ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপ কবে খেলবে বাংলাদেশ
আমানুর রহমান
প্রকাশ : ৩০ জুন ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ফিফা বিশ্বকাপ শুরু হলেই পুরো বাংলাদেশ মেতে ওঠে এক অভূতপূর্ব উন্মাদনায়, যা বিশ্বের যেকোনো দেশের ফুটবল-আবেগকে অনায়াসে হার মানাতে পারে। চার বছর পরপর দেশের আনাচে-কানাচে, প্রতিটি বাড়ির ছাদে কিংবা শহরের অলিতে-গলিতে উড়ে বেড়ায় ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা কিংবা জার্মানির মতো দূরদেশের রঙিন সব পতাকা। কিন্তু এই ধার করা ফুটবল-আনন্দের সমান্তরালে প্রতিটি বাঙালির মনে একটি চিরন্তন ও বেদনাদায়ক প্রশ্ন সুপ্ত থাকে- আমাদের নিজস্ব লাল-সবুজ পতাকাটি কবে উড়বে বিশ্ব ফুটবলের এই মহোৎসবে এই জিজ্ঞাসা শুধু আবেগতাড়িত সাধারণ মানুষের ক্ষণিক খেয়াল নয়, বরং কোটি ফুটবলপ্রেমীর বুকচিরে বেরিয়ে আসা এক গভীর জাতীয় আকাঙ্ক্ষা। দুঃখজনক হলেও সত্য, ফুটবল নিয়ে আমাদের উৎসবের আমেজ ও উন্মাদনা যতটা বিশ্বমানের, মাঠের ফুটবল ঠিক ততটাই অনুন্নত ও বৈশ্বিক মানদণ্ড থেকে পিছিয়ে। পর্বত প্রমাণ এই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে আবেগ সরিয়ে রেখে আমাদের হাঁটতে হবে সম্পূর্ণ যুক্তি ও বাস্তবতার পথে।
ফিফা ২০২৬ সংস্করণ থেকে বিশ্বকাপের দলসংখ্যা ৩২ থেকে বাড়িয়ে ৪৮-এ উন্নীত করেছে। এর ফলে এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের (এএফসি) জন্য বরাদ্দকৃত কোটা সাড়ে চার থেকে বেড়ে সাড়ে আটটিতে দাঁড়িয়েছে। এই ঐতিহাসিক সুযোগের অর্থ হলো, এশিয়ার মাঝারি সারির দলগুলোর জন্য এখন বিশ্বকাপের মঞ্চে যাওয়ার পথ আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রশস্ত। বাংলাদেশকে যদি এই বর্ধিত আট দশমিক পাঁচ স্লটের যেকোনো একটির প্রকৃত দাবিদার হতে হয়, তবে প্রথমেই এশিয়ার শীর্ষ ১৫ থেকে ২০টি দলের মধ্যে নিজেদের জায়গা করে নিতে হবে। বর্তমানে এশিয়ার ৪৭টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান যেখানে ৩৯-এর কাছাকাছি, সেখানে এই লক্ষ্য অর্জন করতে হলে বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ে বিশাল এক লাফ দিতে হবে। সঠিক পরিকল্পনা ছাড়া কোনো অলৌকিক উপায়ে এটি অর্জন করা অসম্ভব।
২০২৬ সালের জুনের সর্বশেষ ফিফা র্যাঙ্কিং অনুযায়ী বাংলাদেশের অবস্থান ১৮১তম, যা ১৯৯৬ সালের এপ্রিলে অর্জিত আমাদের ইতিহাসের সর্বোচ্চ ১১০তম অবস্থানের চেয়ে অনেক পিছিয়ে। সাম্প্রতিক ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ এবং ২০২৭ এএফসি এশিয়ান কাপের যৌথ বাছাইপর্বের কথাই ধরা যাক; গ্রুপ ‘আই’-তে অস্ট্রেলিয়া, ফিলিস্তিন ও লেবাননের মতো পরাশক্তিগুলোর মুখোমুখি হয়ে বাংলাদেশ মাত্র ১ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপের তলানিতে থেকে বিদায় নিয়েছে। এই নির্মম পরিসংখ্যান মনে করিয়ে দেয় যে, আন্তর্জাতিক ফুটবলের আধুনিক গতি, উন্নত কৌশল এবং শারীরিক সক্ষমতায় আমরা কতটা পিছিয়ে। র্যাঙ্কিংয়ের এই করুণ দশা মূলত আমাদের কাঠামোগত দুর্বলতারই প্রতিফলন। বাংলাদেশে ১১ জনের খেলার উপযোগী মানসম্মত ফুটবল মাঠের সংখ্যা হাতে গোনা। অথচ মাত্র ৩ লাখ জনসংখ্যার দেশ আইসল্যান্ডেই এমন মাঠের সংখ্যা শতাধিক। মাঠের অভাব, অনুশীলনের অনুপযুক্ত পরিবেশ এবং তৃণমূল পর্যায়ে খেলোয়াড় তৈরির ঘাটতিই আমাদের ফুটবলকে পেছনে টেনে ধরেছে। তাই বিশ্বকাপের মতো আসরে অংশ নেওয়ার স্বপ্ন দেখলে সবার আগে এই কাঠামোগত অসামঞ্জস্য দূর করে সারা দেশে পর্যাপ্ত ও মানসম্মত মাঠ নিশ্চিত করা জরুরি।
শুধু ইট-কাঠের পরিকাঠামো গড়ে তুললেই ফুটবলের উন্নতি হয় না, পাশাপাশি প্রয়োজন বিজ্ঞানসম্মত পরিকল্পনা ও দীর্ঘমেয়াদি ধৈর্য। ১৯৯২ সালে জাপান যখন ‘জে-লিগ’ চালু করে এবং ‘শতবর্ষী রূপরেখা’ ঘোষণা করে, তখন তারা অনূর্ধ্ব-১২ থেকে অনূর্ধ্ব-২১ পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্ন লিগ কাঠামো তৈরি করেছিল। এর ফলে আজ তাদের নিবন্ধিত যুব ফুটবল ক্লাবের সংখ্যা কয়েক হাজার। অথচ বাংলাদেশে বয়সভিত্তিক ফুটবল এখনো বিক্ষিপ্ত ও অগোছাল; নিয়মিত যুব লিগের অভাবে প্রতিভাবান খেলোয়াড়রা অকালেই ঝরে যাচ্ছে। সুতরাং, বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করতে হলে আজ থেকেই অনূর্ধ্ব-১২ থেকে অনূর্ধ্ব-২১ পর্যন্ত একটি নিরবচ্ছিন্ন ও বিজ্ঞানসম্মত যুব লিগ কাঠামো প্রতিষ্ঠা করতে হবে- যার কোনো বিকল্প নেই।
বিশ্বকাপের মঞ্চে যাওয়ার দীর্ঘ ও কণ্টকাকীর্ণ পথটি কোনো ‘শর্টকাট’ বা সাময়িক জোড়াতালি দিয়ে পাড়ি দেওয়া সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন ফুটবলের সামগ্রিক কাঠামোর আমূল সংস্কার। ঘরোয়া লিগ বা ‘বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ’-কে শুধু ক্যালেন্ডার মেলানোর বা নিয়ম রক্ষার আয়োজন না বানিয়ে আধুনিক, দীর্ঘমেয়াদি ও তীব্র প্রতিযোগিতাপূর্ণ করে তুলতে হবে। সীমিত সুযোগের মধ্যেও সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে আমাদের নারী ফুটবল দল যেভাবে একের পর এক সাফল্য এনে দিচ্ছে, তা প্রমাণ করে যে- দীর্ঘমেয়াদি ক্যাম্প ও সঠিক পেশাদার পরিচর্যা পেলে আমাদের ফুটবলাররাও আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত হতে পারে। পুরুষ ফুটবলেও এই সাফল্যের পুনরাবৃত্তি ঘটাতে চাইলে তৃণমূল পর্যায় থেকে একাডেমি গড়ে তুলতে হবে। অনূর্ধ্ব-১৬ ও অনূর্ধ্ব-১৯ দলগুলোকে নিয়মিত উন্নত দেশের সঙ্গে ম্যাচ খেলার সুযোগ দিতে হবে। পাশাপাশি, ‘ফিফা ফরোয়ার্ড প্রোগ্রাম’-এর মতো বৈশ্বিক অনুদানগুলোকে সঠিক পরিকাঠামো নির্মাণে শতভাগ স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজে লাগাতে হবে। শক্তিশালী বয়সভিত্তিক কাঠামো এবং আধুনিক একাডেমি ব্যবস্থা ছাড়া জাতীয় দলের পাইপলাইনে দক্ষ ও পেশাদার ফুটবলার সরবরাহ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
একটি দেশের ফুটবলের হাল ধরে রাখে এর প্রশাসনিক কাঠামো এবং নীতিনির্ধারকদের দূরদর্শিতা ও সুশাসন। বিশ্বকাপে দলের সংখ্যা ৪৮-এ উন্নীত হওয়ায় এশিয়া থেকে সরাসরি ৮টি এবং প্লে-অফে ১টি দল সুযোগ পাচ্ছে, যা বাংলাদেশের জন্য ক্ষীণ হলেও একটি গাণিতিক আশার সঞ্চার করেছে। তবে এই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনকে (বাফুফে) শুধু খাতাণ্ডকলমে নয়, বাস্তবেও অন্তত ১০ বছরের একটি অখণ্ড কারিগরি রোডম্যাপ বা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে, যেখানে প্রতি দুই বছর পরপর কোচ বা টেকনিক্যাল ডিরেক্টর পরিবর্তনের সংস্কৃতির অবসান ঘটবে। সেই সঙ্গে ফেডারেশনের নীতিমালায় স্থিতিশীলতা আনতে হবে এবং রাষ্ট্র ও বেসরকারি খাতের সম্মিলিত বিনিয়োগে ফুটবলকে পরিণত করতে হবে একটি লাভজনক ও মর্যাদাপূর্ণ পেশায়।
বর্তমান আন্তর্জাতিক মানদণ্ড, পরিকাঠামোগত দুর্বলতা এবং র্যাঙ্কিংয়ের বিশাল ব্যবধান বিবেচনায় আগামী ২০৩০ বা ২০৩৪ সালের বিশ্বকাপে বাংলাদেশের খেলার সম্ভাবনা প্রায় শূন্যের কোঠায়। কিন্তু আজ থেকে যদি একটি সুনির্দিষ্ট, সুপরিকল্পিত এবং কঠোর ১০-১২ বছরের মাস্টারপ্ল্যান গ্রহণ করা হয়, তবে এই দৃশ্যপট বদলে যাওয়া মোটেও অসম্ভব নয়। এই মহাপরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হতে হবে- ২০৩৫ সালের মধ্যে ফিফা র্যাঙ্কিং ১০০-এর নিচে নামিয়ে আনা, নিয়মিত এএফসি এশিয়ান কাপের মূল পর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জন করা এবং একটি আধুনিক ফুটবল ইকোসিস্টেম তৈরি করা। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির সঙ্গে এই রোডম্যাপ বাস্তবায়িত হলে, ২০৩৮ বা ২০৪২ সালের ফিফা বিশ্বকাপে লাল-সবুজ জার্সি গায়ে বিশ্বমঞ্চে বাংলার ফুটবলারদের দৌড়াতে দেখাটা আর অলিক কল্পনা থাকবে না; বরং তা পরিণত হবে এক অনস্বীকার্য বাস্তবতায়। সেই মাহেন্দ্রক্ষণের জন্য আমাদের শুধু গ্যালারির দর্শক হয়ে বসে থাকলে চলবে না, মাঠের ঘাসে নিরবচ্ছিন্ন ও কঠোর পরিশ্রমে আত্মনিয়োগ করতে হবে।
আমানুর রহমান
শিক্ষার্থী, হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজ
