নদীর কিনারায় বইছে হতাশার হাওয়া

আবদুল কাদের জীবন

প্রকাশ : ০৫ জুলাই ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বর্ষাকাল চলছে। নদী পাড়ের মানুষজনের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে গেছে এতক্ষণে। কখন হঠাৎ কয়েকটি ঢেউ এসে ভেঙে দিয়ে যায় তাদের ভিটেমাটি। হয়তো বৃদ্ধরা গালে হাত দিয়ে ভাবছেন এই বয়সে আশ্রয় নিবেন কোথায়।

নদীর বাঁধ দেওয়ার ক্ষেত্রে ক্রমাগত দুর্নীতির কারণে টেকসই বাঁধ তৈরি হয়নি। স্থানীয় প্রভাবশালীরা রাষ্ট্রের টাকা আত্মসাৎ করে দুর্বল বাঁধ নির্মাণ করে, পরক্ষণেই ভেঙে পড়ে সেই বাঁধ। তলিয়ে যায় কৃষকের মাছের ঘের, ফসলের ক্ষেত, ভেঙে নিয়ে যায় ঘরবাড়ি। প্রান্তিক মানুষজন রাষ্ট্র থেকে তেমন কোনো সুযোগ-সুবিধা পায় না, তার একমাত্র কারণ স্থানীয় রাজনৈতিক বলয়। গ্রাম্য ভাষায় যাকে বলে, ‘মুখ দেখে খাতির করা’। শিক্ষা, চিকিৎসা ও যোগাযোগে পিছিয়ে নদীপাড়ের ও চর এলাকার মানুষজন। রাষ্ট্রের সুযোগ-সুবিধা তাদের দৌড় গোঁড়ায় পৌঁছায় না বললেই চলে। তারা ছোট্ট ঘর বেঁধে কোনোমতে আশ্রয় নেয়। শেষপর্যন্ত রাজনৈতিক ব্যক্তি বর্গের অবহেলায় তাদের মাথা রাখার জায়গাটুকু আগ্রাসী নদী কেঁড়ে নেয়। বর্ষাকালে অধিক বৃষ্টিপাতের কারণে নদীর পানি বৃদ্ধি পায়। স্রোতের গতিবেগ ও বৃদ্ধি পায়। তাই এই ঋতু আসলেই নদী পাড়ের মানুষজনের চোখে মুখে উৎকন্ঠা। কখন জানি ভেসে যায় তারা। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, বক্ষ্মপুত্রসহ প্রধান নদীগুল ভাঙনের শিকার হয়। দেশের ভূমিহীনদের ৫০ ভাগই নদী ভাঙনের শিকার। গবেষনা জানা যায় নদীভাঙনের কারনে একজন মানুষ গড়ে ২০ বার স্থান পরিবর্তন করে থাকেন। প্রতিবছর ৫-৬ হাজার হেক্টর জমি নদীভাঙনে বিলীন হয়ে যায়। নদী ভাঙনের ফলে এদেশে প্রতিবছর ২৫ কোটি ডলারের মতো লোকসান হয়। পদ্মা-বক্ষ্মপুত্র-মেঘনার অববাহিকায় ১২০০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। আরো ৫০০ কিলোমিটার এলাকায় নতুন করে ভাঙন দেখা দিতে পারে। স্বাধীনতার পর থেকে নদীভাঙনের শিকার হয়েছে প্রায় ৪০ লাখ মানুষ। প্রতিবছর প্রায় দেড় লাখ মানুষ নদী ভাঙ্গনের তাদের ভিটেমাটি হারায়। এবং প্রতিবছর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় দশ লাখ মানুষ। যেটি দেশের অর্থনীতির ওপর বিশাল চাপ সৃষ্টি করে। এছাড়াও ভিটেমাটি হারানো মানুষদের ভবিষ্যৎ পুরোপুরি অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। বিশেষ করে শিশুদের ভবিষ্যতে সবেচেয়ে বেশি হুমকির মুখে পড়ে।

সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলা তীব্র নদীভাঙ্গনের শিকার হয়, এছাড়াও উত্তরের জেলা গাইবান্ধা, সর্বদক্ষিণের জেলা ভোলার কয়েকটি উপজেলা, লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলা, নোয়াখালীর হাতিয়া, শরীয়তপুর, চাঁদপুর ইত্যাদি নদীর অববাহিকায় প্রতিবছর তীব্র নদীভাঙন দেখা যায়। দেশ ও জনগনের ওপর এই নদী ভাঙন বিশাল প্রভাব ফেলছে। কিন্তু সরকার নদীরক্ষা বাঁধগুলো তৈরি করছে না কেনো? তৈরি করলেও সেটি টেকসই হচ্ছে না কেনো? নদীতে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন বন্ধ করবে কে? এই বর্ষায় সরকার এসবের উত্তর দেওয়ার আগেই আবারও দেড় লাখ মানুষ তার ভিটামাটি হারাবে। তাকিয়ে থাকবে বর্ষার ভিজে আকাশের দিকে। চোখ দিয়ে বৃষ্টি মতো অশ্রু ঝরবে সেই মানুষদের। অথচ তাদের একটি সুন্দর জীবন পাওয়ার কথা ছিলো। ভাঙনের ফলে বাসস্থান হারানো মানুষগুলো শহরের বস্তিতে এসে বসবাস করে।

আবদুল কাদের জীবন

শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়