প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে কৌশলগত সাফল্য বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনার দুয়ার

জুবাইয়া বিন্তে কবির

প্রকাশ : ০৪ জুলাই ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এমন কিছু সফর থাকে, যার মূল্য শুধু কতটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হলো বা কত বিলিয়ন ডলারের ঋণ ঘোষণা এল- সেই হিসাব দিয়ে নির্ধারণ করা যায় না।

বরং একটি সফল রাষ্ট্রীয় সফরের প্রকৃত মূল্যায়ন করতে হয়, সেটি ভবিষ্যতের কূটনৈতিক সম্পর্ক, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, আঞ্চলিক অবস্থান এবং জাতীয় স্বার্থকে কতটা শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে পারল, সেই দৃষ্টিকোণ থেকে। প্রধানমন্ত্রী দেশনায়ক তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফর ঠিক তেমনই একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক মাইলফলক, যা বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। সরকার গঠনের পর এটিই ছিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর। প্রথমে মালয়েশিয়া এবং পরে চীনের রাষ্ট্রীয় সফর দুটি দেশই বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদার। এই সফরের মধ্য দিয়ে সরকার স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি হবে ভারসাম্যপূর্ণ, বাস্তববাদী এবং জাতীয় স্বার্থকেন্দ্রিক।

চীন সফরের সবচেয়ে বড় অর্জন নিঃসন্দেহে দুই দেশের যৌথ ঘোষণাপত্র। সেখানে বাংলাদেশ ও চীন তাদের বিদ্যমান ‘সমন্বিত কৌশলগত সহযোগিতামূলক অংশীদারত্ব’ আরও বিস্তৃত করে ‘নতুন যুগের চীন-বাংলাদেশ অভিন্ন ভবিষ্যতের সম্প্রদায়’ গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে।

আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এ ধরনের ভাষা শুধু আনুষ্ঠানিক সৌজন্য নয়; বরং ভবিষ্যতের দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার রাজনৈতিক অঙ্গীকার বহন করে। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, সফরে বড় কোনো ঋণ বা বিনিয়োগ ঘোষণা হয়নি। কিন্তু আধুনিক বিশ্বে কৌশলগত সম্পর্কের গুরুত্ব অর্থনৈতিক ঘোষণার চেয়েও অনেক বেশি। কারণ বড় বিনিয়োগ তখনই আসে, যখন দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক আস্থা, নীতিগত স্থিতিশীলতা এবং দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব নিশ্চিত হয়। সেই ভিত্তি তৈরির কাজই এই সফরে সম্পন্ন হয়েছে। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের অন্যতম সফল সফর এটি। তাঁর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, চীন এখন শুধু একটি সরকারের সঙ্গে নয়, বাংলাদেশের জনগণ, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান এবং দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় সম্পর্কের ভিত্তিতে সহযোগিতা গড়ে তুলতে আগ্রহী। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভাষায় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পরিবর্তন। সফরের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন অর্থনৈতিক করিডোর প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব। দীর্ঘদিন আগে বিসিআইএম (বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার) করিডোরের আলোচনা শুরু হলেও বিভিন্ন ভূরাজনৈতিক কারণে তা বাস্তবায়িত হয়নি। এবার ভারতকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন সংযোগের নতুন সম্ভাবনা সামনে এসেছে।

এই করিডোর বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বহুমাত্রিক পরিবর্তন আসতে পারে। চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বারে পরিণত হতে পারে। বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের বিশাল বাজারে দ্রুত প্রবেশের সুযোগ পাবেন। সড়ক, রেলপথ, সমুদ্রবন্দর, লজিস্টিকস এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে নতুন বিনিয়োগ আসবে।

পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে এবং বাংলাদেশ আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থার অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারবে। বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, আঞ্চলিক যোগাযোগ বৃদ্ধি পেলে বাণিজ্য ব্যয় ১৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব। বাংলাদেশ যদি এই করিডোরের কার্যকর অংশ হতে পারে, তবে রপ্তানি বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং শিল্পায়নের গতি আরও ত্বরান্বিত হবে।

এই করিডোরের সঙ্গে রোহিঙ্গা সংকটেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। কারণ প্রকল্পটির একটি অংশ মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের ওপর দিয়ে যাবে। সেখানে স্থিতিশীলতা ছাড়া কোনো বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। ফলে চীনের অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের প্রয়োজনীয়তা এখন এক নতুন বাস্তবতায় এসে মিলিত হয়েছে। এ কারণে ভবিষ্যতে মিয়ানমারের ওপর চীনের কূটনৈতিক প্রভাব আরও সক্রিয় হতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

সফরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হলো বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে ‘টু প্লাস টু’ কৌশলগত সংলাপ চালুর উদ্যোগ। অর্থাৎ দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী পর্যায়ে নিয়মিত কাঠামোগত সংলাপ অনুষ্ঠিত হবে।

আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এই ধরনের সংলাপ সাধারণত সেই দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত হয়, যাদের কৌশলগত গুরুত্ব বিশেষভাবে স্বীকৃত। বাংলাদেশের ভূ-কৌশলগত অবস্থান দিন দিন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক সামুদ্রিক অর্থনীতি, ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বাণিজ্যপথ এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ এখন বৈশ্বিক শক্তিগুলোর বিশেষ আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু।

যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল, চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগ, জাপানের মুক্ত ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক ধারণা—সব ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

তিস্তা মহাপরিকল্পায় চীনের সহযোগিতার প্রতিশ্রুতিও সফরের অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ দিক। দীর্ঘদিন ধরে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি অমীমাংসিত থাকায় উত্তরাঞ্চলের লাখো মানুষ সেচ সংকট, নদীভাঙন এবং শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাবে ভুগছেন। যৌথ ঘোষণাপত্রে চীন সম্ভাব্যতা যাচাই দ্রুত সম্পন্ন করা এবং নিজেদের সক্ষমতা অনুযায়ী প্রকল্প বাস্তবায়নে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে। যদিও এখনও আনুষ্ঠানিক অর্থায়ন ঘোষণা হয়নি, তবুও রাজনৈতিক পর্যায়ে এই প্রতিশ্রুতি ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক।

এছাড়া কৃষি, শিল্প, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ডিজিটাল প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, গণমাধ্যম, সংস্কৃতি, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং সামুদ্রিক অর্থনীতিসহ বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়ে দুই দেশ একমত হয়েছে। মোট ১৭টি সমঝোতা স্মারক ও সহযোগিতা দলিল স্বাক্ষর প্রমাণ করে যে, ঢাকা-বেইজিং সম্পর্ক এখন আর শুধু অবকাঠামো উন্নয়নেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং বহুমাত্রিক অংশীদারত্বের দিকে এগোচ্ছে। তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে বাংলাদেশের নিজস্ব সক্ষমতা বাড়ানোই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। অতীতে বহু আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক জটিলতা, প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা এবং দক্ষতার অভাব বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমদের মন্তব্য তাই অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক শুধু চুক্তি করলেই হবে না, সেগুলোর যথাযথ বাস্তবায়ন, রক্ষণাবেক্ষণ এবং সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল দর্শন ‘সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’ বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। চীনের সঙ্গে সম্পর্ক যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গেও ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা সমান প্রয়োজন। কারণ বহুমাত্রিক কূটনীতিই আজকের বিশ্বের সবচেয়ে কার্যকর কৌশল। জননন্দিত প্রধানমন্ত্রী দেশনায়ক তারেক রহমানের এই সফর প্রমাণ করেছে, বাংলাদেশ শুধু উন্নয়ন সহযোগিতা গ্রহণকারী রাষ্ট্র হিসেবেই নয়, বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক অংশীদার হিসেবেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। কৌশলগত অবস্থান, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এবং আঞ্চলিক সংযোগ এই তিন শক্তিকে কাজে লাগাতে পারলে আগামী দশকে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। পরিশেষে, এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই সফরে অর্জিত রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং কৌশলগত সমঝোতাগুলো যেন দ্রুত বাস্তব প্রকল্পে রূপ নেয়। কারণ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, সফল কূটনীতির প্রকৃত মূল্যায়ন ঘোষণাপত্রে নয়, বাস্তবায়নে। যদি এই প্রতিশ্রুতিগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে জননন্দিত প্রধানমন্ত্রী তারুণ্যের অহংকার তারেক রহমানের চীন সফর ভবিষ্যতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

জুবাইয়া বিন্তে কবির

অর্থনীতিবিদ, গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট