বেকার তরুণদের জন্য এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ কতটা আশাব্যঞ্জক

জুলীয়াস চৌধুরী

প্রকাশ : ০৫ জুলাই ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশের শ্রমবাজারে দীর্ঘদিন ধরেই একটি জটিল বৈপরীত্য পরিলক্ষিত হচ্ছে। একদিকে উচ্চশিক্ষিত বিপুলসংখ্যক তরুণ দীর্ঘ সময় কর্মসংস্থানের বাইরে অবস্থান করছেন, অন্যদিকে শিল্প ও সেবাখাতের বহু প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবলের অভাবের কথা নিয়মিতভাবে তুলে ধরছে। এই দুই বাস্তবতা মূলত একই সমস্যার ভিন্ন প্রকাশ। অর্থাৎ শ্রমবাজারে কর্মসংস্থানের সুযোগ, প্রয়োজনীয় দক্ষতা এবং তথ্যপ্রবাহের মধ্যে একটি কাঠামোগত অসামঞ্জস্য বিদ্যমান।

এই প্রেক্ষাপটে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ‘এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ’ বা কর্মসংস্থান বিনিময় কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার সরকারি উদ্যোগ নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ। সরকারের ঘোষিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, এসব কেন্দ্র স্থানীয় পর্যায়ে চাকরিপ্রার্থীদের নিবন্ধন, দক্ষতা মূল্যায়ন, শূন্য পদের তথ্য সরবরাহ এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের কাজ করবে। নীতিগতভাবে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ, কারণ এর লক্ষ্য শুধু চাকরি খোঁজার সুযোগ বাড়ানো নয়; বরং শ্রমবাজারে দক্ষতা ও চাহিদার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করা।

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বাজেট বক্তৃতায় কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, সরকারের অর্থনৈতিক কৌশলের কেন্দ্রে রয়েছে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, উৎপাদন সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা। এই দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ কর্মসূচির একটি সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কাঠামো গত কয়েক দশকে দ্রুত পরিবর্তিত হয়েছে। কৃষিনির্ভর অর্থনীতি থেকে দেশ এখন শিল্প ও সেবাভিত্তিক কাঠামোর দিকে এগিয়েছে। তৈরি পোশাকশিল্প, ওষুধশিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, আর্থিক সেবা ও ক্ষুদ্র-মাঝারি শিল্পে প্রবৃদ্ধি দেশের অর্থনীতিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। কিন্তু এই পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ দক্ষ জনশক্তি তৈরির ক্ষেত্রে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণব্যবস্থা প্রত্যাশিত অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি। এর ফলে সৃষ্টি হয়েছে দক্ষতার অমিল।

এই অমিল শুধু ব্যক্তিগত বেকারত্বের কারণ নয়; এটি সামষ্টিক অর্থনীতির জন্যও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। যখন একটি প্রতিষ্ঠান উপযুক্ত কর্মী না পেয়ে উৎপাদন সম্প্রসারণে ব্যর্থ হয়, তখন তা বিনিয়োগের গতি কমিয়ে দেয়। আবার একই সময়ে বহু তরুণ কাজের সন্ধানে থেকেও সুযোগের অভাবে পিছিয়ে পড়েন। এই বাস্তবতা দেশের উৎপাদনশীলতা ও প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাকে দুর্বল করে।

সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রতি বছর দুই লাখ নতুন কর্মসংস্থানের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। একই সঙ্গে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ফ্রিল্যান্সিং ও সৃজনশীল শিল্প বিষয়ে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আট লাখ পরোক্ষ কর্মসংস্থান তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে। তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি, রোবটিকস এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। তরুণ ও নারী উদ্যোক্তাদের সহায়তায় ৫০০ কোটি টাকার স্টার্টআপ তহবিল গঠনের প্রস্তাবও এই বৃহত্তর কর্মসংস্থান পরিকল্পনার অংশ। এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ এই পরিকল্পনাগুলোর বাস্তবায়নে একটি কার্যকর সহায়ক অবকাঠামো হতে পারে।

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলছে, এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জের ধারণা কেবল চাকরির তথ্য সরবরাহে সীমাবদ্ধ নয়। জার্মানি, যুক্তরাজ্য, সিঙ্গাপুরসহ উন্নত অনেক দেশে এই ধরনের প্রতিষ্ঠান শ্রমবাজারের তথ্য বিশ্লেষণ, দক্ষতার চাহিদা নিরূপণ এবং পুনঃদক্ষতা উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থাও কার্যকর কর্মসংস্থান ব্যবস্থাপনার জন্য নির্ভরযোগ্য শ্রমবাজার তথ্যব্যবস্থার ওপর গুরুত্বারোপ করে আসছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এই উদ্যোগ সফল করতে হলে কয়েকটি বিষয় বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

প্রথমত, এই কর্মসূচিকে প্রযুক্তিনির্ভর ও সমন্বিত হতে হবে। একটি জাতীয় ডিজিটাল কর্মসংস্থান তথ্যভান্ডার গড়ে তুলতে হবে, যেখানে চাকরিপ্রার্থীদের শিক্ষা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণের তথ্য সংরক্ষিত থাকবে এবং নিয়োগদাতারা তাদের শূন্য পদের তথ্য নিয়মিতভাবে হালনাগাদ করতে পারবেন। দ্বিতীয়ত, এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জকে দক্ষতা উন্নয়ন ব্যবস্থার সঙ্গে কার্যকরভাবে সংযুক্ত করতে হবে। কোনো চাকরিপ্রার্থীর দক্ষতার ঘাটতি চিহ্নিত হলে তাঁকে উপযুক্ত প্রশিক্ষণে যুক্ত করার ব্যবস্থা থাকতে হবে। অন্যথায় এটি একটি সীমিত তথ্যসেবা হিসেবেই রয়ে যাবে। তৃতীয়ত, বেসরকারি খাতের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। দেশের মোট কর্মসংস্থানের বড় অংশই বেসরকারি উদ্যোগে সৃষ্টি হয়। সুতরাং শিল্পপ্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, কৃষিভিত্তিক শিল্প ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সম্পৃক্ততা ছাড়া এই উদ্যোগ কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে পারবে না। চতুর্থত, কর্মসূচিটিকে অন্তর্ভুক্তিমূলক হতে হবে। নারী, গ্রামীণ জনগোষ্ঠী, দীর্ঘদিনের বেকার, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং বিদেশফেরত কর্মীদের জন্য বিশেষ সুযোগ ও সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ একটি আধুনিক শ্রমবাজারে অংশগ্রহণের সুযোগ সবার জন্য সমানভাবে সহজলভ্য নয়।

বাংলাদেশ বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ জনমিতিক বাস্তবতার মধ্যে রয়েছে। দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ কর্মক্ষম বয়সে। এই অবস্থাকে অর্থনীতিবিদেরা ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড হিসেবে আখ্যায়িত করেন। এই সুযোগকে উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানে রূপান্তর করতে পারলে দেশের অর্থনীতি আরও শক্তিশালী ভিত্তি পাবে। অন্যথায় এই সম্ভাবনা উচ্চ বেকারত্ব ও সামাজিক অস্থিরতার কারণ হতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রেও সুশাসনের প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মেধাভিত্তিক কর্মসংস্থানের যে অঙ্গীকার বাজেটে করা হয়েছে, তা বাস্তবে কার্যকর করতে না পারলে পুরো ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়বে। রাজনৈতিক প্রভাব, অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতিমুক্ত একটি স্বচ্ছ কাঠামো গড়ে তোলা তাই অপরিহার্য।

বাংলাদেশে অতীতে বহু উন্নয়ন উদ্যোগে অবকাঠামো নির্মিত হলেও কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জিত হয়নি। এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জও যেন সেই পরিণতির শিকার না হয়, সে জন্য শুরু থেকেই ফলাফলভিত্তিক মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। কতজন নিবন্ধিত হয়েছেন, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ কতজন বাস্তবে কর্মসংস্থানে যুক্ত হলেন এবং কতজন দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে কর্মবাজারে প্রবেশ করলেন। কর্মসংস্থান শুধু অর্থনৈতিক প্রয়োজন নয়; এটি সামাজিক মর্যাদা, আত্মনির্ভরতা এবং রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিক আস্থার সঙ্গেও সম্পর্কিত। একজন তরুণ যখন তাঁর যোগ্যতার ভিত্তিতে কর্মসংস্থানের সুযোগ পান, তখন তিনি শুধু নিজের জীবন নয়, পরিবার ও সমাজের ভবিষ্যৎকেও ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করেন। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ তাই সময়োপযোগী এবং প্রয়োজনীয়।

জুলীয়াস চৌধুরী

সাংবাদিক, কলাম লেখক ও উদ্যোক্তা