুদের ঘুমের সমস্যাও বাড়ছে। রাতে ঘুমানোর আগে মোবাইল ব্যবহার করলে মস্তিষ্ক সক্রিয় থাকে, ফলে ঘুম আসতে দেরি হয়। পর্যাপ্ত ঘুমের অভাবে শিশুর শারীরিক বৃদ্ধি, মানসিক বিকাশ এবং শেখার ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সকালে ক্লান্ত অনুভব করা, বিদ্যালয়ে মনোযোগ কমে যাওয়া এবং সারাদিন অলসতা অনুভব করা এখন সাধারণ সমস্যায় পরিণত হয়েছে।
বর্তমানে শহর ও গ্রাম—দুই জায়গাতেই স্মার্টফোন সহজলভ্য হওয়ায় এই সমস্যা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। অনেক পরিবারে দেখা যায়, সবাই একই ঘরে বসে থাকলেও প্রত্যেকে নিজ নিজ মোবাইলে ব্যস্ত। এতে পারিবারিক যোগাযোগ কমে যাচ্ছে এবং শিশুরাও বড়দের দেখে একই অভ্যাস গড়ে তুলছে। ফলে প্রজন্মগতভাবে মোবাইল নির্ভরতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের স্ক্রিন টাইম নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত জরুরি। ১৮ মাসের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে ভিডিও চ্যাট ছাড়া অন্য কোনো স্ক্রিন ব্যবহার না করাই উত্তম। প্রিস্কুল বয়সী শিশুদের জন্য দিনে সর্বোচ্চ এক ঘণ্টা মানসম্মত শিক্ষামূলক কনটেন্ট দেখার পরামর্শ দেওয়া হয়। পাশাপাশি স্ক্রিন ব্যবহারের সময় অভিভাবকের উপস্থিতি থাকা এবং নিয়মিত বিরতি দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অভিভাবকদের দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি। শিশুকে শান্ত রাখার জন্য মোবাইল নয়, বরং গল্প বলা, বই পড়া, ছবি আঁকা, খেলাধুলা, গান শেখা কিংবা প্রকৃতির সঙ্গে পরিচিত করার মতো কার্যক্রমে যুক্ত করতে হবে। পরিবারের সবাইকে মোবাইলমুক্ত সময় কাটানোর অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। শিশুরা যা দেখে তাই শেখে, তাই বড়দের আচরণও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিদ্যালয় পর্যায়েও সচেতনতা বৃদ্ধি করা জরুরি। শিক্ষকরা শিশুদের খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম, বিতর্ক, বিজ্ঞানচর্চা এবং সৃজনশীল কাজে উৎসাহিত করতে পারেন। পাশাপাশি প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার সম্পর্কে নিয়মিত সচেতনতা কর্মসূচি আয়োজন করা উচিত। স্থানীয় প্রশাসনেরও দায়িত্ব রয়েছে শিশুদের জন্য নিরাপদ খেলার মাঠ ও বিনোদনের পরিবেশ তৈরি করা।
গণমাধ্যম এবং সামাজিক সংগঠনগুলোরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। শিশুদের জন্য ইতিবাচক অনুষ্ঠান, বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা এবং সচেতনতামূলক প্রচারণা বাড়াতে হবে। প্রযুক্তিকে সম্পূর্ণভাবে বাদ দেওয়া সম্ভব নয়, তবে এর ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা অবশ্যই সম্ভব।প্রযুক্তি আধুনিক জীবনের অপরিহার্য অংশ হলেও এটি যেন শিশুর শৈশব কেড়ে না নেয়—এটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। মোবাইল কখনো বাবা-মায়ের বিকল্প হতে পারে না, আবার প্রকৃতির আনন্দও কোনো স্ক্রিনে পাওয়া যায় না।আজকের শিশুরাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। তাদের সুন্দর, সুস্থ এবং মানবিক শৈশব নিশ্চিত করা পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের যৌথ দায়িত্ব। এখনই যদি আমরা সচেতন না হই, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বাস্তব জীবন থেকে দূরে সরে গিয়ে ভার্চুয়াল জগতে আটকে পড়বে। তাই আসুন, শিশুদের হাতে শুধু মোবাইল নয়, বই দিই; তাদের ঘরে নয়, মাঠে ফিরিয়ে আনি; গল্প, খেলাধুলা এবং ভালোবাসায় ভরিয়ে তুলি তাদের শৈশব। কারণ একটি সুন্দর শৈশবই গড়ে তুলতে পারে একটি সুন্দর, মানবিক এবং সুস্থ সমাজ।
ওরাইনা খাঁন চৌধুরী
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়
