পোষা প্রাণী পালনে কেন আগ্রহী হচ্ছে নতুন প্রজন্ম
হেনা শিকদার
প্রকাশ : ০১ জুলাই ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নাগরিক সভ্যতার ইট-কাঠ-পাথরের খাঁচায় বন্দি আধুনিক মানুষের জীবন। সকালের অ্যালার্ম থেকে শুরু করে গভীর রাতের স্ক্রিন স্ক্রোলিং- সবকিছুই যেন এক যান্ত্রিক নিয়মে বাঁধা। এই যান্ত্রিকতা, প্রতিযোগিতা আর তীব্র ব্যস্ততার মাঝে সমকালীন সমাজে এক অভূতপূর্ব মানবিক ও মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বর্তমান যুগের তরুণ ও নতুন প্রজন্মের (মিলেনিয়ালস এবং জেন-জি) জীবনযাত্রায় একটি বড় পরিবর্তন হলো পোষা প্রাণী পালনের প্রতি তাদের গভীর ও ক্রমবর্ধমান অনুরাগ। আজ থেকে দুই দশক আগেও আমাদের সমাজে পশুপাখি পালন মূলত গ্রামীণ অর্থনীতি, শিকার কিংবা কেবলই বাড়ি পাহারা দেওয়ার মতো উপযোগিতাবাদী প্রয়োজনের সাথে যুক্ত ছিল। কিন্তু বর্তমান শহুরে প্রেক্ষাপটে পোষা বিড়াল, কুকুর, পাখি বা অ্যাকুয়ারিয়ামের রঙিন মাছগুলো কেবল ‘পশু’ নয়, বরং জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠছে। নতুন প্রজন্মের তরুণ-তরুণীদের মাঝে এই ‘পেট কালচার’ বা পোষা প্রাণী সংস্কৃতির এই জোয়ার কেন তৈরি হলো, তা গভীর সমাজতাত্ত্বিক ও মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের দাবি রাখে।
নতুন প্রজন্মের পোষা প্রাণী পালনের সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি হলো সমকালীন মনস্তাত্ত্বিক সংকট। আধুনিক যুগ মানুষকে বাহ্যিকভাবে যতটা সংযুক্ত করেছে, অভ্যন্তরীণভাবে ততটাই একাকী করে তুলেছে। তীব্র প্রতিযোগিতা, ক্যারিয়ারের চাপ, পড়াশোনার বোঝা এবং সম্পর্কের টানাপোড়েন তরুণ সমাজকে এক ধরণের নীরব বিষণ্ণতা (Depression) ও তীব্র মানসিক চাপের (Stress) দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই মানসিক একাকীত্ব দূর করতে একটি পোষা প্রাণী জাদুর মতো কাজ করে। মানুষের সম্পর্কের মধ্যে নানা জটিলতা, প্রত্যাশা ও ভুল বোঝাবুঝি থাকতে পারে, কিন্তু একটি অবুঝ প্রাণীর ভালোবাসা সম্পূর্ণ নিঃশর্ত। কর্মক্ষেত্র বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ক্লান্ত-বিধ্বস্ত হয়ে ঘরে ফেরার পর যখন একটি বিড়াল পায়ে গা ঘষে বা একটি কুকুর লেজ নেড়ে স্বাগত জানায়, তখন মুহূর্তের মধ্যে সারাদিনের সব ক্লান্তি ধুয়ে মুছে যায়। চিকিৎসা বিজ্ঞানের গবেষণাও বলে, পোষা প্রাণীর স্পর্শ মানবদেহে অক্সিটোসিন ও ডোপামিনের মতো আনন্দদায়ক হরমোনের নিঃসরণ বাড়ায়, যা মানসিক চাপ ও রক্তচাপ দ্রুত কমিয়ে আনে। আমাদের সনাতনী যৌথ পরিবার প্রথা ভেঙে এখন পারমাণবিক বা একক (Nuclear) পরিবারের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। উচ্চশিক্ষা বা চাকুরির সুবাদে অনেক তরুণ-তরুণী নিজের চেনা পরিবেশ ও পরিবার ছেড়ে একা শহরে থাকছেন। এই শহুরে জীবনে আত্মীয়স্বজন বা প্রতিবেশীদের সাথে যোগাযোগের সুযোগ সীমিত। এই চরম সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও শূন্যতা পূরণে পোষা প্রাণী এক অনন্য সামাজিক সঙ্গী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। একা ঘরে ফেরার পর যেখানে কোনো মানুষ কথা বলার থাকে না, সেখানে একটি পোষা প্রাণীর উপস্থিতি ঘরটিকে প্রাণবন্ত করে তোলে। তারা তরুণদের একাকী জীবনের নীরব শ্রোতা ও সঙ্গী হয়ে ওঠে, যা তাদের সামাজিক বিচ্ছিন্নতাবোধ থেকে রক্ষা করে। বর্তমান প্রজন্মের মাঝে বিয়ে, সংসার এবং সন্তান নেওয়ার সনাতনী জীবনদর্শনে এক বিশাল পরিবর্তন এসেছে। ক্যারিয়ারের প্রতি গভীর মনোযোগ এবং অর্থনৈতিক স্বাধীনতার কারণে অনেকেই দেরিতে বিয়ে করছেন বা একা থাকার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। এমনকি বিবাহিত দম্পতিদের অনেকেই বর্তমান বৈশ্বিক ও অর্থনৈতিক মন্দার বাজারে সন্তান লালন-পালনের বিশাল খরচ ও দীর্ঘমেয়াদি দায়িত্ব এড়াতে চান। কিন্তু মানুষের ভেতরের সহজাত স্নেহ, মমতা ও অভিভাবকত্বের যে তাড়না থাকে, তা তারা পোষা প্রাণীর যত্ন নেওয়ার মাধ্যমে পূরণ করছেন। সমাজবিজ্ঞানে একে বলা হচ্ছে ‘পেট পেরেন্টিং’। বর্তমান তরুণরা নিজেদের পোষা প্রাণীর ‘মালিক’ ভাবেন না, বরং নিজেদের ভাবেন তাদের ‘বাবা’ বা ‘মা’। সন্তান লালন-পালনের চেয়ে পোষা প্রাণীর রক্ষণাবেক্ষণ তুলনামূলক কম জটিল এবং এটি তরুণদের স্বাধীন জীবনযাত্রায় খুব একটা বাধা সৃষ্টি করে না, ফলে এটি তাদের কাছে দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। নতুন প্রজন্ম প্রযুক্তির চাদরে মোড়ানো এক ভার্চুয়াল জগতে বাস করছে। সারাদিন ল্যাপটপ, স্মার্টফোন, সোশ্যাল মিডিয়া এবং ইন্টারনেটের কৃত্রিম দুনিয়ার সাথে যুক্ত থাকতে থাকতে এক ধরনের ডিজিটাল ক্লান্তি (Digital Fatigue) তৈরি হয়। ভার্চুয়াল জগতের লাইক, কমেন্ট বা টেক্সট সাময়িক আনন্দ দিলেও তা মানুষের ভেতরের প্রকৃত আবেগীয় তৃপ্তি দিতে পারে না। এই কৃত্রিম দুনিয়া থেকে বের হয়ে একটি জীবন্ত প্রাণীর বাস্তব উপস্থিতি, তার চঞ্চলতা, তার ক্ষুধা লাগা বা খেলার ছলাকলা তরুণদের মাটির পৃথিবীর বাস্তব অনুভূতির সাথে যুক্ত করে। এটি তাদের যান্ত্রিক জীবনকে কিছুটা হলেও স্বাভাবিক, সতেজ ও জীবন্ত করতে সাহায্য করে। ইন্টারনেট এবং সোশ্যাল মিডিয়ার ভূমিকা এই আগ্রহ তৈরিতে অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোষা প্রাণীদের নিয়ে অসংখ্য গ্রুপ ও পেজ গড়ে উঠেছে। নিজের পোষা প্রাণীর সুন্দর ছবি বা মজার ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করা এবং এর মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট ‘পেট লাভার্স কমিউনিটি’র অংশ হওয়া বর্তমান প্রজন্মের কাছে এক ধরণের আধুনিক লাইফস্টাইল এবং সামাজিক মর্যাদার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্য বন্ধুদের বা ইনফ্লুয়েন্সারদের পোষা প্রাণীর রিলস বা ভিডিও দেখে অনেক তরুণ নিজের অজান্তেই পশুপাখি পোষার ব্যাপারে অনুপ্রাণিত হচ্ছে। নতুন প্রজন্মের শিক্ষার হার, বৈশ্বিক তথ্য প্রাপ্তি এবং সচেতনতা আগের চেয়ে অনেক বেশি। ইন্টারনেট ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের কল্যাণে তারা প্রাণী অধিকার (Animal Rights) এবং কল্যাণ সম্পর্কে দারুণভাবে সংবেদনশীল। বর্তমান তরুণদের মাঝে বাজার থেকে চড়া দামে বিদেশি জাতের পার্সিয়ান বিড়াল বা হাস্কি কুকুর কেনার চেয়ে রাস্তা থেকে অসুস্থ, পরিত্যক্ত বা অবহেলিত দেশি বিড়াল-কুকুর উদ্ধার করে (Rescue) তাদের দত্তক (Adopt) নেওয়ার প্রবণতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ‘অ্যাডোপ্ট, ডোন্ট শপ’ (Adopt, Don’t Shop)- এই স্লোগানটি নতুন প্রজন্মের মাঝে এক মানবিক আন্দোলন হিসেবে ছড়িয়ে পড়েছে। এটি তাদের মানবিক মূল্যবোধ, সহমর্মিতা এবং সমাজের অবহেলিত জীবকুলের প্রতি এক ধরণের ইতিবাচক দায়বদ্ধতার বহিঃপ্রকাশ। একটি পোষা প্রাণী পালন করা কেবল আনন্দের বিষয় নয়, বরং এর সাথে জড়িয়ে আছে এক বিশাল দায়িত্ব। তাকে সময়মতো পুষ্টিকর খাবার দেওয়া, তার ঘর বা মলমূত্র পরিষ্কার করা, নিয়মিত গোসল করানো এবং অসুস্থ হলে চিকিৎসকের কাছে বা ভ্যাটের কাছে নিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে তরুণদের মাঝে গভীর দায়িত্ববোধ গড়ে ওঠে। অলস, অগোছালো বা রাতজাগা জীবনযাপন করা অনেক তরুণ তাদের পোষা প্রাণীর খাতিরে নিজেদের জীবনযাত্রায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনছেন। এই দায়িত্বশীলতা তাদের ব্যক্তিগত ব্যক্তিত্বের বিকাশে, ধৈর্য্য ধারণে এবং সহমর্মী মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।
নতুন প্রজন্মের পোষা প্রাণী পালনের এই ক্রমবর্ধমান আগ্রহ কেবলই কোনো সাময়িক ফ্যাশন, ট্রেন্ড বা বিলাসিতা নয়।
হেনা শিকদার
দর্শন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
