আষাঢ়ের মধুময় উপহার : রসালো ফলের সমাহার

ড. মো. আনোয়ার হোসেন

প্রকাশ : ০১ জুলাই ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

রিনঝিন রিনঝিন বর্ষা নামল। তপ্ত রোদে পুড়ে খাক হওয়া বাংলার বুকে আষাঢ় আসে এক পশলা পরম শান্তি নিয়ে। মেঘের গুরুগুরু ডাকে আকাশ ছেয়ে যায়, আর প্রকৃতি তার সবুজ আঁচল বিছিয়ে দেয় চারধারে। এই বর্ষার আগমনী বার্তার সঙ্গে সঙ্গেই বাঙালির ঘরে ঘরে হাজির হয় এক স্বর্গীয় স্বাদ। আষাঢ় মানেই শুধু অবিরাম বৃষ্টির রিনিঝিনি নূপুরনিক্বন নয়, আষাঢ় মানেই জিভে জল আনা হরেক রকমের রসালো ফলের এক মহোৎসব।

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বর্ষাকে আবাহন জানিয়ে লিখেছিলেন, ‘ঐ আসে ঐ ঘন গৌরবে নব যৌবন বরষা’। প্রকৃতির এই নবযৌবনের দিনে চারপাশ মেতে ওঠে ঝড়ো বাতাসের মাতাল হাওয়া আর অফুরন্ত অক্সিজেনের এক মহোৎসবে। বাতাস যখন গাছের পাতায় পাতায় দোলা দিয়ে যায়, তখন মনে হয় প্রতিটি বৃক্ষ যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছে। এই সতেজ নিশ্বাসের মাঝেই ডালপালাজুড়ে ঝুলতে থাকে বাংলার চিরন্তন ঐতিহ্যের স্মারক সব ফলমূল, যা আমাদের রসনা তৃপ্তির আদিম ও অকৃত্রিম উপাদান।

বাঙালির আষাঢ়ি উৎসবের প্রধান আকর্ষণই হলো ফলের রাজা রসালো আম। হিমসাগর, ল্যাংড়া, কিংবা ফজলি- নাম যাই হোক না কেন, আমের এক কামড়েই যেন লুকিয়ে থাকে জীবনের পরম তৃপ্তি। ইতিহাসের পাতায় মুঘল সম্রাট আকবরের লাকবাগ ডালিমের মতো আমের বাগান করার গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়, এই ফল শুধু ক্ষুধা মেটায় না, বরং এটি আমাদের সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমের গাঢ় মিষ্টি গন্ধ গ্রামীণ জনপদ থেকে শহুরে ফ্ল্যাটের বারান্দা পর্যন্ত একাকার করে দেয়।

আমের ঠিক পরপরই যার লাল টুকটুকে চেহারা আমাদের চোখ ও মন জুড়িয়ে দেয়, তা হলো মিষ্টি লিচু। দিনাজপুরের বেদানা কিংবা বোম্বাই লিচুর খোসা ছাড়ালেই বেরিয়ে আসে কাঁচের মতো স্বচ্ছ, রসে ভরপুর এক টুকরো স্বর্গ। লিচুর এই সংক্ষিপ্ত আগমন যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয় বসন্তের কোকিলের মতো সুন্দর জিনিস পৃথিবীতে বেশিদিন স্থায়ী হয় না। তবুও ক্ষণিকের সেই মিষ্টি স্বাদ বাঙালির ১২ মাসের অপেক্ষাকে সার্থক করে তোলে।

বর্ষার আসল বিপ্লবী রূপ ফুটে ওঠে যখন চারধারে সুস্বাদু ও মিষ্টি কাঁঠালের সুবাস ছড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশের জাতীয় ফল এই কাঁঠাল আকারে যেমন বিশাল, পুষ্টিতেও তেমনই অনন্য। পাকা কাঁঠালের কোয়ার হলুদ রং যেন সূর্যের আলোর এক একটি জমাট বাঁধা টুকরো। কাঁঠাল খাওয়ার পর তার বিচি দিয়ে তরকারি কিংবা ভর্তা বানানোর যে পারিবারিক ঐতিহ্য, তা কেবল এই বাংলাতেই সম্ভব; যেখানে কোনো কিছুই অপচয় হয় না।

এরই মাঝে গাছে গাছে উঁকি দেয় পাকা জাম। কবি জীবনানন্দ দাশের কবিতায় জামের যে রূপক বর্ণনা পাওয়া যায়, তা বাংলার রূপকে আরও রহস্যময় করে তোলে। টক-মিষ্টি স্বাদের এই জাম খাওয়ার পর আয়নায় নিজের বেগুনি হয়ে যাওয়া জিব দেখে শৈশবে হাসেনি, এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া দায়। জামের এই প্রাকৃতিক রং আর ঔষধি গুণ যেন আমাদের মাটির খুব কাছের এক পরম বন্ধু।

লুকিয়ে থাকা রত্নের মতো গাছের ডালে থোকায় থোকায় ঝুলে থাকে ছোট লটকন। নরসিংদীর এই বিখ্যাত ফলটি বাইরে থেকে দেখতে অতি সাধারণ; কিন্তু খোসা ছড়াতেই ভেতরে লুকিয়ে থাকা টক-মিষ্টি কোয়াগুলো মুখের ভেতর এক অদ্ভুত চনমনে ভাবের সৃষ্টি করে। লটকন যেন প্রকৃতির এক গোপন উপহার, যা অলক্ষ্যে থেকে বাংলার ফলভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করে চলেছে।

একটু খেয়াল করলেই নজরে পড়বে শরিফা বা টক-মিষ্টি আতা ফল। আঁশযুক্ত এই ফলের ভেতরের নরম সাদা অংশটি মুখে দিলে মনে হয় যেন কোনো রাজকীয় মিষ্টান্ন গলিয়ে দেওয়া হয়েছে। আতা গাছের তোতা পাখি নিয়ে ছড়া কেটে আমাদের শৈশব কেটেছে, আর বড় বেলায় এসে এই ফলের স্বাদ আমাদের সেই ফেলে আসা সোনালী দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দেয়। পুষ্টির এক মহাবিপ্লব ঘটে যখন বাংলার উঠোনে ডালপালা মেলে ধরে ভিটামিন পেয়ারা। একে গরিবের আপেল বলা হলেও এর পুষ্টিগুণ যেকোনো দামি বিদেশি ফলকে হার মানায়। কাঁচা-পাকা পেয়ারার কামড়ে যে খসখসে ও মিষ্টি অনুভূতি, তা শরীর ও মন দুটোকেই সতেজ করে তোলে। বর্ষার দুপুরে কাশন্দি আর লঙ্কা গুঁড়ো দিয়ে মাখানো পেয়ারা যেন এক পরম তৃপ্তির স্বাদ।

ঠিক এই সময়েই বাজারে নিজের রাজকীয় মুকুট মাথায় দিয়ে হাজির হয় পাকা আনারস। জলডুগি বা ক্যালেন্ডার জাতের আনারসের চোখগুলো যেন প্রকৃতির নিখুঁত এক নকশা। আনারসের মিষ্টি রস যখন ঠোঁটের কোণ বেয়ে গড়িয়ে পড়ে, তখন গ্রীষ্মের সব ক্লান্তি এক নিমেষে ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যায়। এই ফল আমাদের ভেতরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাকে এক লহমায় বাড়িয়ে তোলে। আমাদের চিরচেনা ফলের তালিকায় অনন্য এক নাম রসালো ডেউয়া। গোলগাল, অসমান আকৃতির এই ফলটি শহরের মানুষের কাছে কিছুটা অচেনা হলেও গ্রামীণ জনপদে এর কদর অপরিসীম। ডেউয়ার টক-মিষ্টি ক্বাথ মুখে দিলে এক অন্যরকম স্বাদের অনুভূতি হয়, যা লিভার ও পেটের নানাবিধ অসুখে যুগ যুগ ধরে ভেষজ ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

মুখে রুচি ফিরিয়ে আনতে কাঁচা আমড়ার জুড়ি মেলা ভার। কামড় দিলেই কড়মড় শব্দ আর টক রসের তীব্রতা যেন অলস দুপুরের ঘুম তাড়িয়ে দেয়। আমড়ার আচার কিংবা ডাল দিয়ে আমড়ার টক রান্না বাঙালির দুপুরের খাবারের মেন্যুকে এক রাজকীয় রূপ দান করে। এটি যেমন সস্তা, তেমনই ভিটামিন সি-র এক অফুরন্ত ভাণ্ডার। একটু দূর থেকে ভেসে আসা তীব্র ঘ্রাণেই বোঝা যায় আশেপাশে কোথাও আছে সুগন্ধি বেল। কবিরা বেলের শক্ত খোলসকে মানুষের কঠিন হৃদয়ের সাথে তুলনা করেছেন, যার ভেতরে লুকিয়ে থাকে নরম ও সুমিষ্ট শাঁস। বেলের শরবত এই বর্ষার গুমোট গরমে পেট ঠান্ডা রাখার এক অমোঘ মহৌষধ, যা আমাদের পরিপাকতন্ত্রকে সচল রাখে।

সব ঋতুর, সব সময়ের চিরন্তন সঙ্গী হলো সুমিষ্ট কলা। সাগর, সবরি কিংবা চম্পা কলা যেন বাংলার প্রতিটি ঘরে এক নিত্যদিনের পুষ্টির জোগানদার। সহজলভ্য এবং খোসা ছড়ানোর ঝামেলাহীন এই ফলটি শ্রমজীবী মানুষের দুপুরের খাবারের এক অন্যতম প্রধান ভরসা। কলার পুষ্টিগুণ আমাদের পেশি ও শক্তি ধরে রাখতে সাহায্য করে। তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে সব গাছ ছাড়িয়ে আকাশে উঁকি মারে, আর আষাঢ়ে আমাদের উপহার দেয় পুষ্টিকর তাল। পাকা তালের ঘন রস দিয়ে তৈরি তালের পিঠা কিংবা পায়েসের সুবাসে গ্রামীণ ঘরের রান্নাঘরগুলো মণ্ডম করে। তালের এই মিষ্টি স্বাদ যেন বাংলার চিরায়ত লোকজ সংস্কৃতির এক জীবন্ত দলিল।

বর্ষার শেষের দিকে ডালপালা আলো করে আসে টক জলপাই। জলপাইয়ের নাম শুনলেই জিভে জল আসে না এমন মানুষ বিরল। কাঁচা জলপাইয়ের টক স্বাদ কিংবা সরষের তেলে ডোবানো জলপাইয়ের আচার আমাদের ডাইনিং টেবিলের এক অপরিহার্য অনুষঙ্গ।

ড. মো. আনোয়ার হোসেন

প্রাবন্ধিক ও কথা সাহিত্যিক