লোডশেডিংয়ের স্থায়ী দাওয়াই ‘গ্রিন এনার্জি’

আফিয়া আবিদা এষা

প্রকাশ : ২৯ জুন ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বছরের পর বছর ধরে একটি চেনা দৃশ্য আমাদের তাড়া করে বেড়াচ্ছে। গ্রীষ্মের তাপমাত্রা যখনই ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি পৌঁছে যায়, তখনই দেশজুড়ে শুরু হয় লোডশেডিংয়ের দুর্ভোগ। শহর থেকে গ্রাম- কোথাও যেন স্বস্তি নেই। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় সামান্য ঝড়-বৃষ্টি বা দমকা হাওয়া হলেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। অনেক সময় আবহাওয়া স্বাভাবিক হওয়ার পরও বিদ্যুৎ ফিরতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি ও শিল্প- সবকিছুই ব্যাহত হয়।

প্রতিবারই সংকটের সময় সরকারের পক্ষ থেকে নানা আশ্বাস দেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ডলার সংকট, আন্তর্জাতিক বাজারে কয়লা, গ্যাস ও তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার কারণে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন বারবার চাপে পড়ে। ফলে লোডশেডিং যেন একটি মৌসুমি সমস্যায় পরিণত হয়েছে। প্রশ্ন হলো- এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটের টেকসই সমাধান কী? এর উত্তর আমাদের মাথার ওপর জ্বলতে থাকা সূর্য এবং বঙ্গোপসাগরের প্রবাহমান বাতাসের মধ্যেই লুকিয়ে আছে। অর্থাৎ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি বা গ্রিন এনার্জির বিকল্প নেই। আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সৌর ও বায়ুবিদ্যুতের মতো পরিবেশবান্ধব জ্বালানির দিকে দ্রুত অগ্রসর হতে পারলেই বিদ্যুৎ খাতে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সম্ভব।

বর্তমানে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো-এর আমদানিনির্ভর কাঠামো। দেশের নিজস্ব গ্যাসের মজুত ধীরে ধীরে কমে আসছে। ফলে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), কয়লা ও ফার্নেস অয়েল আমদানির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বা ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব সরাসরি আমাদের বিদ্যুৎ উৎপাদনে এসে পড়ে। অথচ বাংলাদেশ এমন একটি ভৌগোলিক অবস্থানে অবস্থিত, যেখানে বছরের অধিকাংশ সময় পর্যাপ্ত সূর্যালোক পাওয়া যায়। এই প্রাকৃতিক সম্পদকে যদি পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগানো যায়, তবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি বড় অংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকেই সম্ভব।

সরকার ইতোমধ্যে আগামী কয়েক বছরে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। বাসাবাড়ি, সরকারি ভবন, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও বাণিজ্যিক স্থাপনার ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপন, নেট মিটারিং ব্যবস্থা সম্প্রসারণ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিবান্ধব নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ খাতে বিদেশি বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বৃদ্ধির প্রচেষ্টাও চলছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে জাতীয় গ্রিডে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদ্যুৎ যুক্ত হবে এবং আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরতাও কমবে।

বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জ্বল হলেও এর অগ্রগতি এখনও প্রত্যাশিত নয়। বড় আকারের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের ক্ষেত্রে জমির স্বল্পতাকে প্রায়ই প্রধান বাধা হিসেবে তুলে ধরা হয়। কিন্তু এই সমস্যার কার্যকর বিকল্প রয়েছে। দেশের অসংখ্য শিল্পকারখানা, সরকারি ভবন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, রেলস্টেশন ও বাণিজ্যিক ভবনের ছাদকে যদি রুফটপ সোলার প্রকল্পের আওতায় আনা যায়, তবে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। একই সঙ্গে নেট মিটারিং ব্যবস্থার মাধ্যমে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে বিক্রি করে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান উভয়ই অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হতে পারে।

সৌরবিদ্যুতের পাশাপাশি বাংলাদেশের দীর্ঘ উপকূলীয় অঞ্চল বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্যও অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। বঙ্গোপসাগরের উপকূলীয় এলাকায় অফশোর উইন্ড এনার্জি প্রকল্প গড়ে তোলার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। বিশ্বের অনেক দেশ এরইমধ্যে সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্যতম প্রধান উৎসে পরিণত করেছে। প্রযুক্তির উন্নয়নের ফলে ব্যাটারি স্টোরেজ ব্যবস্থাও আগের তুলনায় অনেক কার্যকর ও সাশ্রয়ী হয়েছে। অথচ আমরা এখনও বিপুল অর্থ ব্যয় করে জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনা করছি এবং অলস বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করছি। এই ধারা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতি ও পরিবেশ—উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর।

অবশ্য নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রাতারাতি পুরোপুরি রূপান্তর সম্ভব নয়। সূর্যালোক ও বাতাসের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় এর কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তবে এটি যদি প্রচলিত বিদ্যুৎ ব্যবস্থার শক্তিশালী সহায়ক হিসেবে ব্যবহৃত হয় এবং মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ ধীরে ধীরে উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে উন্নীত করা যায়, তাহলে গ্রীষ্মকালের পিক আওয়ারে বিদ্যুতের ঘাটতি অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। এজন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত স্থিতিশীলতা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করা, নবায়নযোগ্য জ্বালানির যন্ত্রপাতি আমদানিতে কর-সুবিধা এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য আকর্ষণীয় পরিবেশ নিশ্চিত করা।

লোডশেডিং কেবল সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়ায় না; এটি শিল্প উৎপাদন, রপ্তানি, ক্ষুদ্র ব্যবসা, কৃষি এবং জাতীয় অর্থনীতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। প্রতিবছর জ্বালানি আমদানিতে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ের পরিবর্তে যদি আমরা নিজেদের প্রাকৃতিক সম্পদকে কাজে লাগাতে পারি, তবে অর্থনৈতিক সাশ্রয়ের পাশাপাশি জ্বালানি নিরাপত্তাও নিশ্চিত হবে।

প্রকৃতি আমাদের সূর্যের অফুরন্ত আলো এবং উপকূলীয় বাতাসের মতো অমূল্য সম্পদ দিয়েছে। এখন প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা, কার্যকর নীতি, প্রযুক্তিগত বিনিয়োগ এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা। জীবাশ্ম জ্বালানির সীমাবদ্ধতা থেকে বেরিয়ে সৌর ও বায়ুবিদ্যুতের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারলেই গড়ে উঠবে একটি টেকসই, পরিবেশবান্ধব এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎব্যবস্থা। লোডশেডিংমুক্ত বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়নের অন্যতম কার্যকর পথ হতে পারে গ্রিন এনার্জির বিস্তৃত ব্যবহার।

আফিয়া আবিদা এষা

গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়