সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম : নৈতিক অবক্ষয়ের অদৃশ্য কারখানা
ইব্রাহীম ইবনে আজিজ
প্রকাশ : ০৫ জুলাই ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলাদেশে গত এক দশকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম মানুষের জীবনযাত্রাকে আমূল বদলে দিয়েছে। একসময় যোগাযোগের জন্য যেখানে চিঠি, টেলিফোন কিংবা সামনাসামনি সাক্ষাতের ওপর নির্ভর করতে হতো, সেখানে আজ একটি স্মার্টফোনই পুরো পৃথিবীকে হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে। ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক, ইনস্টাগ্রাম, মেসেঞ্জার এবং হোয়াটসঅ্যাপ এখন শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এগুলো মানুষের সংবাদ জানার উৎস, বিনোদনের কেন্দ্র, ব্যবসার প্ল্যাটফর্ম, রাজনৈতিক মত প্রকাশের ক্ষেত্র এবং ব্যক্তিগত পরিচয় গঠনের অন্যতম মাধ্যম। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই প্রযুক্তি কি শুধু আমাদের জীবনকে সহজ করেছে, নাকি অদৃশ্যভাবে আমাদের নৈতিক ভিত্তিকেও দুর্বল করে দিচ্ছে? বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতা বলছে, প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে আমরা অনেক ক্ষেত্রেই মানবিকতা, শালীনতা, সততা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার মতো মৌলিক মূল্যবোধ হারিয়ে ফেলছি। সংযোগ বেড়েছে, কিন্তু বিশ্বাস কমেছে; তথ্য বেড়েছে, কিন্তু প্রজ্ঞা বাড়েনি; বন্ধু বেড়েছে, কিন্তু আন্তরিক সম্পর্ক কমেছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো গুজব ও মিথ্যা তথ্যের বিস্তার । সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি ভুয়া ছবি, সম্পাদিত ভিডিও কিংবা ভিত্তিহীন তথ্য মুহূর্তের মধ্যেই লাখ লাখ মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। যাচাই না করেই মানুষ তা শেয়ার করে, মন্তব্য করে এবং অন্যদের বিভ্রান্ত করে। এতে শুধু একজন ব্যক্তি নয়, কখনও একটি পরিবার, একটি সম্প্রদায় কিংবা পুরো সমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সত্য জানার আগ্রহের চেয়ে আগে খবর ছড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতা আমাদের নৈতিক দায়িত্ববোধের বড় সংকটের পরিচয় বহন করে।
এরপর আসে ভাইরাল সংস্কৃতির উত্থান। আজ অনেক তরুণের কাছে সাফল্যের মানদণ্ড হয়ে উঠেছে কতজন তাকে দেখল, কতজন লাইক দিল কিংবা কতজন অনুসরণ করছে। এই মানসিকতা মানুষকে ধীরে ধীরে নৈতিকতার পরিবর্তে জনপ্রিয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ফলে অনেকেই অশোভন আচরণ, কৃত্রিম নাটক, বিপজ্জনক স্টান্ট, ব্যক্তিগত জীবনের প্রদর্শন কিংবা অন্যকে অপমান করেও আলোচনায় আসতে দ্বিধা করছেন না। জনপ্রিয়তার এই প্রতিযোগিতায় চরিত্রের মূল্য ক্রমশ কমে যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম চরিত্র হনন ও অনলাইন হয়রানিরও সহজ হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া, অপমানজনক মন্তব্য করা, মিথ্যা অভিযোগ ছড়ানো কিংবা কাউকে সামাজিকভাবে হেয় করার ঘটনা এখন প্রায় নিয়মিত। বিশেষ করে নারী ও তরুণীরা এই সমস্যার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী। একটি মিথ্যা পোস্ট একজন মানুষের বহু বছরের অর্জিত সম্মান মুহূর্তের মধ্যে নষ্ট করে দিতে পারে। অশালীন ও নিম্নমানের কন্টেন্টের বিস্তার আরেকটি গুরুতর সমস্যা। শিক্ষামূলক বা সৃজনশীল বিষয়বস্তুর চেয়ে অনেক সময় অশ্লীলতা, কৃত্রিম বিতর্ক কিংবা উসকানিমূলক ভিডিও বেশি জনপ্রিয় হয়। ফলে নতুন প্রজন্ম ধীরে ধীরে এমন একটি সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে, যেখানে ভদ্রতা, রুচিবোধ এবং নৈতিকতা বিনোদনের কাছে পরাজিত হচ্ছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে পরিবারের ওপরও। আগে পরিবারের সদস্যরা একসঙ্গে বসে গল্প করতেন, অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করতেন এবং সম্পর্ককে গভীর করতেন। এখন একই ঘরে বসেও সবাই আলাদা পর্দায় ব্যস্ত। বাবা-মা ও সন্তানের মধ্যে কথোপকথন কমছে, পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হচ্ছে এবং একাকিত্ব বাড়ছে। প্রযুক্তি মানুষকে কাছে এনেছে, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে হৃদয়ের দূরত্বও বাড়িয়ে দিয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ভোগবাদ ও প্রদর্শন বাদী সংস্কৃতিকেও উৎসাহিত করছে। মানুষ এখন নিজের জীবনকে অন্যের সাজানো জীবনের সঙ্গে তুলনা করছে। দামি পোশাক, বিলাসবহুল ভ্রমণ, ব্যয়বহুল জীবনযাপন কিংবা কৃত্রিম সুখের প্রদর্শন দেখে অনেক তরুণ নিজের জীবন নিয়ে হতাশ হয়ে পড়ছে। চরিত্র, জ্ঞান কিংবা সততার চেয়ে বাহ্যিক চাকচিক্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। আরেকটি উদ্বেগজনক দিক হলো সহমর্মিতা ও মানবিকতার অবক্ষয়। দুর্ঘটনা ঘটলে সাহায্য করার আগে অনেকেই ভিডিও ধারণ করেন। কারও ব্যক্তিগত কষ্ট, অসহায়ত্ব কিংবা দুর্ঘটনাকেও অনেক সময় কনটেন্টে পরিণত করা হয়। মানুষের দুঃখকে বিনোদন হিসেবে দেখার এই প্রবণতা একটি সমাজের নৈতিক অবক্ষয়ের স্পষ্ট লক্ষণ। এছাড়া অনলাইন প্রতারণা, ভুয়া বিনিয়োগ, পরিচয় চুরি, সাইবার ব্ল্যাকমেইল এবং আর্থিক জালিয়াতি উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। প্রযুক্তির সুযোগ নিয়ে অসাধু চক্র সাধারণ মানুষের সরলতাকে কাজে লাগাচ্ছে। অর্থনৈতিক ক্ষতির পাশাপাশি মানুষের পারস্পরিক বিশ্বাসও কমে যাচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নতুন প্রজন্ম। দীর্ঘ সময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসক্ত থাকার ফলে পড়াশোনায় মনোযোগ কমছে, ধৈর্য ও আত্মনিয়ন্ত্রণ দুর্বল হচ্ছে, বই পড়ার অভ্যাস হারিয়ে যাচ্ছে এবং গভীরভাবে চিন্তা করার ক্ষমতাও ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে। ক্ষণস্থায়ী বিনোদনের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা তাদের সৃজনশীলতা ও সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তিকে বাধাগ্রস্ত করছে। এই পরিস্থিতি যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ একটি জটিল সামাজিক সংকটের মুখোমুখি হতে পারে। এমন একটি সমাজ গড়ে উঠতে পারে, যেখানে সত্যের চেয়ে গুজব দ্রুত বিশ্বাসযোগ্য হবে, পারিবারিক সম্পর্ক আরও দুর্বল হবে, সামাজিক আস্থা কমে যাবে, অসহিষ্ণুতা ও বিদ্বেষ বাড়বে এবং নৈতিক নেতৃত্বের সংকট তীব্র হবে। তখন প্রযুক্তিগত উন্নয়ন থাকলেও সমাজে মানবিক মূল্যবোধ, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সামাজিক সংহতি ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়বে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি নৈতিক অবক্ষয় চলতে থাকলে একটি জাতির টেকসই উন্নয়নও প্রশ্নের মুখে পড়বে।
তবে এই সংকটের জন্য প্রযুক্তিকে এককভাবে দায়ী করা যায় না।
ইব্রাহীম ইবনে আজিজ
শিক্ষার্থী, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
