অসীম চেতনা, আল্লাহপ্রেম ও মানবাত্মার মুক্তি

মমতাজ উদ্দিন আহমদ

প্রকাশ : ০১ জুলাই ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মানুষের আত্মা মূলত সীমার মধ্যে আবদ্ধ হলেও তার আকাঙ্ক্ষা চিরকাল অসীমমুখী। দেহ তাকে মাটির সঙ্গে বেঁধে রাখে, সংসার তাকে দায়িত্ব ও ক্লান্তির ভারে নত করে, কিন্তু অন্তরের গভীরে সে বারবার কোনো পরম আশ্রয়ের দিকে ফিরে যেতে চায়। এই প্রত্যাবর্তন শুধু ধর্মীয় সাধনার বিষয় নয়; এটি মানব-অস্তিত্বের এক চিরন্তন সত্য। মানুষ যতই জাগতিক প্রাপ্তিতে নিজেকে পূর্ণ করতে চায়, তার অন্তরে তবু থেকে যায় এক অনন্ত অপূর্ণতার সুর। এই অপূর্ণতাই তাকে পূর্ণের দিকে, সীমা থেকে অসীমের দিকে, আত্মবিস্মৃতি থেকে আত্মস্মৃতির দিকে আহ্বান করে।

অসীমের ছোঁয়া রবীন্দ্রনাথের গানে বারবার ফুটে ওঠে। তার ‘তোমার অসীমে’ গানটির চিন্তাধারা এক গভীর আত্মিক প্রত্যাবর্তনের দর্শন। এখানে মানুষ নিজেকে দুঃখ, মৃত্যু ও বিচ্ছেদের অধীন এক ক্ষুদ্র সত্তা হিসেবে নয়, বরং অসীমের সন্তান হিসেবে চিনতে শেখে। গানটির অন্তর্লীন সুর হলো- মানবজীবনের সব ভয়, ক্লান্তি ও গ্লানি মূলত স্রষ্টাবিমুখতার ফল; আর মুক্তি নিহিত আছে পূর্ণের দিকে চেতনার প্রত্যাবর্তনে। তিনি লিখেছেন, ‘সীমার মধ্যে অসীম তুমি বাজাও আপন সুর’- এই পঙ্?ক্তিতে মানুষের সীমাবদ্ধ জীবনের মধ্যেই অসীমের প্রকাশধ্বনি ধরা পড়ে। অর্থাৎ অসীম কোনো দূরবর্তী, বিমূর্ত, অধরা সত্তা নয়; জীবনের ক্ষুদ্রতম মুহূর্তেও তার সুর বাজে। মানুষের কাজ হলো সেই সুর শুনতে শেখা। আবার তার ‘আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, বিরহদহন লাগে/তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে’- এই উপলব্ধিতে দেখা যায়, দুঃখ ও মৃত্যু জীবনের শেষ সত্য নয়; তাদের অন্তরালেও অনন্ত আনন্দের এক গভীর স্রোত আছে।

এই ভাবধারার সঙ্গে নজরুল ইসলামের আধ্যাত্মিক গানেরও নিবিড় সাযুজ্য আছে। নজরুলের ইসলামী সংগীতে মানুষ বারবার আল্লাহর দরবারে ফিরে যায়- গ্লানি, পাপ, অশ্রু, অনুশোচনা ও আশার মালা নিয়ে। তার ‘আল্লাহতে যার পূর্ণ ঈমান, কোথা সে মুসলমান’ গানটি বাহ্যিক পরিচয়ের চেয়ে অন্তরের ঈমানকে বড় করে তোলে। আবার ‘মসজিদেরই পাশে আমায় কবর দিও ভাই’ গানে মৃত্যুও হয়ে ওঠে আল্লাহর স্মরণঘন আশ্রয়ের পথে ফিরে যাওয়ার আকুলতা। নজরুলের মরমী কণ্ঠে আত্মা কখনও বিদ্রোহী, কখনও প্রেমিক, কখনও পথহারা ভিখারি; কিন্তু তার চূড়ান্ত গন্তব্য একটাই- পরম করুণাময়ের সান্নিধ্য।

মানুষের এই ফিরে আসার কথা কুরআনে বড় স্পষ্টভাবে উচ্চারিত হয়েছে।

তার থেকেই এলাম, তার দিকেই যাব- এটাই জীবনের হদিস, সূরা আল-বাকারাহ ২:১৫৬ এ কথা বলে। আল্লাহর ঘোষণাটি এ রকম- ‘নিশ্চয় আমরা আল্লাহর জন্য, এবং নিশ্চয় আমরা তাঁর দিকেই প্রত্যাবর্তনকারী’। কুরআন এ আয়াতের মাধ্যমে মানুষের জীবনের গতিপথ এক বাক্যে নির্ধারণ করে দিয়েছে। জীবন আমাদের নয়, কেউ নিজের মালিক নয়। এ জীবনের মালিক আল্লাহ। জীবন, মৃত্যু, দুঃখ, আনন্দ, পরীক্ষা- সব এক ফেরার পথে ঘাট। একই প্রত্যাবর্তন-যাত্রার অংশ। অন্য জায়গায়, সূরা আল-ফাজরে ডাক আসে- হে শান্ত আত্মা, ফিরে আয় তোর রবের কাছে, মন ভরিয়ে, রবও তোকে ভরসা করে (৮৯:২৭-২৮)। শেষ ঠিকানা ওখানে, যেখানে ভয় মিথ্যা, বিচ্ছেদ থামে, আর শান্তি জমে উঠে সম্পূর্ণ হয়ে।

পবিত্র কুরআনের ওপরের ঘোষণা থেকে আমরা জানতে পারি, মুমিন বান্দাকে যদি আল্লাহ্ তা’আলা কোনো কষ্ট দেন তবে তাতে কোনো না কোনো মহৎ উদ্দেশ্য রয়েছে। তার উদ্দেশ্যকে সম্মান করতে পারা একটি মহৎ কাজ। আর এটাই হচ্ছে, ‘সবর’। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘মুমিনের কর্মকাণ্ড আশ্চর্যজনক। তার সমস্ত কাজই ভাল। মুমিন ছাড়া আর কারও জন্য এমনটি হয় না। যদি তার কোন খুশীর বিষয় সংঘটিত হয় তবে সে শুকরিয়া আদায় করে, ফলে তা তার জন্য কল্যাণের হয়। আর যদি তার কোনো ক্ষতিকর কিছু ঘটে যায় তবে সে সবর করে, ফলে তাও তার জন্য কলাণকর হয়।” [মুসলিম: ২৯৯৯]

মানুষের অন্তরের অশান্তি, ভয় ও বিচ্ছিন্নতার মূল কারণ হলো সে নিজের উৎস ভুলে যায়। সে যখন নিজেকে শুধু দেহ, সম্পদ, সম্পর্ক, সাফল্য বা সামাজিক পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে, তখন মৃত্যু তাকে ভয় দেখায়, দুঃখ তাকে গ্রাস করে, বিচ্ছেদ তাকে ভেঙে দেয়। কিন্তু সে যখন উপলব্ধি করে যে তার অস্তিত্ব আল্লাহর আমানত, তার প্রাণ পরম উৎস থেকে আগত, তখন জীবনের দৃশ্যপট পাল্টে যায়। কুরআন ঘোষণা করে: ‘জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তরগুলো প্রশান্তি লাভ করে’- সূরা আর-রাদ ১৩:২৮।

মমতাজ উদ্দিন আহমদ

সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব, বান্দরবান পার্বত্য জেলা