বইয়ের রাজধানী পুরান ঢাকার বাংলাবাজার

মোছা. মায়া আক্তার

প্রকাশ : ২৯ জুন ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

পুরান ঢাকার বাংলাবাজারের নাম উচ্চারণ করলেই প্রথমেই মনে পড়ে বইয়ের কথা। নতুন ছাপা বইয়ের সোঁদা গন্ধ, ছাপাখানার যান্ত্রিক শব্দ, দোকানিদের ব্যস্ত হাঁকডাক, বইভর্তি ভ্যানের চলাচল এবং পাঠকের ভিড়ে মুখর এক প্রাণচঞ্চল পরিবেশ- এসবই দীর্ঘদিন ধরে বাংলাবাজারের পরিচয় বহন করে এসেছে। এটি শুধু একটি বাজার নয়; বরং বাংলাদেশের জ্ঞানচর্চা, প্রকাশনা শিল্প ও বই ব্যবসার এক ঐতিহাসিক কেন্দ্র।

বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত বাংলাবাজারের ইতিহাস মুঘল আমলেরও পূর্ববর্তী। ইতিহাসবিদদের মতে, এটি প্রাচীন ঢাকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জনবসতি ও বাণিজ্যকেন্দ্র ছিল।

পরবর্তীকালে ১৬১০ সালে মুঘল সুবেদার ইসলাম খান ঢাকাকে বাংলার রাজধানী ঘোষণা করলে বাংলাবাজারের গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি পায়। যদিও সে সময় এটি বইয়ের বাজার হিসেবে পরিচিত ছিল না, তবে ব্যবসা-বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে এর সুনাম ছিল।

উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে বাংলাবাজারের ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের পর ঢাকায় ধীরে ধীরে ছাপাখানা ও বইয়ের দোকান গড়ে উঠতে থাকে। ১৮৬০ সালে ‘বাঙ্গালা যন্ত্র’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে বই ও পত্রিকা মুদ্রণের সুযোগ সৃষ্টি হয়। ক্রমে ধর্মীয় গ্রন্থ, পুঁথি ও শিক্ষামূলক বইয়ের ব্যবসা বাংলাবাজারকে কেন্দ্র করে বিকশিত হতে থাকে। বিশ শতকের শুরুতে বঙ্গভঙ্গ এবং ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ফলে পূর্ব বাংলায় শিক্ষা ও সাহিত্যচর্চায় নতুন জাগরণ সৃষ্টি হয়। সেই জাগরণের অন্যতম কেন্দ্র হয়ে ওঠে বাংলাবাজার। লেখক, কবি ও বুদ্ধিজীবীদের নিয়মিত আড্ডায় মুখর থাকত এই এলাকা।

১৯২৫ সালে বুদ্ধদেব বসুর প্রথম কাব্যগ্রন্থ মর্মবাণী এখান থেকেই প্রকাশিত হয়, যা বাংলাবাজারের সাহিত্যিক ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। তবে বাংলাবাজারের প্রকৃত রূপান্তর ঘটে ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর। দেশভাগের আগে বাংলা ভাষার প্রকাশনা শিল্প ছিল মূলত কলকাতাকেন্দ্রিক। দেশভাগের ফলে পূর্ব বাংলায় নিজস্ব প্রকাশনা শিল্প গড়ে তোলার প্রয়োজন দেখা দেয়। একে একে নওরোজ কিতাবিস্তান, স্টুডেন্ট ওয়েজ, গ্রেট ইস্ট লাইব্রেরি, মালিক লাইব্রেরি, খোশরোজ কিতাব মহলসহ বহু প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান বাংলাবাজারে প্রতিষ্ঠিত হয়। এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পূর্ব বাংলার সাহিত্য, শিক্ষা ও সংস্কৃতির বিকাশ নতুন গতি লাভ করে।

পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে শিক্ষার বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে পাঠ্যপুস্তকের চাহিদা বৃদ্ধি পায়। সেই চাহিদা পূরণে বাংলাবাজার দেশের প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে। জাতীয় শিক্ষাক্রমভিত্তিক পাঠ্যবই, সহায়ক গ্রন্থ, বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যপুস্তক, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার বই এবং বিভিন্ন রেফারেন্স বইয়ের বিশাল বাজার গড়ে ওঠে এখানে। দেশের প্রায় প্রতিটি জেলা ও উপজেলা থেকে বই ব্যবসায়ীরা নিয়মিত বাংলাবাজারে আসতে শুরু করেন। ফলে এটি বাংলাদেশের বৃহত্তম পাইকারি বইয়ের বাজারে পরিণত হয়।

ষাট ও সত্তরের দশকে খান ব্রাদার্স, মাওলা ব্রাদার্স, বইঘর, পুঁথিঘর (বর্তমান মুক্তধারা), আহমদ পাবলিশিং হাউস, চলন্তিকা বইঘর ও বিউটি বুক হাউসের মতো প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান দেশের সাহিত্যাঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এখান থেকেই শহীদ কাদরী, নির্মলেন্দু গুণ, আবুল হাসান, রফিক আজাদ, হুমায়ূন আজাদসহ বহু খ্যাতিমান লেখকের বই প্রকাশিত হয়। ফলে বাংলাবাজার শুধু ব্যবসার কেন্দ্র নয়, বরং সাহিত্য ও সংস্কৃতিরও প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়।

আশির দশকের পর বাংলাবাজারে প্রযুক্তিগত পরিবর্তন আসে। পুরোনো লেটার প্রেসের জায়গা দখল করে আধুনিক অফসেট মুদ্রণ প্রযুক্তি। উন্নত বাঁধাই, লেমিনেশন এবং আকর্ষণীয় প্রচ্ছদের ব্যবহার শুরু হয়। একই সময়ে বিদ্যাপ্রকাশ, আগামী, অনন্যা, অবসর, আফসার ব্রাদার্স, সময় প্রকাশনসহ নতুন প্রজন্মের প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান আত্মপ্রকাশ করে। বিশেষ করে হুমায়ূন আহমেদের বইয়ের অভূতপূর্ব জনপ্রিয়তা বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্পে এক নতুন যুগের সূচনা করে। বইয়ের সংস্করণ ও বিক্রি কয়েক গুণ বৃদ্ধি পায় এবং প্রকাশনা শিল্পে নতুন বিনিয়োগের পথ উন্মুক্ত হয়। বাংলাবাজারের সঙ্গে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পর্কও অত্যন্ত গভীর। ভৌগোলিক নৈকট্যের কারণে বহু বছর ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও গবেষকদের জন্য এটি বই সংগ্রহের প্রধান কেন্দ্র। জগন্নাথ কলেজ প্রতিষ্ঠার পর থেকেই পাঠ্যপুস্তক, আইন, ইতিহাস, সাহিত্য, দর্শনসহ বিভিন্ন বিষয়ের বইয়ের চাহিদা পূরণ করেছে বাংলাবাজার। তাই বলা যায়, দজগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় যেখানে জ্ঞানের আলো জ্বালায়, বাংলাবাজার সেখান থেকে সেই আলো বইয়ের পাতায় ভরে সারা দেশে ছড়িয়ে দেয়।’

বর্তমানে বাংলাবাজারে প্রায় দুই হাজার বইয়ের দোকান এবং চার শতাধিক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। দেশের প্রায় সব জেলার বইয়ের দোকানে এখান থেকেই পাঠ্যপুস্তক, সহায়ক গ্রন্থ ও সৃজনশীল সাহিত্য সরবরাহ করা হয়। বই মুদ্রণ, বাঁধাই, পরিবহন ও বিপণনকে কেন্দ্র করে লক্ষাধিক মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। বে সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাবাজারও নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। অনলাইন বুকশপ, ই-বুক ও অডিওবুকের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পাওয়ায় সরাসরি বাজারে এসে বই কেনা ক্রেতার সংখ্যা কমেছে। অধিকাংশ প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও নিজস্ব ওয়েবসাইটের মাধ্যমে বই বিক্রির দিকে ঝুঁকছে। ফলে একসময়কার সেই ব্যস্ত বাংলাবাজার আজ অনেকটাই নীরব।

এ ছাড়া সরু রাস্তা, তীব্র যানজট, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, অগ্নিঝুঁকি, কাগজের মূল্যবৃদ্ধি, পাইরেসি এবং প্রকাশনা শিল্পের অর্থনৈতিক মন্দা বাংলাবাজারের ভবিষ্যৎকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে। বহু ঐতিহাসিক ভবন বাণিজ্যিক স্থাপনার কাছে হারিয়ে যাচ্ছে। সাহিত্যিকদের আড্ডার ঐতিহ্যও এখন অনেকটাই স্মৃতির অংশ। তবুও শত প্রতিকূলতার মধ্যেও বাংলাবাজার আজও বাংলাদেশের জ্ঞানচর্চা ও প্রকাশনা শিল্পের প্রাণকেন্দ্র। এটি শুধু একটি বইয়ের বাজার নয়; এটি বাঙালির শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের এক জীবন্ত ইতিহাস। মুঘল-পূর্ব যুগের একটি সাধারণ বাণিজ্যকেন্দ্র থেকে আজকের দেশের বৃহত্তম বইয়ের রাজধানীতে পরিণত হওয়ার এই দীর্ঘযাত্রা বাংলাবাজারকে জাতীয় ঐতিহ্যের এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত করেছে।

বাংলাবাজারকে টিকিয়ে রাখা মানে শুধু একটি বাজারকে রক্ষা করা নয়; বরং বাংলাদেশের জ্ঞানচর্চা, প্রকাশনা শিল্প এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করা। তাই সময়ের দাবি, এই ঐতিহাসিক বইপাড়ার আধুনিকায়নের পাশাপাশি এর ইতিহাস, স্বকীয়তা ও বৌদ্ধিক পরিবেশ সংরক্ষণে রাষ্ট্র, প্রকাশক এবং পাঠক- সবার সম্মিলিত উদ্যোগ নিশ্চিত করা।

মোছা. মায়া আক্তার

গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়