বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষিত তরুণদের কর্মসংস্থান সংকট ও কাঠামোগত বিপর্যয়

মো. সাইদুর রহমান

প্রকাশ : ২৯ জুন ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

একটি দেশের মেধার সর্বোচ্চ স্তর যখন বেঁচে থাকার ন্যূনতম তাগিদে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সর্বনিম্ন স্তরে স্থান পেতে মরিয়া হয়ে ওঠে, তখন তা কেবল ব্যক্তিগত হতাশা নয়, বরং সামগ্রিক অর্থনৈতিক ও শিক্ষাব্যবস্থার চরম ব্যর্থতার ইঙ্গিত দেয়। সদ্য স্নাতক সম্পন্ন করা তরুণদের একটি বড় অংশ আজ চাকরির বাজারে প্রবেশ করতে গিয়ে এক গভীর অবক্ষয়ের মুখোমুখি হচ্ছে। আমার এক বন্ধু, দেশের বেশ নামকরা একটি কলেজ থেকে খুবই ভালো সিজিপিএ (CGPA) নিয়ে অনার্স শেষ করেছে । আমাদের ব্যাচের শীর্ষ পাঁচজন মেধাবী শিক্ষার্থীর তালিকা করলে সে নিঃসন্দেহে তাদের একজন হবে । অথচ তাকেও আমি ২০তম গ্রেডের চাকরির জন্য আবেদন করতে দেখেছি! তার একটাই কথা বন্ধু আমার একটা চাকরি লাগবেই, সেটা যে পদেরই হোক । তার মতো মেধাবী একজন ছাত্রের ২০তম গ্রেডের চাকরিতে আবেদন করছে দেখে আমি রীতিমতো স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম ।

আমারও কিছুদিন হলো অনার্স শেষ হয়েছে, তাই আজকাল চাকরির সার্কুলার নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করছি। কিন্তু গত ২৫ তারিখ একটি খবর দেখে আমি পুরোপুরি হতাশ হয়ে পড়েছি। পাবনা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অফিস সহায়ক পদে নিয়োগ প্রাপ্ত ১৮ জনের মধ্যে ১৭ জনই দেশের নামকরা সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকৌশল, ব্যবসায় প্রশাসন এবং বিজ্ঞানের বিভিন্ন মৌলিক বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। তারা হলো আমেরিকান ইন্টান্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকে ট্রিপল-ই-তে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার পাশ করা, পাবনা টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করা, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ এবং আরবান অ্যান্ড রিজিওনাল প্লানিংয়ে মাস্টার্স পাস করা দুইজন , পাবনা এডওয়ার্ড কলেজ থেকে অর্থনীতিতে মাস্টার্স পাস করা, ঢাকার ইডেন কলেজ থেকে কেমিস্ট্রিতে মাস্টার্স পাস করা, ঢাকার তেজগাঁও কলেজ থেকে মার্কেটিংয়ে মাস্টার্সসহ ১৭ জনই উচ্চশিক্ষিত। মাত্র একজন এইচএসসি পাস ।

এই চিত্রটি স্পষ্ট করে দেয় যে, দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠগুলো থেকে পাস করা প্রকৌশলী ও গবেষকরাও আজ পিয়ন বা দাপ্তরিক সহায়কের মতো পদে নিয়োজিত হতে বাধ্য হচ্ছেন। এটি কেবল ব্যক্তিপর্যায়ের ট্র্যাজেডি নয়, বরং রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের এক চরম অপচয়। একজন প্রকৌশলী বা বিজ্ঞান স্নাতকের পেছনে রাষ্ট্র ও পরিবারের যে বিপুল পরিমাণ সম্পদ ও সময় ব্যয় হয়, তার চূড়ান্ত আউটপুট যদি হয় ফাইল বহন করা বা দপ্তরের ফাইফরমাশ খাটা, তবে তা জাতীয় অর্থনীতির উৎপাদনশীলতাকে দীর্ঘমেয়াদে পঙ্গু করে দেয় ।

বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানদের অনার্স ও মাস্টার্স শেষ করতে দীর্ঘ ৫ থেকে ৭ বছর ব্যয় করতে হয়। এই দীর্ঘ শিক্ষাজীবনের পেছনে পরিবারগুলোকে বিপুল অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করতে হয়। এত বিপুল ত্যাগের পর একজন তরুণ যখন শ্রমবাজারে প্রবেশ করে, তখন তার প্রাথমিক লক্ষ্য থাকে পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা ফিরিয়ে আনা। কিন্তু ২০তম গ্রেডের অফিস সহায়কের প্রারম্ভিক মূল বেতন মাত্র ৮,২৫০ টাকা। বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ঊর্ধ্বমুখী ব্যয়ের বাজারে এই বেতনে জীবনধারণ করা তো দূরের কথা, একজন একক ব্যক্তির মৌলিক চাহিদাই মেটানো অসম্ভব। উচ্চশিক্ষার পেছনে বিনিয়োগ করা অর্থের বিপরীতে এই আয় কেবল ঋণাত্মকই নয়, বরং তা তরুণদের আত্মমর্যাদা ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক আঘাত হানছে ।

শিক্ষাব্যবস্থার আমূল সংস্কার না করে যত্রতত্র বিশ্ববিদ্যালয় খুলে বসার সরকারি নীতি কর্মসংস্থানের বাজারকে মারাত্মক সংকটে ফেলেছে। যথাযথ শিল্প-চাহিদা ও বাজার বিশ্লেষণের অভাবের কারণে দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো কেবল “ডিগ্রি প্রদানকারী কারখানায়” পরিণত হয়েছে। দেশের শিল্প খাতের সঙ্গে পাঠ্যক্রমের কোনো বাস্তবমুখী সংযোগ বা পার্টনারশিপ গড়ে ওঠেনি। কারিকুলাম পরিবর্তন না করে ঘরে ঘরে স্নাতকোত্তর সনদ বিলি করার এই প্রক্রিয়াটি ভবিষ্যতে দেশকে এক বড় ধরনের বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

যদি এই ধারা অব্যাহত থাকে, তবে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে দেশের খুচরা বিক্রেতা, হকার এবং সাধারণ অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমজীবীদের সিংহভাগই উচ্চশিক্ষিত ডিগ্রিসম্পন্ন ব্যক্তিতে পরিণত হবে, যা মূলত মেধার অপব্যবহার এর চূড়ান্ত রূপ। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রসার না ঘটিয়ে কেবল তাত্ত্বিক শিক্ষার সম্প্রসারণের ফলে যুবসমাজ কোনো বিশেষায়িত দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না, যা তাদের বৈশ্বিক বা স্থানীয় আধুনিক বাজারে স্বাবলম্বী হিসেবে গড়ে তুলতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হচ্ছে। উচ্চশিক্ষার সনদ হাতে নিয়ে একজন তরুণের ২০তম গ্রেডের পিয়ন পদের নিয়োগপত্র গ্রহণ করা কখনোই কোনো সুস্থ ও প্রগতিশীল অর্থনীতির লক্ষণ হতে পারে না। মেধার এই অবমূল্যায়ন রোধ করা না গেলে দেশ অচিরেই এক চরম বুদ্ধিবৃত্তিক বন্ধ্যাত্ব ও সামাজিক বিশৃঙ্খলার দিকে ধাবিত হবে।

মো. সাইদুর রহমান

শিক্ষার্থী, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়