কার্বন ক্রেডিট : সংকটকে অর্থনীতিতে রূপান্তরের নতুন হাতিয়ার

মো. আব্দুল্লাহ খান

প্রকাশ : ৩০ জুন ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যে কয়েকটা দেশ বা অঞ্চল বেশি ঝুঁকির মধ্যে আছে, তার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড়, সমুদ্রের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি আর উপকূলের ভাঙন আমাদের প্রতিনিয়ত মনে করিয়ে দেয় আমরা এক দুর্যোগপ্রবণ ব-দ্বীপে বাস করছি। কিন্তু প্রকৃতির এক অদ্ভুত নিয়ম আছে- সে যেখানে ক্ষত তৈরি করে, সেখানেই আবার মলম লুকিয়ে রাখে। আমাদের এই বিশাল সমুদ্র উপকূল, সুন্দরবন আর দ্বীপ অঞ্চলগুলো শুধু আমাদের ঝড়-ঝাপটা থেকেই বাঁচায় না, এগুলো বায়ুমণ্ডলের ক্ষতিকর কার্বন গ্যাস চুষে নেওয়ার এক একটি বিশালাকার ‘স্পঞ্জ’ হিসেবে কাজ করে। আর প্রকৃতির এই অপরিসীম ক্ষমতাকে আন্তর্জাতিক বাজারে রূপান্তর করার মোক্ষম হাতিয়ারই হলো ‘কার্বন ক্রেডিট’। একসময় শিল্পায়নের অপরিহার্য উপজাত বা ‘বাই-প্রোডাক্ট’ হিসেবে কার্বন নিঃসরণকে মেনে নেওয়া হতো। কিন্তু আধুনিক বিশ্বে প্রকৃতির মাধ্যমে কার্বন ধারণ (Carbon Sequestration) নিজেই একটি অত্যন্ত মূল্যবান অর্থনৈতিক সম্পদে পরিণত হয়েছে।

সহজভাবে বললে, ১ কার্বন ক্রেডিট = ১ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড (বা সমপরিমাণ গ্রিনহাউস গ্যাস) যা বায়ুমণ্ডলে যাওয়া থেকে আটকানো হয়েছে অথবা প্রকৃতিতে জমিয়ে রাখা হয়েছে তার একটি বৈশ্বিক পুরস্কার বা স্বীকৃতি সনদ। আন্তর্জাতিক প্রোটোকল অনুযায়ী, বিশ্বের বড় বড় শিল্পোন্নত দেশ বা বহুজাতিক কোম্পানিগুলো কলকারখানা চালাতে গিয়ে কী পরিমাণ কার্বন বাতাসে ছাড়তে পারবে, তার একটা নির্দিষ্ট সীমা বেঁধে দেওয়া থাকে। কোনো কোম্পানি যদি সেই সীমার চেয়ে বেশি কার্বন নিঃসরণ করে, তবে তাকে বিশাল অঙ্কের জরিমানা দিতে হয়। এই জরিমানা থেকে বাঁচার একটি সহজ উপায় হলো- যেসব দেশ প্রকৃতিকে বাঁচিয়ে বাতাস থেকে কার্বন কমাচ্ছে, তাদের কাছ থেকে ‘ক্রেডিট’ বা অধিকার কিনে নেওয়া। আলোচনার সুবিধার্থে ধরেন, ইউরোপের একটি গাড়ি প্রস্তুতকারক কোম্পানিকে বছরে ১ লাখ টন কার্বন ছাড়ার অনুমতি দেওয়া হলো। কিন্তু তাদের উৎপাদনের কারণে নিঃসরণ হয়ে গেল ১ লাখ ২০ হাজার টন। এই অতিরিক্ত ২০ হাজার টনের জন্য তাদের বিশাল অঙ্কের জরিমানা গুনতে হবে। এই জরিমানা থেকে বাঁচতে কোম্পানিটি এমন কোনো দেশের প্রকল্প খুঁজবে, যারা বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন কমিয়েছে। এখন যদি বাংলাদেশের কোনো ম্যানগ্রোভ বনায়ন প্রকল্প আন্তর্জাতিকভাবে সার্টিফাইড হয় এবং সেটি ২০ হাজার টন কার্বন বাতাস থেকে চুষে নিয়ে থাকে, তবে ইউরোপের ওই কোম্পানিটি বাংলাদেশের কাছ থেকে ২০,০০০ কার্বন ক্রেডিট কিনে নেবে। ফলে বাংলাদেশ তার প্রকৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার পুরস্কার হিসেবে সরাসরি বৈদেশিক মুদ্রা পেয়ে যাবে। একটু ভিন্ন ভাবে বললে, ইউরোপ বা আমেরিকার কোনো কোম্পানি তাদের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে বাংলাদেশের বনায়ন বা ম্যানগ্রোভ রক্ষা প্রকল্পে টাকা দেবে, যাতে কাগজে-কলমে তাদের কার্বন নিঃসরণের হিসাব ‘শূন্য’ বা নিউট্রাল হয়ে যায়।

বিশ্বের বহু দেশ ও প্রতিষ্ঠান এখন নিজেদের ‘কার্বন নিউট্রাল’ (Carbon Neutral) বা নেট-জিরো করার ঘোষণা দিচ্ছে। যেমন- ভুটান বা সুরিনামের মতো দেশগুলো তাদের বিশাল বনাঞ্চলের কারণে অলরেডি ‘কার্বন নেগেটিভ’ (তারা যে পরিমাণ কার্বন ছাড়ে, তার চেয়ে বেশি শোষণ করে)। অন্যদিকে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, জাপান এবং মাইক্রোসফট বা গুগলের মতো টেক জায়ান্টরা বিপুল পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ করেও কার্বন ক্রেডিট কিনে নিজেদের খাতার হিসাব ‘নিউট্রাল’ বা শূন্যে নামিয়ে আনছে। আন্তর্জাতিক বাজারে এখন প্রতি বছর কার্বন ক্রেডিটের চাহিদা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। ২০৩০ সালের মধ্যে এই বাজারের আকার কয়েকশো বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে বলে অর্থনীতিবিদদের ধারণা।

সম্প্রতি মহেশখালী দ্বীপ নিয়ে করা একটি গবেষণা আমাদের এই চোখ খুলে দিয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত Invest Coastal Blue Carbon Model ব্যবহার করে দেখা গেছে, ২০১৫ সালে মহেশখালীর উপকূলীয় নিম্নাঞ্চলে কার্বন স্টক ছিল ১১.৩০ মিলিয়ন টন, যা ২০২৫ সালে এসে দাঁড়িয়েছে ১৬.৬৭ মিলিয়ন টনে। অর্থাৎ মাত্র ১০ বছরে কার্বন ধারণক্ষমতা বেড়েছে প্রায় ৪৭ শতাংশ! সবচেয়ে আশার কথা হলো, এই কার্বনের প্রায় ৭০ থেকে ৭৮ শতাংশই ধরে রেখেছে আমাদের উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ বন। অর্থনৈতিক মূল্যায়নে দেখা গেছে, কার্বনের আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য বিবেচনায় এই ছোট্ট অঞ্চলের সম্ভাব্য নিট বর্তমান মূল্য (ঘচঠ) প্রায় ২.৬৮ থেকে ৫.৩৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ৩০ থেকে ৬০ কোটি টাকা)। মাত্র একটি দ্বীপের একটি ছোট অংশ যদি এত টাকার অর্থনৈতিক সম্ভাবনা জাগাতে পারে, তবে সমগ্র বাংলাদেশ নিয়ে ভাবলে সেই অঙ্কটা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে যদি আমরা সুন্দরবন, কুতুবদিয়া, হাতিয়া, সন্দ্বীপ এবং বঙ্গোপসাগরের অন্যান্য উপকূলীয় চরাঞ্চলে একইভাবে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে কার্বন পরিমাপ করতে পারি, তবে বাংলাদেশ বৈশ্বিক কার্বন বাজারে বিলিয়ন ডলারের অংশীদার হতে পারবে।

এই ব্যবস্থার সবথেকে সুন্দর দিক হলো, এটি আমাদের অর্থনীতি এবং পরিবেশ- দুটিকেই একসাথে বাঁচাবে। কার্বন ক্রেডিটের মাধ্যমে যে বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আসবে, তা সরাসরি ব্যবহার করতে হবে উপকূলীয় অঞ্চলের বনায়ন ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে। স্থানীয় জেলে ও সাধারণ মানুষ যখন দেখবে বন পাহারা দিলে বা নতুন গাছ লাগালে সরাসরি পকেটে টাকা আসছে, তখন তারা নিজেরাই সুন্দরবন বা ম্যানগ্রোভ ধ্বংস হওয়ার বিরুদ্ধে রুখে দাড়াবে। ফলে একদিকে যেমন দেশের বেকারত্ব দূর হবে, অন্যদিকে প্রাকৃতিকভাবেই গড়ে উঠবে শক্তিশালী এক সবুজ দেয়াল, যা কোটি কোটি টাকা খরচ করে বানানো কৃত্রিম বাঁধের চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী।

তবে এই বিলিয়ন ডলারের বাজারে প্রবেশ করাটা আমাদের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ, আন্তর্জাতিক বাজারে কার্বন বিক্রি করতে হলে নিখুঁত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এবং তথ্যের প্রয়োজন হয়, যা পরিমাপ করার প্রযুক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা এখনো আমাদের দেশে বেশ সীমিত। তাছাড়া ব্লু কার্বনকে এখনও আমাদের জাতীয় অর্থনৈতিক পরিকল্পনা বা জলবায়ু নীতিমালায় প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পুরোপুরি অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এগুলো সমাধানের পাশাপাশি উপকূলীয় অঞ্চলে চিংড়ি চাষের নামে অবৈধভাবে ম্যানগ্রোভ ধ্বংস বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, পরিবেশ সংরক্ষণ কোনো বিলাসিতা নয়, এটি আসলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সবচেয়ে লাভজনক দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। এখনই সময় কার্বন ক্রেডিটকে কেবল পরিবেশগত আলোচনার বিষয় হিসেবে না দেখে, দেশের মূল অর্থনৈতিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখার। সরকারি-বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে যদি আমরা এই প্রযুক্তিগত ঘাটতি দূর করতে পারি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে আমাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারি, তবে জলবায়ু পরিবর্তনের এই মহাসংকটই একদিন বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় আশীর্বাদে পরিণত হবে।

মো. আব্দুল্লাহ খান

শিক্ষার্থী, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়