সাইবার নিরাপত্তা : আধুনিক বিশ্বের নতুন যুদ্ধক্ষেত্র
আতিক হাসান তন্ময়
প্রকাশ : ০৩ জুলাই ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

একসময় যুদ্ধ মানেই ছিল ভারী অস্ত্র, ট্যাংক, যুদ্ধবিমান, সহস্রাধিক সৈন্য এবং ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ। যুদ্ধক্ষেত্র ছিল সীমান্ত, সমুদ্র কিংবা আকাশ। কিন্তু প্রযুক্তিনির্ভর বর্তমান বিশ্বে যুদ্ধের সংজ্ঞা এবং চরিত্র দুটোই আমূল বদলে গেছে। এখন যুদ্ধের ময়দান আর শুধু ভৌগোলিক সীমারেখায় সীমাবদ্ধ নয়; এটি বিস্তৃত হয়েছে ভার্চুয়াল জগতে। বন্দুকের গুলির পরিবর্তে এখন ব্যবহৃত হচ্ছে মাউসের একটি ক্লিক, কিবোর্ডের কয়েকটি কমান্ড কিংবা ক্ষতিকর সফটওয়্যারের কোড। এই নতুন যুদ্ধের নাম- সাইবার যুদ্ধ, আর এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হলো সাইবার নিরাপত্তা।
প্রচলিত যুদ্ধে আক্রমণকারী ও আক্রান্ত উভয় পক্ষই দৃশ্যমান থাকে, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও সহজে অনুমান করা যায়। কিন্তু সাইবার যুদ্ধে প্রতিপক্ষ অধিকাংশ সময়ই অদৃশ্য। একজন দক্ষ হ্যাকার হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে বসেই একটি দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ সরবরাহ, যোগাযোগ নেটওয়ার্ক কিংবা সামরিক অবকাঠামোকে অচল করে দিতে পারে। অনেক ক্ষেত্রেই এসব হামলার পেছনে থাকে রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ পৃষ্ঠপোষকতা, আবার কখনও থাকে সংঘবদ্ধ অপরাধচক্র বা আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার উদ্দেশ্যে পরিচালিত গোষ্ঠী। তথ্য চুরি, সার্ভার অচল করে দেওয়া, র্যানসমওয়্যার হামলা, পরিচয় চুরি কিংবা গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ধ্বংস- সবই আজ সাইবার যুদ্ধের পরিচিত কৌশল।
বিশ্ব এরইমধ্যে একাধিক বড় সাইবার হামলার সাক্ষী হয়েছে। ২০০৭ সালে এস্তোনিয়ায় ‘ব্রোঞ্জ সোলজার’ স্মৃতিস্তম্ভ স্থানান্তরকে কেন্দ্র করে দেশটির সরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, সংবাদমাধ্যম এবং ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর ব্যাপক ডিস্ট্রিবিউটেড ডিনায়াল অব সার্ভিস (উউড়ঝ) হামলা চালানো হয়। এতে দীর্ঘ সময় ধরে দেশের গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল অবকাঠামো কার্যত অচল হয়ে পড়ে। এই ঘটনার পরই উত্তর আটলান্টিক জোট (ঘঅঞঙ) উপলব্ধি করে যে ভবিষ্যতের যুদ্ধ শুধু স্থল, নৌ কিংবা আকাশে সীমাবদ্ধ থাকবে না; সাইবার স্পেসও হবে একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধক্ষেত্র। সেই উপলব্ধি থেকেই ২০০৮ সালে এস্তোনিয়ার রাজধানী তাল্লিনে প্রতিষ্ঠিত হয় ন্যাটোর কো-অপারেটিভ সাইবার ডিফেন্স সেন্টার অব এক্সিলেন্স (ঈঈউঈঙঊ)।
২০১০ সালে বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত সাইবার অস্ত্র স্টাক্সনেট (Stxunet) ইরানের নাতাঞ্জ পারমাণবিক স্থাপনায় আঘাত হানে। এই কম্পিউটার ওয়ার্ম ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণে ব্যবহৃত সেন্ট্রিফিউজগুলোর কার্যক্রম নষ্ট করে দেয় এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে অন্তত দুই বছর পিছিয়ে দেয়। একই সঙ্গে দুই লক্ষাধিক কম্পিউটার সংক্রমিত হয়। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে একটি সফটওয়্যারও কখনও কখনও ক্ষেপণাস্ত্রের মতোই বিধ্বংসী হতে পারে।
বাংলাদেশও সাইবার অপরাধের বড় শিকার হয়েছে। ২০১৬ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে আন্তর্জাতিক অর্থ স্থানান্তর ব্যবস্থা সুইফট (ঝডওঋঞ)-এর দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে প্রায় ১০ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার চুরির ঘটনা দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় আর্থিক সাইবার হামলা হিসেবে বিবেচিত হয়। এর একটি অংশ শ্রীলঙ্কা ও ফিলিপাইনে স্থানান্তর করা হয়। এই ঘটনা শুধু আর্থিক ক্ষতিই নয়, বাংলাদেশের সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতাও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্পষ্ট করে তোলে।
২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম জ্বালানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান কলোনিয়াল পাইপলাইন র্যানসমওয়্যার হামলার শিকার হলে কয়েক দিনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চলের জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হয়। আতঙ্কে মানুষ অতিরিক্ত জ্বালানি মজুত করতে শুরু করে এবং জ্বালানির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠানটি মুক্তিপণ হিসেবে বিপুল পরিমাণ বিটকয়েন পরিশোধ করতে বাধ্য হয়। এই ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে, একটি সফল সাইবার হামলা শুধু কম্পিউটার নয়, একটি দেশের অর্থনীতি ও জনজীবনকেও বিপর্যস্ত করে দিতে পারে।
বাংলাদেশ বর্তমানে স্মার্ট বাংলাদেশের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। সরকারি সেবা, ব্যাংকিং, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং ব্যবসা-বাণিজ্য ক্রমেই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মনির্ভর হয়ে উঠছে। এই পরিবর্তন যেমন নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে, তেমনি বাড়িয়েছে সাইবার ঝুঁকিও। নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য, আর্থিক লেনদেন, সরকারি ডাটাবেজ এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো এখন প্রতিনিয়ত সাইবার আক্রমণের সম্ভাবনার মুখোমুখি। আধুনিক বিশ্বে তথ্যই সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। তাই এই সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্র- সবারই সমান দায়িত্ব।
ব্যক্তিগত পর্যায়েও সাইবার নিরাপত্তার গুরুত্ব ক্রমাগত বাড়ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট হ্যাকিং, ফিশিং, অনলাইন আর্থিক প্রতারণা, পরিচয় চুরি, ব্ল্যাকমেইলিং এবং ডিপফেক প্রযুক্তির অপব্যবহার এখন উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। বিশেষ করে নারীরা ডিপফেক প্রযুক্তির মাধ্যমে হয়রানি ও মানহানির শিকার হচ্ছেন। প্রযুক্তির ব্যবহার যত দ্রুত বাড়ছে, নিরাপদ ব্যবহারের সংস্কৃতি বা ‘সাইবার হাইজিন’ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আমরা ততটা এগোতে পারিনি। অথচ একটি অসতর্ক ক্লিক, দুর্বল পাসওয়ার্ড কিংবা অচেনা লিংকে প্রবেশই একজন ব্যবহারকারীকে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে ফেলতে পারে।
সাইবার হামলা প্রতিরোধের প্রথম শর্ত হলো সচেতনতা। ফিশিং বার্তা শনাক্ত করার সক্ষমতা, শক্তিশালী ও আলাদা পাসওয়ার্ড ব্যবহার, টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন চালু রাখা এবং নিয়মিত সফটওয়্যার আপডেট করার মতো অভ্যাস অনেক সাইবার ঝুঁকি প্রতিরোধ করতে পারে। তবে শুধু ব্যক্তিগত সচেতনতাই যথেষ্ট নয়। রাষ্ট্রকে সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ে ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে, শিক্ষা ব্যবস্থায় ডিজিটাল নিরাপত্তা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে এবং ডিপফেক, সাইবার ব্ল্যাকমেইল ও অনলাইন প্রতারণার মতো অপরাধের বিরুদ্ধে দ্রুত ও কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
স্মার্ট বাংলাদেশের স্বপ্ন তখনই বাস্তবে রূপ নেবে, যখন আমাদের ডিজিটাল অবকাঠামোও হবে নিরাপদ, শক্তিশালী ও স্থিতিশীল। কারণ একটি সফল সাইবার হামলা মুহূর্তের মধ্যেই বহু বছরের উন্নয়নকে প্রশ্নবিদ্ধ করে দিতে পারে। তাই সরকারি ও বেসরকারি সব খাতে সাইবার নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। একই সঙ্গে দক্ষ সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ এবং ‘হোয়াইট হ্যাট হ্যাকার’ তৈরিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, যারা সম্ভাব্য দুর্বলতা শনাক্ত করে দেশের ডিজিটাল অবকাঠামোকে আগাম সুরক্ষিত রাখতে পারবেন।
ভবিষ্যতের যুদ্ধ শুধু সীমান্তে হবে না; তা হবে ডেটা, তথ্য এবং ডিজিটাল অবকাঠামোকে ঘিরেও। যে রাষ্ট্র তার সাইবার নিরাপত্তাকে শক্তিশালী করতে পারবে, সেই রাষ্ট্রই আগামী বিশ্বের প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকবে। তাই সাইবার নিরাপত্তা এখন আর শুধু প্রযুক্তিগত বিষয় নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষার অন্যতম প্রধান ভিত্তি।
আতিক হাসান তন্ময়
শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
