প্রবীণরা সমাজের বোঝা নয়
নুসরাত সুলতানা
প্রকাশ : ০৩ জুলাই ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

একটা সময় সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য ব্যাপক অবদান রাখা ব্যক্তি যখন বয়সের ভারে কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলে, তখন সমাজে তার মূল্য থাকে না। সামাজিক মন-মানসিকতা এমন হয়ে গেছে বৃদ্ধ ব্যক্তি থাকা মানেই তার জন্য বাড়তি খরচ, সে পরিবারের বোঝা। অথচ এই বৃদ্ধ ব্যক্তি একসময় তার শ্রম, মেধা আর কাজ দিয়ে গড়ে তুলেছে পরিবার, সমাজ আর সভ্যতা।
বার্ধক্য মানুষের জীবনে একটা স্বাভাবিক পরিণতি। বার্ধক্যের সংজ্ঞা সম্পর্কে বিভিন্ন মতামত রয়েছে। তবে শারীরিক, মানসিক, আচরণগত, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দিক বিবেচনায় জরা বিজ্ঞানীরা মূলত বয়সের মাপকাঠিতে বার্ধক্যকে চিহ্নিত করেছেন। বিশ্বের শিল্পোন্নত দেশসমূহে ৬৫ বছর বয়সী ব্যক্তিদের প্রবীণ হিসেবে বিবেচনা করা হলেও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এবং জাতিসংঘ ঘোষণা অনুযায়ী বাংলাদেশে ৬০ বছর এবং তদূর্ধ্ব বয়সী ব্যক্তিদের প্রবীণ বলে অভিহিত করা হয়।
বিজ্ঞান আর প্রযুক্তির বিকাশে উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রসার হচ্ছে।
এতে মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু আয়ু বাড়লেও চাকরির নির্দিষ্ট সময়সীমা রয়েছে ঐ সময়ের পর আর তার উপার্জন করার সুযোগ নেই। বিশেষ করে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য। আর দিনমজুরদের শারীরিক সক্ষমতার উপর ভিত্তি করে কাজ করে থাকেন। তারপরও সঠিক পরিচর্যা, খাদ্যাভ্যাস আর প্রবীণদের জন্য সঠিক পরিকল্পনার অভাবে একটা বয়সে গিয়ে তাদের সমাজের বোঝা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বাংলাদেশে যেহেতু প্রবীণের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে তাই প্রবীণের আর্থ-সামাজিক অবস্থা ও জীবনমান উন্নয়নে এখনই সময় সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা।
বাংলাদেশে ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী প্রবীণ মানুষের সংখ্যা প্রায় ২ কোটি, যা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১১ শতাংশ। চিকিৎসা ও জীবনমানের উন্নতির ফলে দেশে প্রবীণদের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে প্রতি পাঁচজনে একজন হবেন প্রবীণ। ক্রমবর্ধমান এ জনসংখ্যাতাত্ত্বিক রূপান্তর ব্যক্তি, সমাজ, জাতীয় ও আর্থ-সামাজিক জীবনে মারাত্মকভাবে প্রভাব ফেলবে। কারণ প্রবীণ ব্যক্তিরা বার্ধক্যজনিত নানা সমস্যায় ভোগেন এবং বার্ধক্য বর্তমান বিশ্বের একটি অন্যতম সমস্যা হিসাবে চিহ্নিত। আমাদের সমাজে বয়স্ক ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি যে সমস্যার সম্মুখীন হন তা হলো অর্থনৈতিক। বৃদ্ধ বয়সে উপার্জন করতে না পারার কারণে পরনির্ভরশীলতা বৃদ্ধি পায় আর এতেই তারা হয়ে উঠে পরিবারের বোঝা। বয়স্কদের ওষুধ, খাওয়া, পরিচর্যার জন্য অর্থের যেমন প্রয়োজন তেমনি প্রয়োজন শ্রমের।
শিল্পায়ন আর নগরায়ণের এই যুগে স্বামী-স্ত্রী দুইজনেই চাকরি করায় তারা বৃদ্ধ বাবা-মাকে সময় দিতে পারেন না। একক পরিবার বিস্তারের ফলে গ্রামে বৃদ্ধ বাবা-মাকে রেখে শহরে চলে যান অনেকে। আমাদের দেশে বয়স্কদের এমন অবস্থায় গিয়ে পৌঁছেছে, বাবা-মা মারা গিয়ে পচে দুর্গন্ধ বের হলে প্রতিবেশী থেকে খবর পাচ্ছে। যাদের বেশি টাকা আছে উনারা অনেকে বৃদ্ধ বাবা-মাকে রেখে আসেন বৃদ্ধাশ্রমে। অনেক বৃদ্ধ বাবা-মা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনে শিকার হন, যা আমাদের জন্য সত্যি লজ্জাজনক।
আমাদের দেশের পরিবার কাঠামো এমন ছিল না। পরিবারের সকল সদস্য একে অপরের সাথে দৃঢ় বন্ধনে আবদ্ধ ছিল। একান্নবর্তী পরিবারের শিশু এবং বয়স্করা সুন্দর জীবনযাপন করত। সামজিক মূল্যবোধ আর পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ছিল অনেক। এই পারিবারিক মূল্যবোধ কমে যাচ্ছে। আমরা আধুনিকতার ছোঁয়ায় ভুলে যাই আমাদের আধুনিক করতে কার অবদান বেশি। বৃদ্ধ অবস্থায় পিতা-মাতাকে সন্তানের কাছ থেকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য ২০১৩ সালে ‘পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন’ প্রণয়ন করে সরকার। এই আইনে বলা হয়েছে, কোন সন্তান তার পিতা-মাতাকে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোন বৃদ্ধ নিবাস বা অন্য কোথাও আলাদাভাবে বসবাস করতে বাধ্য করতে পারবে না। পিতা-মাতার জন্য ভরণ-পোষণ এবং চিকিৎসা ব্যয় মেটানোর বাধ্যবাধকতা রয়েছে, এই আইনে। যদি সন্তানরা এসব দায়িত্ব পালন না করে তাহলে সেটি অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হবে। সেক্ষেত্রে এক লাখ টাকা জরিমানা অথবা ৩ মাসের কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। আইন অনুযায়ী পিতা-মাতা আইনের আশ্রয় নিতে পারবে। বৃদ্ধদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে বয়স্ক ভাতা চালু করা হয়। কিন্তু এসব পদক্ষেপ বৃদ্ধদের জীবনমান উন্নয়নে সহায়ক হবে না যদি আমরা আমাদের মানবিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ জাগ্রত না করি। বয়স্কদের প্রতি আমাদের যে দৃষ্টিভঙ্গি তা পরিবর্তন করতে হবে। একক পরিবার গঠন করে বয়স্কদের বাদ দেওয়া যাবে না, বরং পারিবারিক মূল্যবোধ জাগ্রত করতে হবে। পরিবারের ছোট থেকে পারিবারিক বন্ধনের গুরুত্ব উপলব্ধি করাতে হবে।
এছাড়া যেহেতু মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি পা”ে, তাই শুধু বেঁচে থাকাকে প্রাধান্য না দিয়ে কীভাবে সুস্থ স্বাবলম্বী হয়ে বেঁচে থাকা যায়, সেদিকে প্রাধান্য দিতে হবে। শারীরিক সক্ষমতা অনুসারে বয়স্কদের কাজের সুযোগ সৃষ্টি করা যাতে, তারা পরনির্ভরশীল হতে না হয়। আবার শুধু অর্থ উপার্জন করতে পারছে না বলে একজনকে অবহেলা করব, এমন মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে।
আমাদের মনে রাখতে হবে আমরাও একসময় প্রবীণ হব, আমরা যদি এখনই প্রবীণদের অবস্থা উন্নতি করতে না পারি, তবে আমরাও বৃদ্ধ বয়সে কষ্ট ভোগ করতে হবে। তাই প্রবীণকে বোঝা মনে না করে তাদের যত্নে মনোযোগী হতে হবে।
নুসরাত সুলতানা
শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
