বিনিয়োগ বাড়াতে ও পণ্যের দাম কমাতে অতিরিক্ত কর শুল্কের বোঝা হ্রাস করা হোক
মুহাম্মদ জামাল উদ্দিন
প্রকাশ : ০২ জুলাই ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
বর্তমান বাংলাদেশে ব্যবসা বানিজ্যে প্রধান প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে উচ্চ করহার ও জটিল কর কাঠামো। পণ্যের কাঁচামাল আমদানি থেকে উৎপাদন এবং বিপণনের প্রতিটি ধাপে অতিরিক্ত কর-শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। যেখানে করনীতি ও কর-কাঠামো হওয়া উচিত ছিল ব্যবসাবান্ধব, সেখানে বাংলাদেশের করনীতি শোষণমূলক।
উচ্চ করহারের কারনে একদিকে দ্রব্যমূল্যের দাম মারাত্মক হারে বাড়ছে, অন্যদিকে দেশি-বিদেশী বিনিয়োগের হার দিন দিন কমে যাচ্ছে। ব্যবসা বানিজ্যে অতিরিক্ত কর-শুল্ক আরোপের প্রভাব পড়ছে গরীব-মধ্যবিত্ত শ্রেণির উপর। দক্ষিণ এশিয়ায় প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের গড় আমদানি শুল্ক ও কর্পোরেট করহার দুটোই বেশি। একই সঙ্গে সুষ্ঠ নীতি ও পরিকল্পনার অভাব, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, উচ্চ সুদের হার, বিনিয়োগ পরিবেশ, বন্দর-কাস্টমণ্ডআয়কর অফিসের ঘুষ দুর্নীতি বিনিয়োগকারীদের দ্বিগুন যন্ত্রণা বাড়িয়ে দিয়েছে। বিদ্যমান এমন পরিস্থিতির জন্য বর্তমান সরকার কোনভাবেই দায়ী নয়। অতীতের সরকারের ভূলের খেসারত দিতে হচ্ছে পুরো জাতিকে। বিশ্ব বানিজ্য সংস্থা ডব্লিউটিও এর তথ্যমতে, বাংলাদেশের গড় শুল্কহার ১৪ দশমিক ১ শতাংশ। রপ্তানি খাতে প্রধান প্রতিযোগী ভিয়েতনামের গড় শুল্কহার ৯ দশমিক ৪ শতাংশ। আর লাউসের ৮.৭ শতাংশ, পাকিস্তানের ১০.৩ শতাংশ, শ্রীলঙ্কার ৮.৪ শতাংশ। অন্যদিকে, বাংলাদেশের নন-লিস্টেড কোম্পানির করহারও অনেক বেশি। বাংলাদেশের কর্পোরেট করহার ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ। যেখানে ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, লাউসের ২০ শতাংশ। আর ভারতের ২৫ শতাংশ। এ জন্য বিদেশি বিনিয়োগে আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রে ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, লাউস দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর চেয়ে এগিয়ে রয়েছে। বিগত কয়েক বছর যাব দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি জনজীবনে স্থবিরতা নেমে এসেছে। প্রতিদিন অসহনীয় দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির চাপে পিষ্ট হচ্ছে গরীব ও মধ্যবিত্ত মানুষ। একদিকে মূল্যস্ফীতির চাপ অন্যদিকে ২৭.৫ শতাংশ কর্পোরেট করহার মরার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে দাড়িয়েছে। মূল্যস্ফীতি যেখানে ১০ শতাংশ বেড়েছে, সেই তুলনায় মানুষের আয় ও বেতন বাড়েনি। ২০২৬-২৭ সালের বাজেটে ব্যক্তিগত করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকায় উন্নিত করা হলেও নতুন কর কাঠামোর কারনে চাকুরিজীবী, পেশাজীবি ও মধ্যবিত্ত করদাতাদের একটি বড় অংশকে আগের তুলনায় বেশি কর প্রদান করতে হবে। অর্থাৎ, করযোগ্য আয়ের উপর করের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা হয়েছে। এই পরবর্তনের সবছেয়ে বড় প্রভাব পড়বে বেসরকারি চাকরিজীবি ও মধ্যবিত্ত পরিবারের উপর কারন দেশের অধিকাংশ বেতনভোগী কর্মচারী এমনিতেই উচ্ছ মূল্যস্ফীতি, বাসা ভাড়া বৃদ্ধি, পরিবারের ভরণপোষণ খরচ বৃদ্ধি, শিক্ষা ও চিকিৎসা খরচ বৃদ্ধি এবং নিত্যপন্যের মূল্য বৃদ্ধি জনিত কারনে আর্থিক চাপে রয়েছেন।
বাংলাদেশে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির অন্যতম কারন হচ্ছে অতিরিক্ত কর-শুল্কের প্রভাব। বিগত হাসিনা সরকারের সময়ে ব্যবসায়ী শিল্পপতিরা বাজারে একচেটিয়া প্রভাব বিস্তারের কারনে জিনিসপত্রের দাম কয়েকদফা বৃদ্ধি পেয়েছে। দীর্ঘদিন যাবৎ একশ্রেণির বুর্জোয়া মাফিয়া ব্যবসায়ীরা সরকারের সঙ্গে যুগসাজসে বাজারে একছত্র আধিপত্য বিস্তারের মাধ্যমে ইচ্ছামত দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। দাম কমাতে মাঝেমধ্যে সরকার বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের মূল্য নির্ধারণ করে দেওয়া হলেও ব্যবসায়ীরা সেদিকে কর্ণপাত না করে উল্টো আরও কয়েকগুন মূল্য বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে জনগনকে কর-শুল্কের চাপ ও মুনাফা খোরদের অতিরিক্ত মুনাফার চাপ মোকাবেলা করতে হচ্ছে। দেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণি অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি।
এই শ্রেণীর উপর অতিরিক্ত করের চাপ সৃষ্টি হলে তাদের ভোগ ক্ষমতা, সঞ্চয় ও বিনিয়োগ কমে যেতে পারে। যা সামগ্রিক অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলবে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম কমাতে সরকার সামান্য পরিমাণ কর ছাড় দিয়েছে। কর ছাড় দিয়ে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের মূল্য স্বাভাবিক রাখার উদ্যোগ নিলেও বাজারে তার প্রভাব কতটুকু কার্যকর হবে তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। যেহেতু বিগত সময়ে সরকার নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যে কর ছাড় দিলেও তার প্রভাব বাজারে প্রতিফলিত হয়নি। বরং বড় বড় ব্যবসায়ীরা কর ছাড়ের সুবিধা নিয়ে জিনিসপত্রের মূল্য আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। বর্তমানে দেশে বিনিয়োগে চরম মন্দা বিরাজ করছে। আর এই মন্দার প্রভাব পুরো অর্থনীতিতে পড়ছে। অর্থনীতি এখন খাদের কিনারায়। বর্তমান ব্যবসা-বানিজ্যে প্রধান প্রতিবন্ধকতা উচ্চ করহার ও জটিল করকাঠামো। অতিরিক্ত আগাম কর, অগ্রিম আয়কর, উৎস কর, মূসক ও শুল্ক আরোপ করার ফলে এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এই অতিরিক্ত কার্যকর করহার হিসাব করলে ৪৫-৪৮ শতাংশে দাঁড়ায়। এত বেশি পরিমাণ কর দিয়ে দেশি-বিদেশি কোনো বিনিয়োগকারী বিনিয়োগে আগ্রহী হবে না। কারণ অতিরিক্ত কর আরোপের ফলে উৎপাদন খরচ কয়েকগুন বৃদ্ধি পেয়েছে। বিএনপি সরকারকে বিনিয়োগ বাড়াতে হলে বাড়তি কর ও সুদের হার কমাতে হবে। উচ্চকর ও ১৪-১৫ শতাংশ সুদে ঋন নিয়ে কোনো উদ্যোক্তা বিনিয়োগে আগ্রহী হবে না। নতুন সরকার বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির ঘোষণা দিয়েছেন। সরকারের বিদ্যমান নীতিকাঠামো এবং উচ্চ করহার বজায় থাকলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়বে না। আমাদের করনীতি এমনভাবে সাজাতে হবে যাতে নতুন ব্যবসা, নতুন ধারণা এবং নতুন উদ্যোক্তা এগিয়ে আসতে পারে। বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উদ্যোক্তার বিকাশ এবং কর শুল্ক কমিয়ে উৎপাদনশীল খাতের সম্প্রসারণের মাধ্যমে অর্থনীতিকে আরও গতিশীল ও শক্তিশালী করে গড়ে তুলতে হবে। যেখানে প্রবৃদ্ধির চালিকা শক্তি হবে বেসরকারি খাত এবং তরুণ ও নারীদের জন্য সৃষ্টি করতে নতুন সম্ভাবনার ক্ষেত্র।
চলতি অর্থবছরের বাজেটে মোট ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা ঘাটতি বাজেট রয়েছে। সরকারের প্রধান আয়ের উৎস রাজস্ব খাত হলেও চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে শুল্ক ও কর আদায়ে ঘাটতি ১ লাখ কোটি টাকার বেশি হয়েছে। ব্যবসা বানিজ্যে মন্থরতা ও আমদানি কমে যাওয়ায় রাজস্ব আহরণ প্রত্যাশিত হারে বাড়ছে না। এই বাজেট ঘাটতি দূর করতে নতুন সরকারকে রাজস্ব আয় বাড়াতে হবে, আবার জিনিসপত্রের মূল্যও কমাতে হবে। রাজস্ব আয় বাড়াতে নতুন করে কর-শুল্ক না বাড়িয়ে বিকল্প পন্থা অবলম্বন করতে হবে। সরকারের এই মুহূর্তে উচিত হবে, নতুন করদাতা অন্তর্ভুক্ত করা,কর-শুল্ক ফাঁকি কমানো এবং রাজস্ব আহরনে জড়িত কর্মকর্তাদের ঘুষ-দুর্নীতি বন্ধ করা। পাশাপাশি বিগত আওয়ামিলীগ সরকারের সময়ে আরোপিত অতিরিক্ত কর-শুল্ক কমিয়ে জনসাধারণকে স্বস্তি দেওয়া।
মুহাম্মদ জামাল উদ্দিন
প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট (পটিয়া, চট্টগ্রাম)
