জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন

প্রকাশ : ২৮ জুন ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

চীনের দালিয়ানে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের প্রেসিডেন্ট ও সিইও আলোইস জভিংগির সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এক সৌজন্য সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়েছে গত মঙ্গলবার। এ বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশ ও অন্যান্য ডেল্টা বা বদ্বীপরাষ্ট্র এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর সুরক্ষায় বিশ্বসম্প্রদায় ও ডব্লিউইএফকে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। বর্তমান বৈশ্বিক জলবায়ু সংকটের প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রীর এ আহ্বান অত্যন্ত সময়োপযোগী এবং এতে জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার বিশ্বের কোটি কোটি প্রান্তিক মানুষের অধিকার আদায়ের তাগিদ রয়েছে।

ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান ভুক্তভোগী। অথচ বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে আমাদের ভূমিকা নগণ্য। বস্তুত শিল্পোন্নত দেশগুলোর অনিয়ন্ত্রিত কার্বন নির্গমনের মাশুল দিতে হচ্ছে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশ ও দ্বীপরাষ্ট্রকে। এ বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশের সরকারপ্রধানের প্রস্তাবটি একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করে। বৈঠকে তিনি পরিবেশ রক্ষায় বাংলাদেশের দৃঢ় অঙ্গীকারের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। বিশেষ করে তিনি আগামী পাঁচ বছরে দেশজুড়ে ২৫ কোটি গাছ লাগানো এবং প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল পুনঃখননের মাধ্যমে পানির প্রবাহ পুনরুদ্ধার ও বন্যার ঝুঁকি হ্রাসের কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেছেন। একই সঙ্গে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে কর সুবিধা প্রদান এবং ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের পরিকল্পনা প্রমাণ করে, বাংলাদেশ শুধু বিশ্বসম্প্রদায়ের কাছে সহায়তাই চাচ্ছে না, বরং নিজস্ব সক্ষমতা দিয়েও সবুজ জ্বালানি ও টেকসই উন্নয়নের পথ প্রশস্ত করছে।

ভৌগোলিক অবস্থান, সমতল ভূপ্রকৃতি এবং ঘনবসতির কারণে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশে পরিণত হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনে দেশে বহুমুখী সংকট তৈরি হচ্ছে। প্রধান ঝুঁকিগুলো হলো-সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পেয়ে দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের এক-পঞ্চমাংশ পানির নিচে তলিয়ে যেতে পারে। সমুদ্রের লোনা পানি মূল ভূখণ্ডে প্রবেশ করায় সুপেয় পানির তীব্র সংকট দেখা দিচ্ছে এবং কৃষিজমি উর্বরতা হারাচ্ছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের তীব্রতা ও ফ্রিকোয়েন্সি (ঘনঘন হওয়া) মারাত্মকভাবে বেড়ে গেছে। বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড়গুলোর তীব্রতা দিনদিন বাড়ছে, যা উপকূলীয় বাঁধ ভেঙে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কারণ হচ্ছে। দেশের উত্তরাঞ্চলে মৌসুমি বন্যার তীব্রতা বাড়ছে, আবার পাহাড়ি এলাকায় অসময়ে আকস্মিক ঢল বা ফ্ল্যাশ ফ্লাড দেখা দিচ্ছে। দেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থান বহুলাংশে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। জলবায়ু পরিবর্তন এ খাতে সরাসরি আঘাত হানছে। খরা, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে ধানসহ প্রধান ফসলের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। প্রতিবছর নদীভাঙনের শিকার হয়ে হাজার হাজার মানুষ ঘরবাড়ি ও কৃষিজমি হারাচ্ছে।

বলা বাহুল্য, এসব ঝুঁকি মোকাবিলা করা বাংলাদেশের একার পক্ষে সম্ভব নয়। প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। তাই প্রধানমন্ত্রীর ‘সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান’ সব মহলকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার বলে মনে করি আমরা। বর্তমান বহুমুখী বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও জলবায়ু সংকটের সময়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে রক্ষায় বিশ্ব সংহতি অপরিহার্য।