তৃতীয় লিঙ্গের অধিকার ও সমাজিক দায়বদ্ধতা
নুসরাত সুলতানা
প্রকাশ : ২৮ জুন ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাসে, ট্রেন কিংবা লঞ্চে, বিয়ে বাড়িতে বা অন্যান্য অনুষ্ঠানে হিজড়া বা তৃতীয় লিঙ্গের লোকদের দেখা যায় টাকা তুলতে। আমরা খুবই বিরক্ত হই তাদের এমন আচরণে কারণ অনেকটা জোরপূর্বক তারা টাকা আদায় করে। অথচ আমরা কি কখনও ভেবে দেখেছি তাদের এই পেশা বেছে নেওয়ার পেছনে কোনো না কোনোভাবে আমরা দায়ী। শারীরিক ত্রুটির কারণে আমরা তাদের আলাদা করেছি সমাজ থেকে স্বাভাবিক জীবনযাপন থেকে, তাই তারা আমাদের মতো জীবনযাপন থেকে বঞ্চিত।
তৃতীয় লিঙ্গ হলো এমন মানুষদের পরিচয়, যারা নারী বা পুরুষ- এই প্রচলিত দুটি লিঙ্গের কোনোটিতেই পড়েন না।
তারা জন্মগত শারীরিক গঠন বা হরমোনের ভিন্নতার কারণে উভলিঙ্গ বা ভিন্ন বৈশিষ্ট্য নিয়ে জন্মগ্রহণ করেন, সমাজে এদের সাধারণত হিজড়া বলা হয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS) জনশুমারি ২০২২ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে তৃতীয় লিঙ্গের (হিজড়া) মোট সংখ্যা ১২,৬২৯ জন। নির্বাচন কমিশনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে তৃতীয় লিঙ্গের নিবন্ধিত ভোটার সংখ্যা ১,২৩৪ জন। প্রকৃত তৃতীয় লিঙ্গের সংখ্যা হয়ত এর থেকেও বেশি। কারণ সাধারণত হিজড়াদের প্রতি সামাজিক হীনমন্যতা আর অসম্মানজনক আচরণের কারণে অনেক লোক সমাজ থেকে দূরে থাকেন। অথচ তারাও আমাদের মত মানুষ, তাদেরও আবেগ, অনুভূতি, ইচ্ছা আর স্বপ্ন আছে।
সামাজিক নানা সীমাবদ্ধতায় তারা স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন না, থাকা হয় তাদের পরিবারের সাথে। যে সময়টায় অন্যান্য বাচ্চারা স্কুলে ব্যাগ কাঁধে নিজের স্বপ্ন পূরণে ছোটে, সেই সময় তৃতীয় লিঙ্গের একজন বের হয়ে যেতে হয় পরিবার থেকে। সমাজের নানা কটুকথা, খারাপ দৃষ্টিভঙ্গির কারণে পরিবার চাইলেও তাদের সন্তানদের নিজেদের কাছে রাখতে পারে না। অথচ হিজড়াদের শারীরিক সীমাবদ্ধতার জন্য তারা নিজেরা দায়ী নয়।
শুধু জন্মগতভাবে হরমোনজনিত ভিন্নতার কারণে শারীরিক ত্রুটি নিয়ে জন্মানো শিশুরাও তো আমাদের মত স্বাভাবিক জীবনের প্রত্যাশি। তাদের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করার বদলে আমরা তাদের দেখাই আমাদের নিষ্ঠুরতম দিক। যে ব্যক্তি সমাজের নিষ্ঠুরতার শিকার হয়ে পরিবার সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে, নিজের আবেগ, স্বপ্ন সব বিসর্জন দিয়েছে সেই ব্যক্তি যখন নিজের জীবিকার তাগিদে জোর করে টাকা তুলতে যায় তখন আবার আমরাই তাদের খাটো চোখে দেখি। অথচ এই সমাজিক কাঠামোই তাদের এই পেশায় যেতে বাধ্য করেছে।
বাংলাদেশে তৃতীয় লিঙ্গের প্রথম বিসিএস ক্যাডার ও বিশ্বের প্রথম তৃতীয় লিঙ্গের কূটনীতিক ওয়ালিদ ইসলাম ইতিমধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক সাড়া পেলেন। কিন্তু ওয়ালিদ ইসলামের মত কতজন উচ্চপর্যায়ে যেতে পারেন? অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল ও উচ্চমার্যাদা সম্পন্ন পরিবারে তৃতীয় লিঙ্গের সন্তান জন্মগ্রহণ করলে তারা স্বাভাবিক জীবনযাপনের সুযোগ পেলেও দেশের মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের পরিবারের সন্তানের এসব সুবিধা থেকে বঞ্চিত। এমনকি তৃতীয় লিঙ্গের মানুষরা বঞ্চিত হচ্ছে তাদের পৈতৃক সম্পত্তি থেকেও। আমরা সামাজিকভাবে তাদের যে কোনঠাসা করে ফেলি অথচ আমাদের ও জানা উচিত সমাজে তাদেরও বেঁচে থাকার, সুস্থ জীবনযাপন করার অধিকার আছে।
বাংলাদেশে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের জন্য কোনো নির্দিষ্ট বা পূর্ণাঙ্গ আইন নেই। তবে ২০১৩ সালে সরকার হিজড়াদের রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘তৃতীয় লিঙ্গ’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
এই স্বীকৃতির মাধ্যমে তারা জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্টে নিজেদের লিঙ্গ পরিচয় ব্যবহারের সুযোগ পান। এছাড়াও সংবিধানের ২৮(৪) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, অনগ্রসর গোষ্ঠীর জন্য সরকার বিশেষ বিধান তৈরি করতে পারে। এই অধিকার বলে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ সরকারি চাকরিতে আবেদন করতে পারেন।
বাংলাদেশে প্রচলিত উত্তরাধিকার আইন মূলত নারী ও পুরুষকেন্দ্রিক। তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের সম্পত্তির উত্তরাধিকার নিয়ে স্পষ্ট আইন নেই। তবে সংবিধানের ৪২ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, তারা সম্পত্তি অর্জন ও ভোগের অধিকার রাখেন। সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে ৫০ বছর বা তার বেশি বয়সী তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের জন্য বিশেষ ভাতার ব্যবস্থা রয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে তাদের দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়। এত কিছুর মাঝেও সীমাবদ্ধতা রয়ে যায়, তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের অধিকার পুরোপুরি নিশ্চিত করতে এখনো কোনো সুনির্দিষ্ট ‘সুরক্ষা আইন’ বা পারিবারিক সম্পত্তির পূর্ণ অধিকার সংক্রান্ত আইন পাস হয়নি। এর সাথে আমাদের সামাজিকভাবে তাদের হেয়প্রতিপন্ন করা তো আছেই।
তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের অধিকার নিয়ে বিভিন্ন সচেতন মহলে আলোচনা তোলা উচিত। সরকার কতৃক তৃতীয় লিঙ্গের অধিকার সংরক্ষণে সুনির্দিষ্ট আইন প্রণয়ন ও তা বাস্তবায়নে মনোনিবেশ করতে হবে। সরকার কতৃক বহু আইন প্রণয়ন করা হলেও আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি যদি পরিবর্তন করতে না পারি তবে তা সফল হবে না। তাই মানুষ হিসেবে আমাদের মানবিক দিকও জাগ্রত করতে হবে। এছাড়া বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের উচিত তৃতীয় লিঙ্গের জীবনমান উন্নয়নে তাদের উচ্চ শিক্ষা, ভালো পেশা নিশ্চিতে কাজ করা। শুধু শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে সমাজের একটি অংশ পিছিয়ে না পড়ুক এটাই একান্ত কাম্য।
নুসরাত সুলতানা
শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
